X

মেসোপটেমিয়া-চার সভ্যতার লীলাভূমি (১ম ভাগ)

মেসোপটেমিয়া সভ্যতা: সুমেরীয়-আকেদীয়-গুটি-সুমেরীয়

মেসোপটেমিয়া সভ্যতার উত্থান

মেসোপটেমিয়া কোন একক সভ্যতা নয়। প্রাচীনকালে এখানে একে একে গড়ে ওঠে চার সভ্যতা-সুমেরীয়, আসেরীয়, ব্যাবিলনীয় ও ক্যালডেরীয় সভ্যতা। এদের মধ্যে সুমেরীয় সভ্যতা প্রথম গড়ে ওঠে। এর পরে মহান সারগন গড়ে তোলে আকেদীয় সাম্রাজ্য। আকেদীয়দের পরে গুটি শাসন। উতু-হেগেল ফিরিয়ে আনে সুমেরীয় শাসন। এর পরে উর-নাম্মু তৈরি করে পৃথিবীর প্রথম আইন সংকলন- কোড অভ উর নাম্মু।

আফ্রিকার নীল নদের নিম্ন অববাহিকায় ভূ-মধ্য সাগর অবস্থিত। এ সাগরের পূর্ব উপকূলে আছে দুটি নদী- টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস। এরা দজলা ও ফোরাত নদী নামেও পরিচিত। নদী দুটি পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে পারস্য উপসাগরে পতিত হয়। নীল নদের নিম্ন অববাহিকা হতে ভূ-মধ্য সাগরের পূর্ব তীর পার হয়ে পারস্য উপসাগরের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত অঞ্চলটি ইদের নতুন চাঁদের মতো দেখায়। দুই নদীর উর্বর পলিমাটির জন্যে এ অঞ্চলটি কৃষিকাজের বিশেষ উপযোগি ছিল। এ জন্য এখানে গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর প্রথম সভ্যতা- মেসোপটেমিয়া সভ্যতা। ইদের নতুন চাঁদের মতো দেখতে উর্বর এ অঞ্চলটি ‘ফার্টাইল ক্রিসেন্ট’ নামে পরিচিত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ফার্টাইল ক্রিসেন্টকে সভ্যতার আঁতুরঘর বলে।

ফার্টাইল ক্রিসেন্ট

মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা। ‘মেসোপটেমিয়া’ একটি গ্রিক শব্দ। এর অর্থ দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি। এই দুই নদীর নাম দজলা ও ফোরাত। বর্তমান তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান, ইরাক ও কুয়েত প্রাচীন এই সভ্যতার অংশ ছিলো। তবে বেশীরভাগ অঞ্চলই ইরাকে অবস্থিত।

মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা একক কোন সভ্যতা নয়। বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে যে সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছিল সে গুলোর মধ্যে সুমেরীয় সভ্যতা, আসেরীয় সভ্যতা, ব্যাবিলনীয় সভ্যতা ও ক্যালডেরীয় সভ্যতা অন্যতম।

সুমেরীয় সভ্যতা

প্রায় সাত-আট হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণে উবাইদ নামে এক জাতি বাস করতো। উবায়েদরা কৃষিকাজ ও পশুপালনের জন্য ছোট ছোট গ্রাম গড়ে তোলে। সে সময়ে তাদের দুটি গ্রাম ধীরে ধীরে শহর হিসেবে পরিণত হয়। এদের একটির নাম এরিদু, অন্যটি উরুক। মজার ব্যাপার হলো, এই উবায়েদ জাতি কোন সভ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি। উত্তরের কোন অঞ্চল থেকে অন্য একটি জাতি এসে উবায়েদদের উপরে আধিপত্য গড়ে তোলে। এ জাতিকে সুমেরীয় বলা হয়। এ জাতি কোথা থেকে এসেছিল তা এখনো নিশ্চিত ভাবে জানা যায় নি।

মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলটির (ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ) নাম ছিল সুমের। সুমেরীয় জাতি বসবাস করতো বলে এ অঞ্চলকে সুমের বলা হতো। কিংবা, সুমের নামের এ অঞ্চলে বসবাস করতো বলে এ জাতির নাম সুমেরীয়। এর মধ্যে কোনটি আগে ঘটেছিল তা বলা কঠিন। সুমেরীয়দের গড়ে তোলা সভ্যতা সুমেরীয় সভ্যতা নামে পরিচিত। এরিদু ও উরুক ছাড়াও সুমেরিয় সভ্যতায় আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর গড়ে ওঠে। এদের নাম উর, কিশ, লাগাশ, লার্সা ও নিপ্পুর।

সুমেরীয় শহরগুলো

লিখন পদ্ধতির আবিষ্কার সুমেরীয় সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সুমেরীয় লিখন পদ্ধতি ছিল শব্দনির্ভর। সাধারণত একটি চিহ্ন দিয়ে একটি সম্পূর্ণ শব্দ প্রকাশ করা হতো। তাদের এ লিখন পদ্ধতিকে কিউনিফর্ম বলে। পৃথিবীর বেশীর ভাগ ভাষা একটার সাথে আরেকটা সম্পর্কিত। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সুমেরীয় ভাষার সাথে আর কোনো ভাষারই মিল পাওয়া যায় না। এটি কোনো ভাষা-পরিবারেরই সদস্য নয়। এজন্য সুমেরীয়কে বলা হয় ‘ল্যাংগুয়েজ আইসোলেট’ বা বিচ্ছিন্ন ভাষা।

কিউনিফর্ম

সুমেরীয়দের আরেক মহা আবিস্কার হলো চাকা। চাকা আবিস্কারের পরে দ্রুত সভ্যতা বিস্তার লাভ করতে থাকে। সুমেরীয়রা বছরকে ১২ মাসে, দিন-রাত্রিকে ঘন্টায় এবং ঘণ্টাকে মিনিটে বিভক্ত করেছিল। তারাই প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ১দিন ও ৭ দিনে ১ সপ্তাহ নিয়ম প্রবর্তন করে। দিন ও রাতের সময় নিরূপণের জন্য সুমেরীয়রা পানিঘড়ি ও স্বর্ণঘড়ি আবিষ্কার করে।

পৃথিবীর প্রথম মহাকাব্য ‘গিলগামেশ’ কিউনিফর্ম ভাষাতে রচিত। এই মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র হচ্ছে গিলগামেশ (শাসনকাল ২৬৫০)। সুমেরিয় অঞ্চলের উরুক নামের এক শহরের রাজা ছিল সে। ঈশ্বর ও মানুষের ক্ষমতা মিলে সে ছিল এক অতিমানব।  উরুকের জনগণের উপর রাজা গিলগামেশের নিপীড়ন ঠেকানোর জন্যে দেবতারা এনকিদু নামে এক বুনো মানব তৈরি করেন। প্রথমে যুদ্ধ করলেও, পরে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যান। তারা দুই জনে সিডার পর্বতে অভিযান চালিয়ে বনের দৈত্যাকার রক্ষক ‘হাম্বাবা’কে পরাজিত করে। সুমেরীয় প্রেম ও যুদ্ধের দেবী ইশতার গিলগামেশের প্রেমে পড়ে। কিন্তু সে দেবীর প্রেম প্রত্যাখ্যান করে। ফলে তাকে শায়েস্তা করতে দেবী স্বর্গ থেকে একটি ষাঁড় পাঠায়। গিলগামেশ ও এনকিদু ষাঁড়টিকে হত্যা করে। ষাঁড় হত্যার কারণে দেবতারা এনকিদুকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বন্ধুর মৃত্যুতে শোকাহত গিলগামেশ অনন্ত জীবনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন।

সুমেরীয়রা বহু দেবতার পূজা করতো। দেবতাদের চমৎকার চমৎকার সব নাম ছিল। যেমন: সূর্যদেবতা শামাস, বৃষ্টি,বাতাস ও বন্যার দেবতা এনলিল,পানির দেবতা এনকি; প্রেম, যুদ্ধ ও উর্বরতার দেবী ইনাননা/ইশতার, প্লেগ রোগের দেবতা নারগল ইত্যাদি। দেবতাদের উদ্দেশ্যে সুমেরীয়রা তেল, মাখন, শাকসব্জি, ফল-ফুল, খাদ্য প্রভৃতি উৎসর্গ করতো।

সুমেরীয়দের প্রধান ধর্মমন্দির ‘জিগুরাত’ নামে পরিচিত ছিল। এখানকার প্রধান পুরোহিতকে ‘পাতেজী’ নামে ডাকা হতো। সুমেরীয়দের পরজীবন সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। তাই সুমেরে কোন মমী বা স্মৃতিস্তম্ভ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে সময়ে কফিন ছাড়াই মৃতদেহ মাটিচাপা দেওয়া হতো।

জিগুরাত ডিজাইন

শুরুর দিকে এ সভ্যতায় তেমন বিখ্যাত কোন রাজা ছিল না। তবে তাদের সমাজে মানুষ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। পুরোহিত,অভিজাত,বণিক,শিল্পপতি এবং উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তাগণ ছিলেন উচ্চ শ্রেণীভুক্ত। মধ্য শ্রেণীভুক্তরা হলেন চিকিৎসক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আর নিম্ন শ্রেণীতে অবস্থান ছিল দাস,ভূমিদাস, যুদ্ধবন্দি ও সাধারণ শ্রমিকদের।

আকেদীয় সাম্রাজ্য

আকেদীয় সাম্রাজ্য

মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণে যখন সুমেরীয়রা সভ্যতা গড়ছে, তখন উত্তরের কোন স্থানে আকেদ নামের এক শহরে ধীরে ধীরে আরেক জাতি গড়ে ওঠে। এ জাতিকে আকেদীয় বলা হয়। এ জাতিতে জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসের প্রথম সম্রাট- সারগন দ্য গ্রেট। সারগন একে একে  সুমেরীয়দের শহরগুলো দখল করে আকেদীয় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। ২৩৩৪ থেকে ২২৮৪/৭৯ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৫০ বছর সারগনের শাসন স্থায়ী ছিল।

সারগনের পরবর্তী শাসকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি নাম সারগনের নাতি নারাম সিন (শাসনকাল ২২৫৪-২২১৮)। বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণ থেকে শুরু করে ইরানের পশ্চিম পাশ দিয়ে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত একটি পর্বতমালা রয়েছে। এ পর্বতমালার নাম জাগরোস পর্বতমালা। নারাম সিন মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলের ঐ জাগরোস পর্বতমালা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করে।

নারাম সিনকে নিয়ে ‘আকেদের অভিশাপঃ একুরের প্রতিশোধ’ নামে একটি পৌরাণিক গল্প আছে। এ গল্পে মূল বিষয় নারাম সিনের সাথে বায়ু দেবতা এনলিলের যুদ্ধ ও আকেদীয় সাম্রাজ্যের পতন। নিপ্পুর শহরে অবস্থিত এনলিলের মন্দিরের নাম ছিল একুর। নারাম সিন একুর মন্দির লুটপাট করলে এনলিল খুব রেগে যায়। এনলিলের অভিশাপে আকেদ শহরে প্লেগ, দূর্ভিক্ষ মহামারি আকার ধারণ করে। ফলে ধীরে ধীরে শহরটি ধংস হয়, পতন হয় আকেদীয় সাম্রাজ্যের।

গুটিদের শাসন

ইরানের পশ্চিম দিকের জাগরোস পর্বত অঞ্চলে গুটি নামে এক যাযাবর জাতি বাস করতো। ধারণা করা হয় যে, গুটিরা বর্তমান কুর্দি জাতিদের পূর্ব পুরুষ। প্লেগ, দূর্ভিক্ষের মহামারিতে আকেদ সাম্রাজ্য এক সময় দূর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগে যাযাবর গুটিরা সুমের অঞ্চল দখল করে নেয়। গুটিদের শাসন (২১৩৫-২০৫৫ খ্রি.পূ.) সম্ভবত ১০০ বছর স্থায়ী ছিল। এ সময়ে উরুক শহরে উতু-হেগেল নামে এক গভর্নর ছিল। এ গভর্নর গুটিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সুমের অঞ্চলে গুটি শাসনের অবসান করে। এ ভাবে সুমের অঞ্চল আবার সুমেরীয়দের হাতে ফিরে আসে।

সুমেরীয়দের পুর্নজাগরণ

দ্বিতীয় মেয়াদে সুমেরীয় শাসন কালের প্রথম বিখ্যাত শাসকের নাম ছিল উর-নাম্মু। সে সবচেয়ে বড় জিগুরাত ‘দ্য গ্রেট জিগুরাত অভ উর’ তৈরি করে। তবে তার বিখ্যাত সৃষ্টি ‘কোড অভ উর-নাম্মু’। কি অপরাধ করলে কি শাস্তি হবে এ নিয়ে এটি সুমেরীয় ভাষায় লিখিত একটি আইন সংকলন। এ সংকলনটি এখন ইস্তানবুলের প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে রাখা আছে। উর-নাম্মুর পরে সুমেরীয়দের তেমন আর কোন বিখ্যাত রাজার নাম পাওয়া যায় না। খ্রি.পূ.২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে এ সভ্যতার পরিসমাপ্তি ঘটে।

(ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর গল্প চলবে)