X

গ্রিক পুরাণের সহজপাঠ: তিতান দেব-দেবীগণ (২য় ভাগ)

গ্রিক দেব-দেবীদের জন্ম ও বংশপরিচয়ঃ তিতান দেব-দেবীগণ

গ্রিক পুরাণের সহজপাঠের প্রথম ভাগে গ্রিকদের আদিম দেব-দেবীদের নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় ভাগে থাকছে তিতানদের নিয়ে আলোচনা। তিতানরা গ্রিকদের তিন প্রজন্মের দেব-দেবীদের মধ্যে দ্বিতীয় প্রজন্ম।

খ) গ্রিক তিতান দেব-দেবীগণ বারো জন তিতানদের ছয়টি যুগল। জোড়ায় জোড়ায় এই যুগল তিতানরা হলো-অশিয়ানোস (Oceanus) ও তেথুস (Tethys), হাপেরিয়নথেইয়া, কয়উস (Coeus) ও ফয়বে (Phoebe), ক্রোনাস (Cronos) ও রেয়া (Rhea), নিমোসাইনে (Mnemosyne) ও ক্রাইয়াস (Crius) এবং থেমিস (Themis) ও ইয়াপেতুস (Iapetus)। প্রতিটি যুগলের ভিত্তিতে দ্বাদশ তিতানদের বংশ পরম্পরা আলোচনা করা হলো।

১) ক্রোনাসরেয়া পরিবার

ক্রোনাস ফসলের দেবতা আর রেয়া উর্বরতার দেবী। রেয়া মূলত ‘সকল দেবতার মা’ হিসেবে পরিচিত। এর কারণ তার গর্ভ হতে গ্রিক দেবদেবীদের তৃতীয় প্রজন্ম তথা প্রধান অলিম্পিয়ান দেবদেবীর সৃষ্টি হয়।

ক্রোনাস কাস্তে দিয়ে নিজের পিতা ইউরেনাসের শিশ্নচ্ছেদ করে সিংহাসন দখল করে। সমুদ্রের ছুড়ে ফেলা ইউরেনাসের সেই অণ্ডকোষ হতে একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবীর জন্ম হয়েছিলো। সে হলো ভালোবাসা, সৌন্দর্য ও যৌন দেবী আফ্রোদাইতি (Aphrodite)।

ক্রোনাস ও রেয়া পরিবারের ছয় সন্তান। তিন পুরুষ- হেডিস, জিউস ও পোসাইডন; এবং তিন কন্য দেমেতের, হেরা ও হেস্টিয়া। ক্রোনাসের ঔরসে ফিলারা (Philyra) নামক এক ওশেনিদের গর্ভে জন্মেছিল কাইরন (Chiron)। কাইরন হলো এক সেনতার (centaur)। সেনতার এক ধরনের শংকর প্রাণী যাদের দেহের উপরের অংশ মানুষের মতো, নিচেরটা ঘোড়ার। কাইরন ছিলো একিলিস, হারকিউলিস, পার্সিউস, ঈনিস, ওদিসিয়াস ও থিসিউসের মতো যোদ্ধাদের শিক্ষক।

২) অশিয়ানোসতেথুস পরিবার

অশিয়ানোস হলো সমুদ্র দেবতা। এই দেবতা তিনবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে আদিম দেবদেবীদের মধ্যে পন্তাস ছিল সমুদ্র দেবতা। পরে অলিম্পিয়ান দেবতা পোসাইডন সমুদ্র দেবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। তেথুস হলো নদীর দেবী। অশিয়ানোসতেথুস এর সন্তানরা ওশেনিদ বা জলপরী নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে বিভিন্ন গ্রিক দেবতা ও উপদেবতাদের জন্মে এ সব জলপরীর ভুমিকা রয়েছে।

গাইয়া ও পন্তাসের জ্যেষ্ঠ্য পুত্র নেরেয়াস ‘সমুদ্রের বৃদ্ধ’ নামে পরিচিত ছিল। তার ঔরসে জলপরী দোরিস (Doris) এর গর্ভে ৫০ কন্যা ও এক পুত্র জন্ম নেয়। পুত্রের নাম নেরাইতেস (Nerites)। তাদের কন্যারা পরিচিত ছিল নেরেইদ্স (Nereids) নামে।

৩) হাইপেরিয়নথেইয়া পরিবার (আকাশের দেব-দেবী)

হাইপেরিয়ন আলো আর থেইয়া ছিল ইথারের (aether) দেবী। এই যুগলের তিন সন্তান- সূর্যদেব হেলিয়স (Helios, রোমক নাম Sol), চন্দ্রদেবী সিলিনি (Selene, রোমক নাম Lunos) ও ঊষাদেবী ইয়স (Eos, রোমক নাম Aurora)।

৪) কয়উসফয়বে (Phoebe) পরিবার

কয়উস স্বর্গীয় অক্ষ (celestial axis) ও ফয়বে চন্দ্রদেবী। ফয়বের পরে সিলিনি চন্দ্রদেবী হিসেবে আবির্ভূত হয়। কয়উস ও ফয়বের দুই কন্যা ও এক পুত্র ছিল। দুই কন্যা হলো মাতৃত্বের দেবী লেটো ও দেবী এসতেরিয়া। পুত্রের নাম লেনানতস

লেনানতস বিয়ে করেছিল জলপরী (ওশেনিদ) পেরিবোয়াকে (Periboa)। লেনানতস ও পেরিবোয়ার কন্যা মৃদু-মন্দ বাতাসের দেবী ওউরা

৫) ক্রাইয়াস, ইয়াপেতুস, নিমোসাইনেথেমিস

দ্বাদশ তিতানদের মধ্যে ক্রোনাস ও রেয়া, অশিয়ানোস ও তেথুস, হাইপেরিয়ন ও থেইয়া এবং কয়উস ও ফয়বে যেভাবে পরিবার গড়ে তুলেছিলো বাকী চারজন (দুই পুরুষ তিতান ক্রাইয়াস ও ইয়াপেতুস এবং দুই মহিলা তিতান থেমিস ও নেমোসাইনে) সেভাবে নিজেদের মধ্যে কোন পরিবার গড়েনি। তাদের পরিবার গড়ে ওঠে অন্যদেরকে নিয়ে।

৫.১ ক্রাইয়াস ও ইউরিবিয়া পরিবার

ক্রাইয়াসের পরিবার গড়ে ওঠে গাইয়া ও পন্তাসের কন্যা ইউরিবিয়াকে নিয়ে। ইউরিবিয়া ছিল সমুদ্রজ্ঞান সম্পন্ন এক দেবী। এ পরিবারে তিন সন্তান-সন্ধ্যা দেব এস্ত্রিয়াস (Astraeus), প্রলয় দেব পারসিজ (Perses) ও যুদ্ধ দেব প্যালাস (Pallas)।

কয়উস ও ফয়বের কন্যা এসতেরিয়ার সাথে পারসিজের মিলনে জন্ম নেয় ডাকিনীবিদ্যার দেবী হাকাতি (Hecate)।  সন্ধ্যা দেব এস্ত্রিয়াস এবং হাইপেরিয়ন ও থেইয়ার কন্যা ঊষাদেবী ইয়স তাদের পরিবার গড়ে তোলে। অন্যদিকে, যুদ্ধ দেব প্যালাসের পরিবার গড়ে ওঠে নিশাদেবী নিক্সকে (আদিম তিন দেবীর একজন) নিয়ে। এস্ত্রিয়াস ও প্যালাসের বংশ পরিচয় নিম্নে তুলে ধরা হলো।

ইউরিবিয়া ও ক্রাইয়াস পরিবার

৫.২ ইয়াপেতুস ও জলপরী (ওশেনিদ) ক্লাইমিনি পরিবার

তিতান ইয়াপেতুসের ঔরসে ক্লাইমিনির গর্ভে জন্ম নেয় চার দেবতা- এটলাস, প্রমিথিউস, এপিমেথিউস, ও মেনোতিয়াস। তিতানের যুদ্ধে এটলাস ও মেনোতিয়াস তিতানদের পক্ষে যুদ্ধ করে। এ যুদ্ধে জিউস মেনোতিয়াসকে পরাজিত করে তারতারাস নরকে  আটকে রাখে। এটলাসকে সে ভিন্ন ধরনের শাস্তি দিয়েছিল। তার কাজ ছিল স্বর্গকে কাঁধে করে ধরে রাখা। এ জন্য এটলাসের মূর্তিকে বিশ্ব ঘাড়ে নিয়ে দড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

এটলাসের কন্যার নাম দাইওনি (Dione)। তবে অনেকে মনে করে, দাইওনি একজন জলপরী (ওশেনিদ, অশিয়ানোস ও তেথুসের কন্যা)। তাকে রোমান প্রেমের দেবী ভেনাসও মনে করা হয়। ভালোবাসা, সৌন্দর্য ও যৌন দেবী আফ্রোদাইতির সাথেও দাইওনির নাম জড়িত। ধারণা করা হয় যে, জিউসের ঔরসে তার গর্ভে আফ্রোদাইতির জন্ম হয়েছে।

ত্যানতালাসকে (Tantalus) নিয়ে গড়ে ওঠে দাইওনির পরিবার। ত্যানতালাস ছিল সিপিলুসের (Sipylus, সম্ভবত বর্তমান তুরস্কের কোন অঞ্চল) রাজা। সে দেবতাদের অমৃত সূধা ( nectar and ambrosia) চুরি করে অন্য মানুষের কাছে চালান করেছিল। অথবা, দেবতাদের অন্তর্দৃষ্টির পরীক্ষা করার জন্য সে তাদেরকে নিমন্ত্রণ করে। তারপর নিজের পুত্র পেলপস (Pelops) কুচি কুটি করে কেটে সিদ্ধ করে তা দিয়ে স্যুপ বানিয়ে তাদেরকে খেতে দেয়। অন্য দেবতারা সেটা বুঝতে পারলেও দেবী থেমিস বিষন্নতার কারনে বিষয়টা খেয়াল করেনি। সে মনের ভুলে পেলপসের মাংস ভক্ষণ করে। এ ঘটনায় রুষ্ট হয়ে জিউস তাকে চিরন্তন এক শাস্তি দিয়েছে। গ্রিক পুরাণের নরক তারতারাসে একটি গাছের নিচে পানির পুলের মধ্যে তাকে রাখা হয়েছে। গাছের ফল তার হাতের কাছে কিন্তু সে ধরতে পারে না; আবার সে যখন পুলের পানি পান করতে যায়, তখন পানি আস্তে করে নীচে নেমে যায়। ত্যানতালাসের এ শাস্তিকে কেন্দ্র করে ইংরেজিতে Tantalean punishments বাগধারাটি প্রচলিত হয়েছে।  দাইওনি ও ত্যানতালাস পরিবারের পরিচয় নিম্নে তুলে ধরা হলো।

দাইওনি ও ত্যানতালাস পরিবার

গ্রিক পুরাণ মতে, প্রমিথিউস মানুষ সৃষ্টি করেছিল। তাই সে ছিল মানুষের সবচেয়ে উপকারি বন্ধু। সে মানুষকে সোজা হয়ে হাটতে শেখালো এবং অন্যান্য জীব থেকে মানুষকে মহত্তর বলে ঘোষণা দিল। সে ও তার ভাই এপিমেথিউস মানুষের জীবন ধারনের সমস্ত প্রয়োজনীয় উপকরন সরবরাহ করে। সে মানুষের জন্য সূর্যের কাছ থেকে মশাল জ্বালিয়ে আনে এবং মানুষকে আগুন উপহার দেয়। দেবতা জিউস মানুষকে প্রমিথিউসের এই উপহার মেনে নিতে পারেনি। শাস্তি স্বরূপ জিউস প্রমিথিউসকে পাহাড়ের সাথে শৃঙ্খলিত করে রাখে। প্রতিদিন প্রমিথিউসের একটি নতুন কলিজা জন্মাতো আর একটি ঈগল রোজ এসে সেই কলিজা খেয়ে যেত। এভাবেই তার শাস্তি চলছিল। পরে হারকিউলিস তাকে মুক্ত করে।

এর পরেও জিউস থামেনি। জিউস পৃথিবীর তাবৎ সৌন্দর্য দিয়ে গড়ে তোলে প্রথম মানবী পরমা তিলোত্তমা প্যানডোরাকে। প্যানডোরাকে পৃথিবীতে পাঠানোর সময় দেবতারা একটি বাক্স দিয়ে তা না খোলার জন্য বলে দেয়। পরে এপিমেথিউস তাকে বিয়ে করে। তাদের কন্যার নাম পিরা (Pyrrha)।

নারী জাতি কৌতূহলের দাস। নিজেকে সংবরণ না করে প্যানডোরা খুলে ফেলে বাক্সের ঢাকনা। ঘটে চরম বিপত্তি। একে একে বের হতে থাকে দুঃখ-যন্ত্রণা, রোগ-শোকসহ পৃথিবীর যাবতীয় অশান্তি। ভয় পেয়ে প্যানডোরা বন্ধ করে বাক্সটি। সেখানে শুধু অবশিষ্ট থাকে ‘আশা’। এজন্যই মানুষ চরম দুঃখের মাঝেও আশায় বুক বাঁধে।

৫.৩ নিমোসাইনে, থেমিস ও জিউস পরিবার

নিমসাইনে গ্রিকদের স্মৃতি দেবী। তার নাম হতে ইংরেজি শব্দ mnemonics বা স্মৃতিবর্ধনবিদ্যা শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। জিউস পর পর নয় রাত নিমসাইনের সাথে মিলিত হলে জন্ম নেয় সুর, সঙ্গীত, সাহিত্য এবং নৃত্যকলার নয় জন দেবী। এরা নয় মিউজ নামে পরিচিত। এরা হলো প্রধান মিউজ এবং মহাকাব্য বা বীরত্বগাথার মিউজ কাল্লিয়োপে; ইতিহাসের মিউজ ক্লিও; ভালবাসার কবিতা, গানের কথা ও বিবাহের গানের মিউজ এরাতো; সুর ও গীতিকাব্যের মিউজ এউতের্পে; বিয়োগান্তক নাটকের মিউজ মেল্পোমেনে; পবিত্র গান, বাগ্মিতা, গীতিকাব্য, সঙ্গীত ও অলঙ্কারের মিউজ পলিম্নিয়া; বৃন্দগীতি ও নৃত্যের মিউজ তের্প্সিকোরে; মিলনান্তক নাটক ও রাখালি কবিতার মিউজ থালিয়া; এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের মিউজ উরানিয়া।

বিভিন্ন আদালতে বাইরে দাড়িপাল্লা হাতে এক নারী মূতি দেখা যায়। এ হলো আইন-শৃঙ্খলার দেবী থেমিস। জিউসের সাথে থেমিসের মিলনে আইন-শৃঙ্খলার তিন দেবী হরাই (Horae) এর জন্ম হয়। এরা হলো ন্যায়বিচারের দেবী ডাইকি, আইনের দেবী ইউনোমিয়া ও শান্তি দেবী আইরিন

ক্রোনাস যখন নিজের পিতা ইউরেনাসকে সিংহাসনচ্যুত করেছিলো, তখন ইউরেনাস তাকে অভিশাপ দিয়েছিলো যে, ক্রোনাস নিজের পুত্র দ্বারা সিংহাসনচ্যুত হবেন। ইউরেনাসের অভিশাপের ভয়ে ক্রোনাস রেয়ার গর্ভের সব সন্তানকে জন্মের সাথে খেয়ে ফেলতে শুরু করে। যখন জিউসের জন্ম হলো তখন রেয়া একটি বুদ্ধি বের করলো। সে জিউসকে লুকিয়ে রেখে একটি পাথরকে কাপড়ে পেঁচিয়ে ক্রোনাসের হাতে দিল। ক্রোনাস সেটাকে খেয়ে ফেললো। এর পরে জিউস যখন বড় হলো তখন সে তিতানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধ তিতানের যুদ্ধ (Titanomachy) নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে জিউস তার পিতা ক্রোনাসকে ক্ষমতাচ্যুত করে, তার পেট চিরে বাকী ভাইবোনকে রক্ষা করে, অন্যান্য তিতানদেরকে নরক তারতারাসে আটকে রাখে।

এভাবে জিউস ও সমসাময়িক অন্যান্য দেবদেবীদের নিয়ে তৃতীয় প্রজন্ম তথা অলিম্পিয়ান দেবদেবীদের রাজত্ব শুরু হয়।

পুরাণ গাঁথা