X

পারস্য সভ্যতা- উত্থান ও বিকাশ (১ম ভাগ)

পারস্য সভ্যতা: আকিমানিদ সাম্রাজ্য-মেসিডোনিয় শাসন-জরথুস্ত্রবাদ-সিলুসিদ শাসন

পারস্য সভ্যতা মেসোপটেমিয়ারনব্য ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যমিশরের কুশাইট রাজ্য করায়ত্ত্ব করে প্রায় অর্ধ-পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল।

মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের পূর্বের উত্তর-দক্ষিণ অঞ্চল হতে পারস্য সভ্যতার উত্থান হয়। বর্তমান ইরানের আগের নামও পারস্য। তবে এখন ইরান বলতে যে ভূখণ্ড বোঝায়, পারস্য বললে তার থেকে বহুগুণ বড় এক অঞ্চল বোঝাত।

খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে ইরানীয় মালভূমিতে একটি জাতি বসতি স্থাপন করে। জাতিগত ভাবে এরা আর্য নামে পরিচিত। এদের মধ্যে ঐতিহাসিক ভাবে মেদেস, পার্থীয় ও পারসিক গোত্রগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মেদেস গোত্রীয় লোকেরা মালভূমির উত্তর-পশ্চিম অংশে বাস করা শুরু করেছিল। এ অঞ্চল মেদেস (বা মেদেয়া) নামে পরিচিত হয়। ইরানের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের পার্থীয়রা বাস করত বলে এটি পার্থীয়া নামে পরিচিত।

পারসিক জাতির লোকেরা মালভূমির দক্ষিণ অংশে বাস করা শুরু করে। এ অঞ্চলটির নাম পার্সিস বা পার্সিয়া। এ অঞ্চলে যারা বাস করতো তাদের পারসিক বলা হতো। এই পারসিকদের হাতে গড়ে ওঠে পারস্য সভ্যতা। পারসিক ও মেসোপটেমিয়ার মাঝে পশ্চিমে পারস্য উপসাগরের কোল ঘেঁষে প্রায় মেসোপটেমিয়ার সমসাময়িক আরও একটি বিখ্যাত অঞ্চল ছিল যার নাম ইলাম। সুসা, আওয়ান ও আনশান ছিল এ অঞ্চলের তিন বিখ্যাত শহর।

মেদেস-পার্থিয়া-পার্সিয়া-ইলাম

খ্রি.পূ. সপ্তম শতকে পারসিকদের প্রথম বড় নেতা ছিল যুদ্ধবাজ সেনাপতি হাখমানেশ বা আকিমিনিস। তার মৃত্যুর পরে পুত্র তেইপেস ক্ষমতায় আসে। সে ছিল ইলামের আনশানের রাজা। তেইপেসের দুই পুত্র- সাইরাস (১ম) ও আরিয়ারামনেস। পিতার মৃত্যুর পরে আনশানের ক্ষমতায় বসে সাইরাস। তার রাজত্বকাল ছিল ৬০০-৫৮০ খ্রি.পূ.। এর পরে সাইরাসের পুত্র কামবাইসেস (১ম) প্রায় বিশ বছর আনশান শাসন করে।

এর পরে কামবাইসেসের পুত্র সাইরাস (২য়) পারসিকদের রাজা হন। এর পর পারসিকদের ভাগ্য পরিবর্তিত হয়। শুরু হয় পারস্য সভ্যতার জয়যাত্রা। কুরোশ মেদেসীয়দের পরাজিত করে এবং ব্যাবিলনে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। সাইরাসের অধীনে পারস্য এশিয়ার অন্যতম মহাশক্তিতে পরিণত হয়।

সাইরাসের পুত্র কামবাইসেস (২য়) মিশর বিজয় করে পারস্য সভ্যতার বিস্তার ঘটায়। পরবর্তী সময়কালে দারিয়াস ও জার্কসিজদের হাত ধরে এ সভ্যতা পশ্চিমের বলকান অঞ্চল (বর্তমান আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কসোভো, বুলগেরিয়া, মন্টেনিগ্রোর অধিকাংশ এবং ক্রোয়েশিয়া, গ্রিস, ইটালি, রোমানিয়া, স্লোভেনিয়া ও তুরস্কের কিছু অংশ) ও পূর্বের সিন্ধু সভ্যতা (বর্তমান ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

আকিমানিদ সাম্রাজ্য (৫৫০-৩৩০ খ্রি.পূ.)

পারস্য সভ্যতার প্রথম সাম্রাজ্যের নাম আকিমানিদ সাম্রাজ্য। রাজা আকিমিনিসের নামে এ সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয়। তবে এ সাম্রাজ্যের শুরু করে সাইরাস দ্য গ্রেট (বা সাইরাস ২য়)। সাইরাসের পরে এ সাম্রাজ্যে আরো দুই বিখ্যাত শাসকের আবির্ভাব ঘটে। এদের একজনের নাম দারিয়ুস, অন্যজন জার্কসিজ।

সাইরাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিয়ে একটি মজার কাহিনী আছে। সাইরাসের দাদা সাইরাস (১ম) সাইরাসের জন্মের পরে স্বপ্ন দেখলো যে সাইরাস একদিন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। তাই সে সাইরাসকে গহীন পর্বতে নির্বাসন দেয়। কিন্তু সাইরাস বেঁচে যায়। পরে ১০ বছর বয়সে তার দাদা তাকে ফিরিয়ে আনে। তবে সে স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। আনশান থেকে শুরু করে সাইরাস একে একে মেদেয়া, লাইদিয়া (তুরস্কের একাংশ) ও মেসোপটেমিয়া থেকে ও জুদেয়া (প্যালেস্টানের একাংশ) পর্যন্ত আকিমানিদ সাম্রাজ্যে যুক্ত করে।

পারস্য সাম্রাজ্য (আকিমানিদ) (৫৪০ খ্রি.পূ)

সাইরারেস তিন সন্তান- ক্যামবাইসেস (২য়), বার্দিয়াআতোসা। তার মৃত্যুর পরে ক্যামবাইসেস (২য়) পারস্য সাম্রাজ্যের (রাজত্বকাল ৫৩০-৫২২ খ্রি.পূ.) হাল ধরে। সে মিশরের কুশ রাজ্য পর্যন্ত আকেমানিদ সাম্রাজ্যকে প্রসারিত করে। আতোসা ছিল ক্যামবাইসের বোন ও রাণী। ক্যামবাইসের মৃত্যুর পরে পরবর্তী আকিমানিদ শাসক দারিয়াস দ্য গ্রেটের সাথে আতোসার বিয়ে হয়। এখানে জেনে রাখা ভালো যে, পবিত্র বাইবেলের ‘বুক অভ দানিয়েল’-এ বর্ণিত ‘সিংহের গুহায় দানিয়েল’ কাহিনীতে উল্লেখিত দারিউসের সাথে এই দারিউসের কোন ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই।

ক্যামবাইসেসের পরে আকিমানিদ সাম্রাজ্যের হাল ধরে আরেক বিখ্যাত শাসক দারিয়াস দ্য গ্রেট (বা দারিয়াস ১ম)। দারিয়াস সাইরাসের কেউ ছিল না। দারিয়াস সে সময়ে আকিমানিদ সাম্রাজ্যের এক জন রাজযোদ্ধা ছিল। ক্যামবাইসেস তার ভাই বার্দিয়াকে হত্যা করেছিল। এ বিষয়ে কেউ কিছু জানতো না। তাই তার মৃত্যুর পরে গৌমাতা নামে এক ব্যক্তি বার্দিয়া সেজে আকিমানিদ সাম্রাজ্যে বসে। এ সময়ে দারিয়াসসহ সাত যোদ্ধা মিলে গৌমাতাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। সাত জনে নতুন রাজা নির্বাচনের জন্য একটি বুদ্ধি বের করে। একদিন ভোরে তারা সবাই ঘোড়া নিয়ে একত্রে মিলিত হবে। এই সাত জনের ঘোড়ার মধ্যে যার ঘোড়া আগে ডাকবে সে হবে নতুন রাজা। সেই ভোরে ঘোড়ার ডাকে দারিয়াস পারস্যের সম্রাট হয়ে যায়।

তবে দারিয়াস আকেমানিদ সাম্রাজ্যেরই বংশধর ছিল। আকিমিনিসের দ্বিতীয় পুত্র আরিয়ারামনেস, তার পুত্র আরসামেস আর তার পুত্র হিসতাপেস। হিসতাপেস ছিল আকিমানিদ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ব্যাক্ট্রিয়ার গভর্নর। ব্যাক্ট্রিয়া ছিল বর্তমানের আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান অঞ্চল। দারিউস ছিল এই হিসতাপেসের পুত্র।

দারিয়াস ক্ষমতায় আসার পর পূর্বে সিন্ধু নদ পর্যন্ত পারস্যের পূর্ব সীমানা প্রসারিত করেন। তবে পারসিকদের পশ্চিম ও দক্ষিণে রাজ্য বিস্তারে গ্রিকরা ছিল অন্যতম বাধা। দারিয়াসের সময়ে তুরস্ক অঞ্চলের পারসিকদের অধীনে বসবাসরত গ্রীকরা বিদ্রোহ করলে সে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে শক্তহাতে বিদ্রোহ দমন করে। পারস্যের গ্রিকদের সাথে পারসিকদের দীর্ঘ সময় (৪৯২-৪৪৯ খ্রি.পূ.) যুদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসে এ যুদ্ধ গ্রেকো-পারসিক বা পারসিক যুদ্ধ নামে পরিচিত।

গ্রেকো-পারসিক যুদ্ধ

৪৯০ খ্রিস্টাব্দে গ্রিসের এথেন্স নগরের অদূরে ‘বে অভ ম্যারাথন’ নামক উপসাগরে দারিয়াসের সৈন্যরা গ্রিকদের সাথে যুদ্ধ করে এবং পরাজিত হয়। এ যুদ্ধ ম্যারাথনের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে প্রায় ৬ হাজার পারসিক সৈন্য নিহত হয়। পারসিকরা যখন আরো সৈন্য নিয়ে এথেন্স আক্রমণের উদ্দেশ্যে বের হয় তখন গ্রিকরা নগর বাঁচানোর জন্য দৌড়ে ফিরে যায়। অথবা, গ্রিকদের বিজয়ের সংবাদ দ্রুত রাজধানী এথেন্সে পৌঁছে দেবার জন্যে ফিডিপিডিস (Pheidippides) নামে এক সৈন্য ম্যারথন থেকে দৌড়ে সরাসরি এথেন্সের রাজদরবারে প্রবেশ করে। তারপরে সে “নেনিকেকামেন” (nenikēkamen) বা “আমরা জিতেছি” বলে মৃত্যুবরণ করে। ম্যারাথন থেকে এথেন্সের দূরত্ব ৪২.১৯৫ কি.মি (২৬.২১৯ মাইল)। দুটি ঘটনার মধ্যে যে কোন একটির ভিত্তিতে ম্যারাথন দৌড়ের প্রচলন হয়।

দারিউসের মৃত্যুর পরে আকিমানিদ সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নেয় আতোসার গর্ভে তার ছেলে জার্কসিজ দ্য গ্রেট (বা জার্কসিজ ১ম)। ক্ষমতায় আরোহন করে সে পিতার পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার জন্য দুই লক্ষ সৈন্য ও এক হাজার যুদ্ধজাহাজ নিয়ে গ্রিকদের আক্রমণ করে। এ যুদ্ধের নাম থার্মোপিলির লড়াই (৪৮০ খ্রি.পূ.)। গ্রিকদের পক্ষে এ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয় গ্রিসের স্পার্টা নগরের রাজা লিওনিডাস (১ম)। ভয়াবহ এ যুদ্ধে অবস্থা বেগতিক দেখে লিওনিডাস মাত্র ৩০০ সৈন্যকে রেখে বাকী সবাইকে পালানোর সুযোগ দেয়। যুদ্ধে গ্রিকরা পরাজিত হলেও এই সৈন্যরা অনেক পারসিক সৈন্যদের পরাজিত করে। এ যুদ্ধ নিয়ে কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়- ‘দ্য ৩০০ স্পার্টানস’ (১৯৬২), ‘৩০০’ (২০০০) ও ‘মিট দ্য স্পার্টানস’ (২০০৮)। প্রায় একই সময়ে সালামিসের লড়াই নামে আরেকটি যুদ্ধে গ্রিকরা জয়লাভ করে।

আকিমানিদ সাম্রাজ্য

পবিত্র বাইবেলে জার্কসিজ দ্য গ্রেট-এর উল্লেখ রয়েছে। তবে সেখানে সে আহাজুরিয়াস নামে পরিচিত। ভিন্নমত থাকলেও অনেকে মনে করেন যে আহাজুরিয়াস নামে জার্কসিজকে বোঝানো হয়েছে। পবিত্র বাইবেলের বুক অভ এসথার, দানিয়েল, এজরা ও তবিতে আহাজুরিয়াসের উল্লেখ আছে। ই্হুদী ধর্মের বিশ্বাস মতে, আহাজুরিয়াসের রাণীর নাম এসথার। এসথারকে নিয়ে ৪৭০ বিসি- ‘এসথার এন্ড দ্য কিং’ (১৯৬০), দ্য বুক অভ এসথার’ (২০১৩), ‘এসথার’ (১৯৬০, ১৯৮৬,১৯৯৯), ‘কুইন এসথার: দ্য বাইবেল’ (১৯৯৯), ‘ওয়ান নাইট উইথ দ্য কিং’ (২০০৬) প্রভৃতি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

মেসিডোনিয় শাসন

জার্কসিজের পরে আকিমানিদ সাম্রাজ্যে আর কোন শক্তিশালী সম্রাট আসেনি। অন্যদিকে, গ্রিসের মেসিডোনিয়ায় জন্ম এক মহাপরাক্রমশালী শাসক- আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। আলেকজান্ডার ৩৩৪ থেকে ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ করেন এবং সম্রাট ৩য় দারিউসের সৈন্যদের পরাজিত করে পারস্য বিজয় করেন। আলেকজান্ডার তাঁর সেনাবাহিনীতে বহু পারসিক সেনাকে অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং তাঁর নির্দেশে সমস্ত গ্রিক উচ্চপদস্থ সেনা অফিসারেরা পারসিক মহিলাদের বিয়ে করে। সে নিজেও সম্রাট ৩য় দারিউসের কন্যা (২য়) স্তাতেইরাকে বিয়ে করে। আকিমানিদ সাম্রাজ্য এ সময় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর মেসোডোনিয়া সাম্রাজ্যের (আর্গিদ রাজবংশের) অন্তর্ভূক্ত হয়।

আকিমানিদ সাম্রাজ্যের বংশানুক্রম

জরথুস্ত্রবাদ

পারসিকদের ধর্ম বিশ্বাসকে জরথুস্ত্রবাদ বলা হয়ে থাকে। এটি একেশ্বরবাদী ধর্ম। এ ধর্ম প্রবর্তকের নাম জোরোয়াস্টার বা জরথুস্ত্র (৬২৮-৫৫১ খ্রিস্টপূর্ব) । জরথুস্ত্র ধর্মের প্রধান উপাস্য দেবতার নাম ‘আহোরা মাজদা’। ন্যায়, সততা এবং বিচক্ষণতার প্রতীক আহোরা মাজদা মঙ্গলের দেবতা। তার প্রতীক হলো অগ্নি। পারসিকরা আগুনের পবিত্রতাকে ঈশ্বরের পবিত্রতার সাথে তুলনীয় মনে করেন। এই এ কারণে পারসিকদের অগ্নি উপাসক বলা হয়। অপরদিকে আহোর মাজাদা প্রতিদ্বন্দ্বী দেবতার নাম ‘আহরিমান’। সে অসত্য, পাপাচার অমঙ্গল এবং দুষ্ট দেবতা নামে পরিচিত। এ দেবতা জরা, মহামারী, অনাবৃষ্টি প্রভৃতি ধ্বংসকারী শক্তির প্রতীক। জরথুস্ত্রবাদের ধর্মগ্রন্থের নাম আবেস্তা বা জেন্দাবেস্তা। এ গ্রন্থের সাথে বেদের বেশ মিল আছে।

জরথুস্ত্রবাদের প্রতীক ফারাবাহার

খ্রিস্টীয় ৯ম শতকে জরথুস্ত্রীয় ধর্মালম্বী অনেক পারসিকরা পারস্য থেকে ভারতে চলে আসেন। ভারতে এসে এরা প্রথম পা রাখে বর্তমান গুজরাতের সঞ্জান এলাকায়। এদের এই আগমন সম্পর্কে একটি চমৎকার ঘটনা প্রচলিত আছে। পারসিকদের আগমনের পর সনজানের শাসক একটি কানায় কানায় পূর্ণ দুধের পাত্র পারসিকদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন তাঁর রাজ্যে আর কাউকে ঠাঁই দেয়ার জায়গা নেই। পারসিরা ঐ পাত্রে চিনি ঢেলে দেখিয়ে দেন পাত্র উপচে পড়ছে না। অর্থাৎ বোঝানোর চেষ্টা করেন চিনি যেমন দুধে মিশে যায় তেমনি তাঁরাও ওই এলাকার মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকবেন। এরপর শাসক পারসিকদের আশ্রয় দেন।

বর্তমানে পৃথিবীতে এ ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার। এরা ভারত, আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, ইরান সহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশে বাস করে। জরথুস্ত্রীয় ধর্মে আনুষ্ঠানিকভাবে দীক্ষিত করার জন্য নওজোত (বা নবজোত) নামে একটি অনুষ্ঠান পালিত হয়। সাত বছর বয়স হওয়ার আগে কারও নওজোত হয় না। তবে নওজোতের জন্য বয়সের কোন উর্ধ্বসীমা নেই।

জরাথুস্ত্র ধর্মের মূল ভিত্তি হচ্ছে শুভচিন্তা শুভকথা এবং শুভকর্ম। মৃত ব্যক্তিদের পুনর্জীবন, পরকাল, ত্রাণকর্তার আবির্ভাব, পরকালের বিচার, স্বর্গ ও দোজখের প্রতি বিশ্বাস জরাথুস্ত্র ধর্মে স্থান পেয়েছে। নৈতিকতা, সততা প্রভৃতি মহৎ গুণ অর্জনে এ ধর্ম উৎসাহিত করে। জরথুস্ত্র মতবাদ বিশেষ করে পরকাল, ত্রাণকর্তার আবির্ভাব, স্বর্গ, পরকালের বিচার ইত্যাদির ধারণা ইহুদী, খৃস্টান এবং ইসলাম ধর্মে দেখা যায়।

সিলুসিদ শাসন

৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হলে তাঁর সেনা নেতাদের মধ্যে পারস্যের সিংহাসন দখলের লড়াই শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সেলুকাস (১ম) পারস্যের রাজা হন। তিনি পূর্বে সিন্ধু নদ থেকে পশ্চিমে সিরিয়া ও তুরস্ক পর্যন্ত বিশাল এলাকার রাজা ছিলেন। তাঁর বংশধরেরা পারস্যে সেলুকাসীয় বা সিলুসিদ রাজবংশ গঠন করে। সেলুকাসের সময়কালের দুটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধের মধ্যে একটি ব্যাবিলনের এন্তিগোনাস (১ম) এর সাথে আর অন্যটি ভারতে মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সাথে। প্রথমটিতে জয় লাভ করলেও দ্বিতীয়টিতে সিলুসিদরা পরাজিত হয়। ১ম সেলুকাসের পরে পারস্য সভ্যতায় তেমন কোন উল্লেখযোগ্য সিলুসিদ শাসকের নাম পাওয়া যায় না।

ইরানের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের পার্থীয় নামে যে জাতি বাস করতো তারা শক্তিশালী তীরন্দাজ ছিল। ছুটন্ত ঘোড়ায় বসে উল্টো দিকে ফিরে তীর এরা পটু ছিল। এ জন্য এভাবে তীর ছোড়ার কৌশলের নাম ‘পার্থীয়ান শট’। ২৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পার্থীয় জাতির লোকেরা সেলুকাসীয় রাজবংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে পার্থীয় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এরপর প্রায় সাড়ে চারশো বছর (২৪৭ খ্রি.পূ.-২২৪ খ্রিস্টাব্দ) পারসিকরা পার্থীয়দের অধীনে ছিল। ১ম আরসাসিজ নামে এক যোদ্ধা এ সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেছিল বলে পার্থীয় সাম্রাজ্যকে আরসাসিদ রাজবংশের শাসনও বলা হয়।

(ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর গল্প চলবে)