X

রামায়ণ মহাকাব্যের সহজপাঠ- চরিত্র অভিধান

রামায়ণ মহাকাব্যের চরিত্র চিত্রণ

রামায়ণ মহাকাব্য এক অসাধারণ সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যে ও ভাষায় রামায়ণ মহাকাব্যের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। বাংলা ভাষার অমৃত সূধা পান করতে হলে রামায়ণ-এর মতো মহাকাব্য গুলোর চরিত্র ও ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

রামায়ণ মহাকাব্যের কিছু চরিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে। তবে এ মহাকাব্যের অনেক চরিত্র সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণা নেই। হিন্দু পুরাণের বিশালতা, তথ্যের জটিলতা ও অস্পষ্টতার কারণে রামায়ণ-এর মতো মহাকাব্য আমাদের জন্য সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে না। রামায়ণ-কে সহজপাঠ্য করে তুলতে এ মহাকাব্যের চরিত্রগুলোকে সহজ ও বোধগম্য করে তুলে ধরা হলো।

হিন্দু পুরাণগুলোতে দুটি শুক্তিশালী রাজবংশের পরিচয় পাওয়া যায়- সূর্য বংশ ও চন্দ্র বংশ। সূর্য বংশকে ঘিরে রামায়ণের চরিত্রাবিধান তৈরী হয়েছে। তাই এ মহাকাব্যের চরিত্রগুলো বোঝার জন্য সূর্য বংশ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

হিন্দুধর্মের তিন প্রধান দেবতা-ব্রহ্মা, বিষ্ণুশিব। ব্রহ্মা সৃষ্টি, বিষ্ণু লালন ও শিব প্রলয়ের দেবতা। শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়কর্তা- পরমেশ্বর (বা মহেশ্বর) হিসেবেও স্বীকৃত। এই তিন দেবতাকে- ব্রহ্মা (পৃথিবী)  সৃষ্টি, বিষ্ণু (জল) লালন ও শিব (আগুন)- এক সঙ্গে ত্রিমূর্তি বলে।

ব্রহ্মার মানস সন্তান (মানসপুত্র, মানসকন্যা)  ছিল।  মানসপুত্ররা প্রজাপতি (বা ঋষি, মহর্ষি, মহামুনি ) নামে পরিচিত। এই সন্তানগণ তার শরীর থেকে সৃষ্টি হয়নি, মন থেকে সুষ্টি হয়েছে। এই কারণে এদেরকে মানসপুত্র বা মানসকন্যা বলা হয়। ব্রহ্মার ঠিক কতজন মানস সন্তান ছিল তা বলা মুশকিল। সচরাচর যে সকল মানসপুত্রের নাম নাম পাওয়া যায় তারা হলো- সপ্তর্ষি (মরীচি, অত্রি, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠ), দক্ষ, ভৃগু, নারদ, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, কশ্যপ, পর্বত ইত্যাদি। এই প্রজাপতিরাই মানবজাতির আদিপিতা। এরা ব্রহ্মাকে পৃথিবী সৃষ্টির কাজে সহায়তা করেছিলো।

দক্ষ তার কন্যাদেরকে (অদিতি, দিতি, বিনতা ইত্যাদি) কশ্যপকে সমর্পণ করেছিলো। এর মধ্যে এক কন্যা  অদিতির গর্ভে দেবতা, আরেক কন্যা দিতির গর্ভে দানবদের জন্ম হয়।হিন্দুশাস্ত্রে রাক্ষস বা অসুর, রাক্ষস ও দানব ভিন্ন। রাক্ষস ও দানবদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিলো না। অদিতির গর্ভের দেবতারা আদিত্য (সূর্য দেবতা) নামে পরিচিত। এদের সংখ্যা বারো (মতান্তরে ৭ বা ৮) জন বলে এদেরকে একত্রে দ্বাদশ আদিত্য বলে। এই দ্বাদশ আদিত্যের এক জনের নাম বিবস্বান।

বিবস্বানের পুত্রের নাম বৈবস্বত মনু। সে ছিল মহামুনি। বৈবস্বত মুনির পুত্রের নাম ইক্ষ্বাকু (ইক্ষবাকু)। তিনি ইক্ষবাকু রাজবংশ তথা সূর্যবংশের প্রথম রাজা। তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশে অযোধ্যা শহরকে কেন্দ্র করে কোশাল রাজ্য (খ্রি.পূ ৭০০-৫০০) গড়ে তুলে ছিলেন। তার শত পুত্র ছিল। এদের এক জনের নাম ছিল নিমি। সে ছিল মিথিলা (Kingdom of Videha) রাজ্যের রাজা।

সূর্যবংশীয় রাজাদের বংশ পরম্পরায় কোশাল রাজ্য শাসন চলতে থাকে। এদের এক জনের নাম ছিল দিলীপ। দিলীপের পুত্র রঘু, রঘুর পুত্র অজ ও অজের পুত্র দশরথ। অন্যদিকে, নিমির বংশ পরম্পরায় মিথিলার শাসনে যে রাজা আসে তার নাম জনক।  কোশাল রাজ্যের অযোধ্যায় রাজা দশরথের ঘরে রাম আর মিথিলায় রাজা জনকের ঘরে সীতার জন্ম হয়েছিল। রাম ও সীতা রামায়ণ মহাকাব্যের অন্যতম প্রধান চরিত্র।

কৌশল্যা, কৈকেয়ীসুমিত্রা রাজা দশরথের তিন স্ত্রী। কিন্তু তাদের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। পুত্র সন্তানের জন্য সে এক যজ্ঞের আয়োজন করে। যজ্ঞের পায়েস সে দুই ভাগ করে কৌশল্যাকৈকেয়ীকে দেয়। এরা দুজন মিলে তাদের পায়েসের অংশ সুমিত্রাকে দেয়। কৌশল্যার গর্ভে এক পুত্র রাম (জ্যেষ্ঠপুত্র), কৈকেয়ীর গর্ভে এক পুত্র ভরত এবং সুমিত্রার গর্ভে দুই পুত্র  লক্ষ্মণশত্রুঘ্ন (যমজ) মোট চার সন্তানের জন্ম হয়। সীতা রামের স্ত্রী এবং রাম ও লক্ষণ বৈমাত্রেয় ভ্রাতা।

রামায়ণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মন্থরামন্থরা রাণী কৈকেয়ীর কূটবুদ্ধি সম্পন্না কুঁজো দাসী।  রাজা দশরথের শম্বরাসুরের সাথে যুদ্ধ করেছিলো। এ যুদ্ধে সে আহত হয়। এ সময় মন্থরা দশরথকে সেবা করে সুস্থ করে তোলে। এ জন্য দশরথ কৈকেয়ীকে দুটি বর (ইচ্ছাপূরণ) দিতে চেয়েছিল। যখন রামের রাজ্যাভিষেকের আয়োজন চলছিল, তখন মন্থরার পরামর্শে কৈকেয়ী সেই দুটি বর চায়। একটি ভরতকে রাজ্যে অভিষিক্ত করা এবং দ্বিতীয়টি রামকে চৌদ্দ বছরের জন্য বনে পাঠানো। সত্য রক্ষার জন্য দশরথ এই বর দিতে বাধ্য হয়। রামের বনবাসের ষষ্ঠ দিন দশরথ পুত্রশোকে মারা যায় ।

রাম  হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। হিন্দু ধর্মালম্বীরা বিষ্ণুর দশাবতারে (মতান্তরে বাইশ) বিশ্বাস করে। অবতার হলো কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে দেবতাদের মানুষ রূপে জন্মগ্রহণ। বিষ্ণু এ যাবৎ নয় বার অবতার রূপে এসেছে। এ রূপ গুলো হলো-  মৎস্য (মাছ), কূর্ম (কচ্ছপ), বরাহ (বন্য শূকর), নৃসিংহ (অর্ধ মানুষ অর্ধেক সিংহ), বামন (খর্বকায় মানুষ), পরশুরাম (পরশু অর্থাৎ কুঠারধারী রাম), রাম (অযোধ্যার যুবরাজ), বলরাম (শ্রীকৃষ্ণের ভ্রাতা) ও গৌতম বুদ্ধ (বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা)। (মতান্তরে, শ্রীকৃষ্ণ বিষ্ণুর অষ্টম ও তার ভাই বলরাম নবম অবতার)। কল্কি হিসেবে ভবিষ্যতে বিষ্ণুর অবতারণা হবে বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করে।

রামের দুই যমজ পুত্রের নাম লব ও কুশ। সীতার দ্বিতীয়বার বনবাস কালে এদের জন্ম হয়। রামের সাথে লব ও কুশের একবার যুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধে রাম পরাজিত হয়।

দেবতা ইন্দ্র ব্রহ্মার এক মানস কন্যা অহল্যাকে ধর্ষণ করেছিল। রামের পা স্পর্শ করে এই অহল্যার শাপমোচন হয়েছিল।

রামের মতো সীতাও এক অবতার। সে দেবতা বিষ্ণুর স্ত্রী ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর অবতার। সীতার জন্ম একটু অস্বাভাবিক। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জমি চাষ করার সময় লাঙলের আঘাতে ভূমি বিদীর্ণ করে সীতার জন্ম হয়। সীতা চরিত্রের মূল লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো সীতার সতীত্ব বারংবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে, দুই বার বনবাসে যেতে হয়েছে, এবং অবশেষে লজ্জা ও ক্ষোভে জগদ্ধাত্রীর সহায়তায় তাকে পাতালে প্রবেশ করতে হয়েছে।

রামায়ণের কয়েকটি সংকলনে মায়া সীতা বা ছায়া সীতা নামে একটি চরিত্রের অবতারণা করা হয়েছে। রাবণ আসল সীতার স্থলে তাকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। আরো মনে করা হয়, সীতা পূর্বজন্মে বেদবতী ছিলেন, যাকে রাবণ উৎপীড়ন করার চেষ্টা করেছিল। পরজন্মে সীতা দ্রৌপদী বা দেবী পদ্মাবতী রূপে পুনর্জন্ম লাভ করে।

রামের ভাই লক্ষ্মণকে শেষনাগের অবতার মনে করা হয়।। কশ্যপ মুনির ঔরসে কদ্রুর গর্ভে জন্ম নেয়া সাপ শেষনাগ। এর অন্য নাম বাসুকি বা অনন্তনাগ।  দেবতা শিবের গলায় যে সাপটি পেঁচানো থাকে এটাই শেষনাগ। এর বোনের নাম মনসা  (এ সর্প দেবী শিবের কন্যা হিসেবেও পরিচিত। অন্যনাম নিত্যা, পদ্মাবতী ইত্যাদি)। লঙ্কার যুদ্ধে লক্ষণ রাবণের পুত্র মেঘনাদকে বধ করেন।  লক্ষ্মণ সীতার ছোট বোন উর্মিলাকে বিবাহ করেছিলেন। তার দুই পুত্রের নাম ছিল অঙ্গদ ও চন্দ্রকেতু। বর্তমান উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের রাজধানী লক্ষ্ণৌ শহরটি সে প্রতিষ্ঠা করেছিল বলে ধারণা করা হয়।

রামের আরেক ভাই ভরত। রাম বনবাসে থাকা কালে ভরত অযোধ্যার রাজা ছিলো। যত দিন রাম বনবাসে ছিল, ভরত রামের খড়মকে সিংহাসনে রেখে রাজ্য শাসন করে। রামের প্রত্যাবর্তনের পর সে রামকে রাজ্য ফিরিয়ে দেয়। ভরত সীতার চাচাতো বোন (কুশধ্বজের কন্যা) মাণ্ডবীকে বিয়ে বরে। তক্ষ ও পুষ্কল নামে তাদের দুই পুত্র।

লক্ষণের ছোট ভাই শত্রুঘ্ন। সে কুশধ্বজের কন্যা শ্রুতকীর্তিকে বিয়ে করে। তাদের পুত্র সুবাহু ও শত্রুঘাতী। শত্রুঘ্ন মথুরা রাজ্যের মধুদৈত্যের পুত্র লবণাসুরকে হত্যা করে।

কৌশল্যার গর্ভে দশরথের কন্যা রামের বড় বোন শান্তা। দশরথের ভায়রা অঙ্গরাজ (বঙ্গদেশ) রোমপাদ শান্তাকে দত্তক নিয়েছিল। শান্তা ঋষ্যশৃঙ্গকে বিয়ে করেছিল। ঋষ্যশৃঙ্গের হরিণের মতো শিং ছিলো। সে দশরথের পুত্র সন্তানের জন্য যজ্ঞের আয়োজন করে।

রামায়ণের একচি ছোট চরিত্র অন্ধ ঋষিদ্বয় শান্তনু এবং মলয়ার পুত্র শ্রবণ কুমার। সে নিষ্ঠার সঙ্গে অন্ধ মা-বাবার সেবা করতো। শ্রবণ নিজে মা-বাবাকে একটি ভারে তুলে এদিকে সেদিকে নিয়ে যেতেন। একদিন রাজা দশরথ শিকারের উদ্দেশ্যে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। শ্রবণ বাবা-মার জন্য নদীতে জল আনতে গিয়েছিল। পানিতে শব্দ শুনে সেখানে তীর মারে দশরথ, মারা যায় শ্রবণ কুমার। শ্রবণের মা-বাবা দশরথকে অভিশাপ দিয়ে বলেছিলো যে, তারও পুত্রশোকে মৃত্যু হবে।

রামায়ণে উল্লিখিত স্থানসমূহের মধ্যে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ- কোশাল, মিথিলা, অঙ্গদেশ, দণ্ডকারণ্য, কিষ্কিন্ধা ও লঙ্কা। কোশাল, মিথিলা ও অঙ্গদেশের কথা উপরে বলা হয়েছে। বাকী স্থানগুলোর একটি দণ্ডকারণ্য বিশাল এক অরণ্যময় অঞ্চল ভারতের বর্তমান মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র এই চারটি রাজ্য ব্যাপী বিস্তৃত। এখানে রামের সাথে সুগ্রীবের দেখা হয়। কিষ্কিন্ধা ছিল বানরদের রাজ্য। ভারতের বর্তমান কর্নাটক প্রদেশের বেল্লার জেলা সংলগ্ন অঞ্চলে এ রাজ্য ছিল। আর লঙ্কা কথা তো আমরা সবাই জানি, এটি শ্রীলংকা।

রামায়ণ মানচিত্র

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, “বানর” (vanara) একটি সংস্কৃত শব্দ। ‘বান’ হলো ‘বন’ আর ‘নর’ হলো ‘মানুষ’। শব্দগত ভাবে ‘বানর’ অর্থ ‘বনমানুষ’। হিন্দু ধর্মে ‘বানর’ বলতে এক ধরনের সম্প্রদায়ের মানুষকে বোঝানো হতো যারা বনে বাস করতো। সুতরাং, কিষ্কিন্ধা ছিল বানরদের রাজ্য, অর্থাৎ ঐ সকল সম্প্রদায়ের লোকের রাজ্য। এ নিবন্ধে বানর শব্দে monkey নয়, ঐ সম্প্রদায়ের লোককে বোঝানো হয়েছে।

রামায়ণে দুটি মজার পাখি আছে- জটায়ূগরুড়। কশ্যপ ও বিনতার এক সন্তানের নাম ছিল অরুণ। সে দ্বাদশ আদিত্যের কোন এক সূর্য দেবতার অশ্বচালক ছিল। সে অরুণী নামে পুনর্জন্ম লাভ করে ও বানর বৃক্ষরাজকে বিয়ে করে।  এদের পুত্রের নাম সুগ্রীব ও বালী। রামায়ণ মহাকাব্যে এদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

জটায়ূ অরুণের সন্তান। রাবণ যখন সীতাকে হরণ করছিল তখন জটায়ু তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে; কিন্তু পারেনি৷  সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের লেখক চরিত্রের ছদ্মনাম জটায়ূ (লালমোহন গাঙ্গুলি)। জটায়ুর এক সহোদর ছিল, সম্পাতি। সীতাকে খুঁজতে সবাই যখন ব্যর্থ হলো, তখন এ শকুন লঙ্কায় সীতাকে খুঁজে পায়। এ জন্যই বলে শকুনের চোখ।

অরুণের ভাইয়ের নাম গরুড়। সে ছিল দেবতা বিষ্ণুর বাহন। লঙ্কা যুদ্ধে গরুড়ের ভূমিকা আছে। উল্লেখ্য, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মঙ্গোলিয়ার জাতীয় প্রতীকে গরুড় রয়েছে।  এই গরুড়ের নামে ইন্দোনেশিয়ার বিমান সংস্থার নাম রাখা হয়েছে।

বায়ু (বা পবন, প্রাণ) নামে হিন্দুদের এক দেবতা আছে। তার মানস পুত্র হনুমান। (বায়ু দেবতার আরেক মানস পুত্রের নাম ভীম। সে মহাভারত মহাকাব্যের পঞ্চপাণ্ডব এর একজন)। হনুমানের মা অঞ্জনা ছিল পুঞ্জিকস্থলা নামের এক অপ্সরার মানব রূপ। অপ্সরা হলো মেঘ এবং জল থেকে উদ্ভুদ্ধ নারী আত্মা। দেবতা বায়ু দেবতা শিবের শক্তি এই অঞ্জনার গর্ভে সঞ্চার করলে কিষ্কিন্ধার বানর কেশারির ঔরষে বানর হনুমান জন্ম নেয়। চিরকুমার হনুমান শক্তি, জ্ঞান ও ভক্তির প্রতীক ও এক জন দেবতা। এ জন্য হনুমানকে শিবের অবতারও বলে।

রামায়নের পটভূমিতে কিষ্কিন্ধার রাজা ছিল বৃক্ষরাজ ও অরুণার পুত্র বানর বালী। তার ভাই সুগ্রীব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বানরবীর। কিন্তু বালী সুগ্রীবকে নির্বাসনে পাঠায় ও তার স্ত্রী তারাকে বলপূর্বক নিজের রানী করে। রাম সুগ্রীবকে সহায়তা করে। পিছন থেকে তীর ছুড়ে রাম বালীকে হত্যা করে। সুগ্রীব কিষ্কিন্ধা রাজ্য ফিরে পায়। বালীর পুত্রের নাম অঙ্গদ (লক্ষণের এক পুত্রের নামও অঙ্গদ। দু’জন ভিন্ন)। সুগ্রীব অঙ্গদকে যুবরাজের মর্যাদা দিয়েছিল।

বানর রাজ্যের আরেক চরিত্র জাম্ববান। রামকে সহায়তা করতে দেবতা ব্রহ্মা তাকে সৃষ্টি করেছিল। তবে জাম্ববান ছিলো ভাল্লুক প্রজাতির। এই জাম্ববানের কন্যা জাম্ববতী (দূর্গা বা পার্বতীর অবতার) শ্রীকৃষ্ণের এক স্ত্রী।

রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্যসমূহে প্রবাদপ্রতিম প্রধান পাঁচটি নারী চরিত্র আছে। এদেরকে পঞ্চকন্যা বলে। এর মধ্যে রামায়ণে তিনটি ও মহাভারতে দুটি। রামায়ণের চারটি চরিত্র হলো অহল্যা, মন্দোদরী (রাবণের স্ত্রী) আর এই সুগ্রীবের স্ত্রী তারা (দেবতা বৃহস্পতির স্ত্রীর নামও তারা, তবে দুই জন ভিন্ন)। মহাভারতের দুই জন হলো দ্রৌপদীকুন্তী। একটু অবাক করার বিষয় এই যে, এই পাঁচ জনের মধ্যে সীতার নাম নেই। (১)

এবার লঙ্কার রাক্ষসদের কথা। ব্রহ্মার মানসপুত্রের মধ্যে যে সপ্তর্ষি ছিল তাদের এক জনের নাম পুলস্ত্য। বিশ্রবা মুনি, অগস্ত্য মুনি, রাক্ষসকিন্নর (ঘোড়ার মতো মুখ ও মানুষের মতো দেহবিশিষ্ট স্বর্গীয় সুকন্ঠ গায়ক) এই পুলস্ত্যর সন্তান। বিশ্রবার ঔরসে দেববর্ণিনীর (ঋষি ভরদ্বাজের মেয়ে/স্ত্রী) গর্ভে কুবের নামে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। কুবের ছিল  ছিলেন ধনৈশ্বর্যের দেবতা৷ বাংলায় এ জন্য ‘কুবেরের ধন’ বাগধারা আছে।

বিশ্রবার ঔরসে রাক্ষসী নিকষার (কৈকসী বা কেশিনী) গর্ভে জন্ম নেয় তিন পুত্র ও এক কন্যা। তিন পুত্র  রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ। কন্যার নাম শূর্পণখা। রামায়ণ মহাকাব্যে এদের সবারই যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

রাবণের প্রকৃত নাম দশগ্রীব। সে রামায়ণের প্রধান খলনায়ক (বা অ্যান্টাগনিস্ট)। সে ছিল লঙ্কা দ্বীপের রাজা। রাবণের দশ মাথা ও দশ হাত ছিল। সে কখনো নিষ্ঠুর শাসক ছিল না। রাবণ এবং তার ভাই কুম্ভকর্ণ এক সময় দেবতা বিষ্ণুর দ্বাররক্ষক ছিলো। রাবণ ছিল অসামান্য বীণাবাদক, দক্ষ চিকিৎসক ও জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী। চার বেদ এবং ছয় উপনিষদ তার নখদর্পণে ছিল। মাইকেল মদূসুদন দত্ত মেঘনাবধ কাব্য-এ রাবণকে একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

রাবণের স্ত্রী মন্দোদরীর কথা আগেই বলেছি। সে ছিল অসুরদের রাজা মায়াসুর ও অপ্সরা হেমার কন্যা। রাবণ ও মন্দোদরীর দুই পুত্র- মেঘনাদ (বা ইন্দ্রজিৎ) ও অক্ষয়কুমার। মন্দোদরী চরিত্রের সাথে মহাভারতের গান্ধারী চরিত্রের বেশ মিল। দু’জনই নীতিপরায়ণা, ধর্মপ্রাণা কিন্তু অতিমাত্রায় পতিব্রতা। রাবণের অন্য স্ত্রী ধন্যমালিনীর গর্ভে রাবণের সন্তানরা হলো অতিকায়, নারান্তক ও দেবান্তক। রাবণের আরেক পুত্রের নাম ত্রিশিরা

এ রকমও প্রচলিত আছে যে, সীতা আসলে রাবণ ও মন্দোদরীর কন্যা। রাবণের শ্বশুর মায়াসুর রাবণকে সাবধান করেছিল যে, মন্দোদরীর কোষ্ঠীতে আছে, তার প্রথম সন্তান তার বংশের ধ্বংসের কারণ হবে। তাই এই সন্তানটিকে জন্মমাত্রই হত্যা করতে হবে। মায়াসুরের উপদেশ অগ্রাহ্য করে রাবণ মন্দোদরীর প্রথম সন্তানকে একটি ঝুড়িতে করে জনকের নগরীতে রেখে আসেন। জনক তাকে দেখতে পান এবং সীতারূপে পালন করেন। (২) 

ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ সমগ্র মানব, দানব, অন্যান্য সৃষ্টি ও দেব-দেবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বীরযোদ্ধা ছিল। সে ছিল দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য-এর শিষ্য। সে দুইবার রাম ও লক্ষ্মণকে পরাভূত করে। কিন্তু তৃতীয় বারে তার চাচা বিভীষণের সহায়তার কারণে লক্ষ্মণ যজ্ঞাগারে উপস্থিত হয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় তাকে বধ করে। মেঘনাদ নাগরাজ শেষনাগের কন্যা সুলোচনাকে বিবাহ করেছিলেন। (মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত মেঘনাদবধ কাব্যএ মেঘনাদের স্ত্রীর নাম প্রমীলা।)

‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ প্রবাদের সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত। এই প্রবাদের মূলে রয়েছে রাবণের ভাই বিভীষণের বিশ্বাসঘাতকতা। রাম ও রাবণের মেঘের অন্তরালে যুদ্ধ চলাকালে রাম রাবণকে চিহ্নিত করতে পারছিল না। তখন বিভীষণ রামকে রাবণ হত্যার উপায় জানিয়ে দিয়েছিল। রাবণ-বধের পর বিভীষণ লঙ্কার সিংহাসনে বসে। সে রাক্ষস নীতি ছেড়ে ধর্মের পথে চলা শুরু করে৷ তার স্ত্রী সরমা ও কন্যা নাম্নী ও ত্রিজটা

রাবণের আরেক ভাইয়ের নাম কুম্ভকর্ণ। সে ধার্মিক, বিচক্ষণ ও অজেয় ছিলো। দেবতা বিষ্ণু কুম্ভকর্ণের প্রতি বেশ সদয় ছিলো। সে তাকে বর চাওয়ার জন্য বললো। কুম্ভকর্ণ ‘ইন্দ্রাসন’ বলতে চেয়েছিলো; কিন্ত দেবতা ইন্দ্রের অনুরোধে দেবী সরস্বতী তার জিহ্বা আড়ষ্ট করে দেয়। ফলে সে ‘নিদ্রাসন’ চেয়েছিলো (অথবা  ‘নির্দেবত্বম’ (দেব নির্বাণ) চাওয়ার বদলে ‘নিদ্রাবত্বম’ চেয়েছিলো)। সে টানা ছয়মাস যাবৎ ঘুমিয়ে থাকতো এবং ঘুম ভাঙলে হাতের সামনে যা পেত তা-ই খেয়ে ফেলতো।  লঙ্কাযুদ্ধে কুম্ভকর্ণ রামের হাতে নিহত হয়। স্ত্রী বজ্রমালার গর্ভে কুম্ভকর্ণের দুই পুত্র- কুম্ভ ও নিকুম্ভ; আর স্ত্রী কর্কটীর গর্ভে এক পুত্র ভীমাসুর।

রাবণের এক বোন শূর্পণখাশূর্পণখা অর্থ ‘কুলার মতো নখ’। সে বিদ্যুজ্জিহ্বা (বা দুষ্টুবুদ্ধি) নামের এক দানবকে বিয়ে করেছিলো। এতে রাবণ তার উপর অখুশী ছিলো। দুষ্টুবুদ্ধি রাবণকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। তবে রাবণ তাকে মেরে ফেলে। শূর্পণখা রাবণের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে বিধবার জীবন-যাপন শুরু করে। এ সময় সে শাম্ভৃ নামে এক পুত্রসন্তান জন্ম দেন৷ ঘটনাক্রমে শাম্ভৃ লক্ষ্মণের হাতে নিহত হন৷ পঞ্চবটীবনে (বর্তমান মহারাষ্ট্র রাজ্যের নাশিক জেলাঞ্চল) রাম-লক্ষণকে দেখে শূর্পণখা তাদের প্রেমে পড়ে। রাম ও লক্ষণ দু’জনেই সে প্রেম নাকচ করে দেয়। শূর্পণখা রেগে গিয়ে সীতাকে আঘাত করতে উদ্যত হয়৷ তখন লক্ষ্মণ তার অসি দিয়ে শূর্পণখার নাক-কান কেটে দেয়। লঙ্কায় ফিরে শূর্পণখা সীতাকে বিবাহ করার জন্য রাবণকে প্ররোচিত দেয়। এ সূত্র ধরেই রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিল।  রাবণের সীতা হরণের সাথে গ্রিক পুরাণের প্যারিসের হেলেন অপহরণ ঘটনার মিল রয়েছে।

দণ্ডকারণ্যে তাতাকা নামে এক রাক্ষসী ছিল। তার দুই সন্তান মারীচসুবাহু ঋষিদের যজ্ঞে বিঘ্ন ঘটাতো। এ দুই জন রাম কর্তৃক নিহত হয়েছিলো। মারীচ সোনার হরিণ সেজে রাবণকে সীতা হরণে সহায়তা করেছিলো। লক্ষণে সাথে এ সোনার হরিণের ঘটনা সূত্রে জন্য বাংলায় ‘সোনার হরিণ’ বাগধারা প্রচলিত হয়েছে।

মারীচের পুত্রের নাম ছিলো কালনেমি। হনুমানকে মারতে পারলে লঙ্কারাজ্য ভাগ করে নেওয়া যাবে একথা জানতে পেরে কালনেমি হনুমান নিধনের আগেই লঙ্কা ভাগাভাগি করার কল্পনা করেছিল। এ জন্য বাংলায় ‘কালনেমির  লঙ্কাভাগ’ বাগধারা প্রচলিত হয়। এর অর্থ কোনো বস্তু লাভ করার আগেই তা উপভোগ করার অলীক কল্পনা। (উল্লেখ্য, হিন্দু পুরাণে কালনেমি নামে আরো একটি চরিত্র আছে। সে হলো অসুররাজ হিরণ্যাক্ষের পুত্র। দেবতা বিষ্ণু তাকে হত্যা করেছিলো।)

শবরী ছিল এক শিকারীর (ব্যাধ) কন্যা। নররূপী নারায়ণকে (রাম) দেখার জন্য সে হাজার হাজার বছর মতঙ্গ মুনির আশ্রমে অপেক্ষা করেছিল৷ রামের দেখা পাওয়ার পরে সে মারা যায়। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী তিথি শবরী জয়ন্তী হিসেবে পালিত হয়।

রামায়ণের অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে এক অদ্ভূত চরিত্র মান্ধাতা। মান্ধাতা হলেন সূর্য বংশের এক রাজা যুবনাশ্বের পুত্র। মান্ধাতা মাতৃগর্ভে নয়, পিতৃগর্ভে জন্মেছিল। যুবনাশ্বরের সন্তান ছিল না। তাই সে মুনিদের আশ্রমে গিয়ে যোগ সাধনা শুরু করে। মুনিরা সবাই মিলে যুবনাশ্বর জন্য যজ্ঞ করে  কলসি ভর্তি মন্ত্রপূত জল বেদিতে রেখে দিল।  এই কলসির জল যুবনাশ্বর স্ত্রী পান করলে গর্ভবর্তী হবে। কিন্তু বিধিবাম! রাতে তীব্র তেষ্টা পেলে যুবনাশ্বর সেই জল পান করে। যুবনাশ্বর গর্ভ লাভ হলো। যুবনাশ্বরের পেটের বাম দিক চিড়ে মান্ধাতাকে বের করা হয়। মান্ধাতা হলেন প্রথম সিজারিয়ান শিশু। মান্ধাতা পৃথিবী জয়ের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু লবনাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে সে নিহত হয়। মান্ধাতার শাসন ছিলো সত্য যুগে। তার পরে দ্বাপর, ত্রেতা যুগ পার হয়ে এখন কলি যুগ। সে জন্য অনেক বছরের আগের কিছু বোঝাতে এখন ‘মান্ধাতার আমল’ বাগধারা ব্যবহৃত হয়।

(১) Devika, V.R. (অক্টোবর ২৯, ২০০৬)। “Women of substance: Ahalya”। The Week। 24 (48): 52।

(২) Mani, Vettam (১৯৭৫)। Puranic Encyclopaedia: A Comprehensive Dictionary With Special Reference to the Epic and Puranic Literature। Delhi: Motilal Banarsidass।

পুরাণ গাঁথা