X

ফারাও শাসনের উত্থান ও বিকাশ (মিশরীয় সভ্যতা- ১ম ভাগ)

ফারাও শাসনের উত্থান ও বিকাশ: ফারাও- কুশাইট

প্রাচীন মিশরের মানচিত্র

মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম সভ্যতা। বিশ্বের দীর্ঘতম আফ্রিকার নীল নদের অববাহিকায় এ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের ভিক্টোরিয়া হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে দশটি দেশ পার হয়ে সর্বশেষে মিশর অতিক্রম করে নীল নদ ভূমধ্যসাগরে পতিত হয়। মিশরের মধ্য দিয়ে এ নদের প্রবাহকে কেন্দ্র করে প্রাচীন মিশরকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। সে সময়ে ভুমধ্যসাগরের নিকটবর্তী মিশরের উত্তরাঞ্চলকে ‘নিম্নস্থ মিশর’ ও দক্ষিণাঞ্চলকে ‘ঊর্ধ্বস্থ মিশর’নামে ভিন্ন ভিন্ন শাসকদের আওতাধীন ছিল। মিশরীয় সভ্যতার প্রথম বিখ্যাত রাজা, ঊর্ধ্বস্থ মিশরের রাজা নারমের (বা মেনেজ) দুই মিশরকে একত্রিত করে সমগ্র মিশরে একটি শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলেন।

ধারণা করা হয়, নারমেরের আগে ঐ অঞ্চলের রাজাদের নাম ছিল স্করপিয়ন বা ‘কাঁকড়াবিছা’। এ ধারণাকে কেন্দ্র করে ‘দ্য স্করপিয়ন কিং’ (২০০২), ‘দ্য স্করপিয়ন কিং ২: রাইজ অভ অ্যা ওয়ারিওর’ (২০০৮) এবং ‘দ্য স্করপিয়ন কিং ৩: ব্যাটেল ফর রিডেম্পশন’ (২০১২), ‘দ্য স্করপিয়ন কিং ৪: কোয়েস্ট ফর পাওয়ার’ (২০১৫), ‘দ্য স্করপিয়ন কিং: বুক অভ সোলস’ (২০১৮) নামে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

হায়ারোগ্লিফিক্স

মিশরীয় ফারাও নারমেরের রাজত্বকালে প্রাচীন মিশরীয়দের আরেক বিষ্ময়কর আবিস্কার তাদের চিত্রভিত্তিক বর্ণমালা- হায়ারোগ্লিফিক্স। মিশরীয় রাজ দরবারের যে সব ব্যক্তিরা হায়ারোগ্লিফিক্সের মাধ্যমে রাজাদেশ বা অন্যান্য বিষয়াবলী লিপিবদ্ধ করতো তাদেরকে স্ক্রাইব বা দপ্তরি বলা হতো।

এখানে একটি বিষয় জেনে নেয়া ভালো। চীনাদের পিকটোগ্রাম লিখন পদ্ধতি ‘ওরাকল বোন স্ক্রিপ্ট’ এর সাথে সুমেরীয়দের কিউনিফর্ম ও মিশরীয়দের হায়ারোগ্লিফ্লিকসের পার্থক্য এই যে, চীনারা ছবি শব্দ বা বাক্য বোঝাতো। অন্যদিকে, কিউনিফর্মে বিভিন্ন রেখাচিত্র ও হায়ারোগ্লিফ্লিকসে ছবি দিয়ে বর্ণ বোঝাতো।

হায়ারোগ্লিফিক্স পাঠ

বর্ণমালার সৃষ্টির ক্ষেত্রে মিশরীয়দের যেমন বিশেষ অবদান ছিল, তেমনি তারা পেপিরাস নামের লেখার উপযোগী এই চমৎকার উপাদান আবিস্কার করে। পেপিরাস এক ধরণের কাগজ। মিশরের জলাভূমিতে পেপিরাস নামে নলখাগড়া জাতীয় এক ধরণের গাছ পাওয়া যেত। সেই গাছ কেটে প্রাপ্ত খোলকে পাথর চাপা দিয়ে রোদে শুকানো হতো। শুকানো খোলগুলো পাথরের চাপে সোজা হয়ে লেখার উপযোগী হতো। পরবর্তীতে এ খোলাগুলোকে জোড়া দিয়ে রোল আকারে সংরক্ষণ করা হতো। এভাবে তৈরী লেখা বা চিত্রকলার উপযোগী মাধ্যমকে পেপিরাস বলা হয়।

ভাষা শিক্ষা সফটওয়ার হিসেবে ‘রোসেটা স্টোন’ নামটি বেশ পরিচিত। রোসেটা স্টোন মূলতঃ প্রাচীন মিশরের একটি বড় পাথর ফলক বা শিলালিপির ভাঙা অংশ। এটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সবচেয়ে বিখ্যাত বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। এ পাথরে খোদাই করে হায়ারোগ্লিফিকস, ডেমোটিক (প্রাচীন মিশরীয়দের সাধারণ ‘জনগণের ভাষা’) এবং গ্রিক – এই তিন ধরনের লিপিতে ১৩ বছর বয়সী পঞ্চম টলেমি এর রাজ্যাভিষেকের উপলক্ষ্যে পুরোহিত পরিষদের সম্মতিসূচক ফরমান লিপিবদ্ধ করা হয়। মিশরীয় পুরাতত্ত্বে রোসেটা স্টোনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটা আবিস্কৃত হবার পূর্বে কেউ মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিকস পড়তে জানতো না। যেহেতু লেখাগুলোতে একই জিনিষ ভিন্ন তিনটি লিপিতে লেখা হয়েছে, এবং গবেষকগণ প্রাচীন গ্রিক পড়তে জানতেন, তাই রোসেটা স্টোন হায়ারোগ্লিফ পাঠোদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রে পরিণত হয়।

নিম্নস্থ মিশরের মেমফেস, ঊর্ধ্বস্থ মিশরের থিবজ (বর্তমানে লুকশর) এবং হর্ন অভ আফ্রিকা অঞ্চলের পান্ট ছিল প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বিখ্যাত কয়েকটি স্থান। মিশরের প্রাচীনতম পিরামিডগুলি মেমফিসের গিজা ও সাক্কারায় আবিষ্কৃত হয়েছে। ‘ভ্যালি অভ দ্য কিংস’ ও ‘ভ্যালি অভ দ্য কুইনস’এর জন্য থিবজ বিখ্যাত। এ সকল উপত্যকায় ফারাও ও তাঁদের স্ত্রীদের সমাহিত করা হতো। পান্ট অঞ্চল সোনা ও হাতির দাঁতের জন্য বিশেষ বিখ্যাত ছিল বলে মিশরীয়দের সাথে এ অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্য চলতো।

প্রাচীন মিশরীয়রা বহুশ্বরবাদী ছিল। তাদের সকল দেবী-দেবীর উৎপত্তি হয়েছে ‘নান’ দেবতা থেকে। তারা যে সব দেব-দেবীর পূজা করতো তাদের মধ্যে আমুন, আনুবিস, আইসিস, হোরাস, মাত, ওসিরিস, রা, সেথ ও সেখমেট উল্লেখযোগ্য। আমুন সৃষ্টির দেবতা, আনুবিস মৃতের জগতের অধিকর্তা; আইসিস শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় দেবী, ওসিরিসের পত্নী এবং হোরাসের মা; হোরাস আকাশ, সূর্য, রাজত্ব, প্রতিরক্ষা এবং সুস্থতার দেবতা; মাত সত্য, ভারসাম্য, আদেশ, আইন, নৈতিকতা ও সুবিচার এর দেবী; ওসিরিস পরকালের বিচারক, শস্য ও পুনর্জন্মের দেবতা; রা মধ্যদিনের সূর্য দেবতা; সেখমেট যুদ্ধের দেবী এবং সেথ ছিল বিশৃঙ্খলা, মরুভূমি ও নৃসংশতার দেবতা।

চিকিৎসা বিদ্যায় এখনও প্রতিরক্ষা এবং সুস্থতার দেবতা হোরাসের উপস্থিতি রয়েছে। ডাক্তারের যে কোন পেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্রের দিকে তাকালে Rx শব্দ যুগল আমাদের চোখে পড়ে।  এই Rx-এর R এর অর্থ ‘রেসিপি’ (recipe)। আদেশসূচক বাক্যের ক্রিয়া হিসেবে ‘রেসিপি’ বা R বোঝায় ‘এটা লও’ (take this)। ব্যবহারিক অর্থে Rx এখন ‘পেসক্রিপশন’ বা সাধারণ অর্থে ‘ঔষধ’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। Rx-এর সাথে প্রাচীন মিশরের একটি গল্প মিশে আছে। সেটা হলো ‘হোরাস’ দেবতার চোখ। গ্রামে-গঞ্জে তাবিজ যেভাবে প্রতিরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তেমনি প্রাচীন মিশরীয়দের প্রতিরক্ষা কবজ ছিল ‘হরুসের চোখ’। চোখের এই প্রতীকটি কালক্রমে Rx রূপ ধারণ করেছে বলে অনেকে মনে করেন। মিশরীয় দেবতা বিশেষ করে হোরাসকে আশ্রয় করে নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের নাম ‘গডস অভ ইজিপ্ট’ (২০১৬)।

Rx প্রতীক

প্রাচীন মিশরীয় রাজাদেরকে ফারাও বলা হতো। ফারাওরা নিজেদেরকে কখনো ঈশ্বর, কখনো ঈশ্বরের প্রতিনিধি দাবী করতেন। ফারাওদের মধ্যে জোসার, স্নেফ্রু, খুফু, জেডেফ্রে, খাফ্রে, সবেকসেফেরু, ১ম আহমোসিস, হ্যাতশেপসুট, আকনাথুন (৪র্থ আহমুনহোথেপ) ও তাঁর স্ত্রী নেফারতিতি, তুতানখামুন এবং র‌্যামসিজ দ্য গ্রেট (২য় র‌্যামসিজ) এর নাম উল্লেখযোগ্য।

মিশরের ফারাওদের ইতিহাস কয়েকটি রাজবংশে বিভক্ত। থিনিস নামের কোন এক শহরকে কেন্দ্র করে রাজা নারমের যে ফারাও রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে সেটি প্রথম বংশ। খ্রি.পূ. ৩০ শতকে এ বংশের সমাপ্তি ঘটে। থিনিসেই দ্বিতীয় বংশ (২৮৯০–২৬৮৬ খ্রি.পূ.) ও মেমফিস শহরে তৃতীয় ফারাও বংশ (২৬৮৬–২৬১৩ খ্রি.পূ.) গড়ে ওঠে। তবে তৃতীয় বংশের ফারাও জোসার বাদে এই দুই রাজবংশের মধ্যে বিখ্যাত কোন শাসকের নাম পাওয়া যায় না।

স্নেফ্রু, খুফু, জেডেফ্রে, খাফ্রে- এই চার ফারাও মেমফিস শহরে গড়ে ওঠা চতুর্থ বংশের (২৬১৩–২৪৯৪ খ্রি.পূ.) ফারাও। এরা সবাই পিরামিড তৈরির জন্য বিখ্যাত। পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো মিশরের পিরামিড।

চতুর্থ রাজবংশের ফারাওগণ

পিরামিড হলো এক প্রকার জ্যামিতিক আকৃতি বা গঠন যার বাইরের তলগুলো ত্রিভূজাকার এবং যারা শীর্ষে একটি বিন্দুতে মিলিত হয়। বিভিন্ন ফারাওরা বিভিন্ন সময়ে তাদের সমাধিক্ষেত্র হিসেবে এ সব পিরামিড নির্মাণ করে।

মিশরে ছোটবড় ৭৫টি পিরামিড আছে। স্থপতি ইমহোটেপের নির্দেশনায় ফারাও জোসার সবচেয়ে পুরনো পিরামিডটি নির্মাণ করে। ফারাও স্নেফ্রু নির্মাণ করে ‘অবনত পিরামিড’ ও ‘লাল পিরামিড’। সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষনীয় গিজা’র পিরামিডটি নির্মাণ করে ফারাও খুফু। তাই এটা খুফু’র পিরামিড হিসেবেও পরিচিত। মিশরের মতো সুউচ্চ না হলেও অন্যান্য কয়েকটি দেশে বিভিন্ন ধরণের ছোট-বড় পিরামিড বা পিরামিড সদৃশ স্থাপনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যেমন- ইরাক, সুদান, নাইজেরিয়া, গ্রিস, স্পেন, চীন, ইটালি, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও পেরু।

পিরামিডের মতো মিশরীয় সভ্যতার আরেক নিদর্শনের নাম গিজার প্রকাণ্ড স্ফিংস। স্ফিংস একটি দোআঁশলা পৌরাণিক প্রাণি যার সিংহাকৃতির শরীরের উপরে মানব মাথা বসানো। মিশরের মতো গ্রীক পুরাণেও স্ফিংসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মিশরীয় স্ফিংক্সগুলো সাধারণত পুরুষ আকৃতির কিন্তু গ্রীক পুরাণের স্ফিংসরা নারী-আকৃতির হয়। বিভিন্ন পুরাণে স্ফিংক্স বা স্ফিংক্স সদৃশ কাল্পনিক প্রাণিকে মন্দির কিংবা সমতুল্য কোন অঞ্চলের প্রবেশদ্বারের প্রহরীস্বরূপ বর্ণনা করা হয়। ফারাও জেডেফ্রে বা ফারাও খাফ্রে গিজার প্রকাণ্ড স্ফিংসটি নির্মাণ করে বলে মনে করা হয়।

চতুর্থ বংশের পরবর্তী আটশো বছরে মেমফিস শহরকে কেন্দ্র করে পঞ্চম থেকে অষ্টম বংশ, হেরাক্লিওপলিস ম্যাগনা শহরে নবম ও দশম এবং থিবজ শহরে একাদশ ও দ্বাদশ, ইচতাওয়ায়ি শহরে ত্রয়োদশ এবং এভারিস শহরে চতুর্দশ ফারাও বংশ গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে দ্বাদশ রাজবংশের চার আমেনেমহাত ও তিন সেনুসরেত ফারাওরাও পিরামিড নির্মাণ করে। এছাড়া আর কোন রাজবংশের তেমন উল্লেযোগ্য কোন কীর্তি পাওয়া যায় না।

দ্বাদশ রাজবংশের ফারাওগণ

প্রাচীন মিশরে পুরুষদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন নারী ফারাও ছিল। প্রথম নারী ফারাও ছিলো দ্বাদশ বংশের ফারাও সবেকনেফেরু। দ্বিতীয় নারী অষ্টাদশ বংশের ফারাও হ্যাতশেপসুট পান্টের সাথে মিশরের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার করেন। মিশরে নারী শাসকদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় মিশর শাসন করেছিলেন।

খ্রিস্টপূর্ব সতের শতকের মাঝামাঝি সময়ে হাইকসস (‘পরদেশি শাসক’) নামের এক যাযাবর জাতি প্রাচীন মিশরীয় ফারাওদের রাজত্বকালের বিচ্ছেদ ঘটায়। হাইকসসরা ছিল পশ্চিম এশিয়ার সেমেটিক যাযাবর। নীলনদের ব-দ্বীপের অ্যাভারিস নগর হাইকসস জাতিগোষ্ঠীর রাজধানী ছিল বলে ধারণা করা হয়। এদের কাছ থেকে মিশরীয়রা ব্রোঞ্জ, নতুন অস্ত্র এবং ঘোড়াটানা রথের ব্যবহার শিখেছিল।

(ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর গল্প চলবে)