X

গ্রিক পুরাণের সহজপাঠ: আদিম দেব-দেবীগণ (১ম ভাগ)

গ্রিক দেব-দেবীদের জন্ম ও বংশপরিচয়ঃ আদিম দেব-দেবীগণ

সময়ের সাথে বিশ্বাস বদলে যায়। জিউস, এপোলো, আফ্রোদিতি, কিউপিড প্রভৃতি গ্রিক বা রোমক দেব-দেবীদের নিয়ে আজ আমরা অনেক হাসি-ঠাট্টা করি, মজা করি। কিন্তু তিন থেকে চার হাজার বছর আগে তেমনটি ছিলো না। মানুষ তাদেরকে বিশ্বাস করতো, সর্বশক্তিময় বলে জানতো, পূজা-অর্চনা করতো।  অথচ, হায়রে সময়! কে বলতে পারে তিন চার হাজার বছর পরে আজকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরা এই সব বিশ্বাসকে সেই সময়ের মানুষ (বা অন্য কিছু) কিভাবে বিবেচনা করবে!

পুরাণের দেব-দেবীদের জন্ম ইতিহাস নিয়ে মতভেদ ছিল, রয়েছে এবং থাকবে। যে পুরাণ যত বেশী চর্চা হয়, তার মতভেদ তত বেশী বাড়তে থাকে। অন্য সব পুরাণের মতো গ্রিক পুরাণের দেব-দেবীরাও ব্যতিক্রম নয়। গ্রিক ও রোমক – এই দুই সভ্যতার হাত ধরে বেড়ে ওঠা এ পুরাণ আজ পর্যন্ত বিভিন্ন মাধ্যমে, ধারায় চর্চিত হচ্ছে। ফলে গ্রিক দেব-দেবীদের জন্ম কুণ্ডলী এখন রহস্যঘেরা এক গোলক ধাঁধাঁ। তাদের জন্ম, কর্ম, মৃত্যু, কর্মকাণ্ড সব কিছু নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞজনের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।

গ্রিক দেব-দেবীদের তিনটি প্রজন্ম রয়েছে- আদিম, তিতান ও অলিম্পিয়ান। এই তিন প্রজন্মের মধ্যে তৃতীয় প্রজন্ম তথা অলিম্পিয়ানরা সর্বাধিক পরিচিত। শতকের পর শতক ধরে এ ধর্মে বিশ্বাসীরা এদের মন্দির তৈরি করে আরাধনা করেছে।

ক) গ্রিক আদিম দেব-দেবীগণ

‍সৃষ্টির আদিতে ছিলো ক্যাওস (Chaos) বা শূন্য। সে কারো থেকে সৃষ্ট নয়। তার সাথে আরো দুইজন ছিলো- সময় ও নিয়তি। সময়ের নাম ছিলো দেবতা ক্রনোস (Chronos), আর দেবী নিয়তি আনানকে (Ananke)। পরবর্তীতে দ্বাদশ টাইটানের মধ্যে আরেক ক্রনাস (Cronus) পাওয়া যাবে। এই দুই জন্য কিন্তু ভিন্ন। দেবী আনানকের নামে বৃহস্পতি গ্রহের একটি চাঁদের নামকরণ করা হয়েছে।

ক্যাওস থেকে পাঁচ দেব-দেবীর সৃষ্টি- তিন দেবতা ও দুই দেবী। তিন দেবতা হলো নরকের দেবতা তারতারাস (Tartarus), অন্ধকারের দেবতা ইরেবাস (Erebus), কামদেব ইরস (Eros) এবং দুই দেবী গাইয়া (Gaia) বা পৃথিবী ও নিশাদেবী নিক্স (Nyx)। পরবর্তীতে ইরস নামে আরেক কামদেবের পরিচয় পাওয়া যাবে। এই দুই জন এক হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

ধারনা করা হয় যে, ক্রনোস ও আনানকে বা নিক্স থেকে সৃষ্টির দেবতা ফেইনিজ (Phanes) বা প্রতোগোনাস (Protogonus) তৈরি হয়েছিল। ক্রনোর সিলভারের একটি বিশ্ব-ডিম্ব (world egg) বা ব্রহ্মাণ্ড পাড়ে। আনানকে বা নিক্স পাখি হয়ে সেই ডিমে তা দিয়ে ফেইনিজের জন্ম দেয়।

ইরেবাস ও নিক্স পরিবার

অন্ধকারের দেবতা ইরেবাস ও নিশাদেবী নিক্স থেকে জন্ম নেয় ইথার (Aether) বা স্বর্গ/ উর্ধ্বতন আকাশ ও হেমেরা (Hemera) বা আলো/ দিন। ক্রোনোস ও আনানকের মাধ্যমেও ইথার ও ইরেবাসের জন্ম হতে পারে বলে মনে করা হয়। ইথার ও হেমেরা থেকে জন্ম নেয় সমুদ্র দেবী থালাসা (Thalassa)।

গ্রিক বিশ্বাসে মৃত্যুর পরে আত্মাদেরকে হেডিস বা পাতালপুরীরে যেতে হত। এখানকার দেবতার নামও হেডিস। এই পাতালপুরীরতে যেতে হলে আত্মাদেরকে স্টিকস (Styx) নামে একটি নদী পার হতে হতো। এই নদী ছিল পাতাল ও পৃথিবীর সীমারেখা বিভাজনকারী পাঁচটি নদীর একটি। বাকী চারটি হলো আকেরন (Acheron), ককেতাস (Cocytus), লিদি (Lethe) ও ফ্লেগেথন (Phlegethon)। আত্মাদেরকে নৌপথ পাড়ি দিয়ে হেডিসে নিয়ে যাবার মাঝির নাম ছিল কারন (Charon)। এই কারন ইরেবাস ও নিক্সের পুত্র।

নিশাদেবী নিক্স হতে অন্যান্য যে সকল দেব-দেবী সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো হলো- মরোস (Moros) বা ধংস/পতন, নেমেসিস (Nemesis) স্বর্গীয় প্রতিশোধ, মোমুস (Momus) বা হাসি-ঠাট্টা ও দোষারোপ, জেরাস (Geras) বা বয়োঃপ্রাপ্তি, ফিলোতেস (Philotes) বা স্নেহ, থানাতোস (Thanatos) বা মৃত্যু, হিপনোস (Hypnos) বা নিদ্রা, আপাতে (Apate) বা প্রতারণা, অনেরই (Oneiroi) বা স্বপ্ন, এরিস (Eris) বা ক্লেশ, অজিস (Oizys) বা কষ্ট, মইরাই (Moirai) বা ত্রিভাগ্য দেবী এবং কের (Ker) বা ভয়ানক মৃত্যু। এছাড়াও নিক্স হতে হেসপেরিদেস (Hesperides) সন্ধ্যাপরীদের সৃষ্টি হয়।

ইরস পরিবার

ইরসের ছোট পরিবার। এ দেবতা হতে ফাইসিস (Physis) বা প্রকৃতি ও থেসিস (Thesis) বা সৃষ্টি নামে দুই দেবীর সৃষ্টি হয়েছিলো। ফেইনিজের স্ত্রীরূপ হিসেবে অনেক সময় থেসিসকে কল্পনা করা হয়।

গাইয়া ও তার চার পরিবার

গাইয়া বা পৃথিবী হতে সৃষ্টি হয় ওরিয়া (Ourea) বা পর্বত, পন্তাস (Pontus) সমুদ্র এবং ইউরেনাস (Uranus) বা আকাশ দেবতাগণ। এদের প্রত্যেককে নিয়ে গড়ে ওঠে গাইয়ার ভিন্ন ভিন্ন পরিবার।

১) গাইয়া ও তারতারাস পরিবার

অন্য সব পুরাণের মতো গ্রিক পুরাণেও স্বর্গ-নরকের ধারণা ছিলো। ওদের স্বর্গের নাম ইলাইসিয়াম (Elysium) আর নরক তারতারাস। এই নরকের দেবতার নামও তারতারাস। এই দেবতা ও দেবী গাইয়া থেকে সৃষ্টি হয় সব দৈত্য-দানবের পিতা ও মাতা- আগুনমুখো ড্রাগন তাইফোউস (Typhoeus) ও অর্ধনারী-অর্ধসাপ একিদনা (Echidna)। তাইফোউস অনেকসময় তাইফুন নামেও পরিচিত।

তাইফুন ও একিদনা হতে জন্ম নেয় দুই মাথাওয়ালা কুকুর অর্থ্রুস (Orthrus) ও তিন মাথাওয়ালা কুকুর সেরবেউস (Cerberus)। সেরবেউস পাতালপুরীর দ্বাররক্ষক। এ দম্পতি আর যা কিছু জন্ম দিয়েছিলো তা হলো কিমিরা (Chimera), হাইড্রা (Hydra), স্ফিংস (Sphinx) ও ড্রাগন।

কিমিরা হলো সিংহের মাথা, ছাগলের দেহ ও সাপের লেজবিশিষ্ট আগুনমুখো একটি স্ত্রী-জাতীয় প্রাণি। হাইড্রার সাপজাতীয় অসংখ্য মাথাওয়ালা জীব। স্ফিংস ছিলো সিংহের দেহ, নারী মাথা ও ডানা বিশিষ্ট। মিশর পুরাণেও একই ভাবে প্রাণির অস্তিত্ত্ব পাওয়া যায়। চীনা পুরাণের মতো গ্রিক পুরাণেও ড্রাগন আছে। তবে গ্রিক পুরাণে বিভিন্ন ধরনের ড্রাগন ছিলো।

২) গাইয়া ও ওরিয়া

ওরিয়া হলো পর্বতদের মূল দেবতা। হিন্দু ধর্মে যেমন ‘হিমালয়’ নামে এক দেবতা আছে, তেমনি গ্রিকদেরও ভিন্ন ভিন্ন নামে এমন প্রায় দশটি পর্বতের দশটি দেবতা আছে। গ্রিক দেবতাদের বাসস্থান অলিম্পাস পর্বতও এমনি এক দেবতা। গাইয়া ও ওরিয়া মিলে সৃষ্টি করেছে নেসোই (Nesoi) বা দ্বীপসমূহ।

৩) গাইয়া ও পন্তাস পরিবার

সমুদ্র দেবতা পন্তাসের সাথে গাইয়ার পাঁচ সন্তান- গভীর সমুদ্রে বিপদের দেব-দেবী ফোর্কিস (Phorcys) ও সিটো (Ceto), সমুদ্রে বিষ্ময়ের দেবতা থাউমাস (Thaumas), নেরেয়াস (Nereus) এবংইউরিবিয়া (Eurybia)।

ফোর্কিস ও সিটোর ঘরে জন্ম নেয় সমুদ্রে মানুষকে দিকভ্রান্ত করা সাইরেন (Siren), সমুদ্র দৈত্য সিলা (Scylla), গ্রাই (Graeae) নামের ভবিষ্যৎদ্রষ্টা তিন বৃদ্ধা যারা এক চোখ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেখতো, সমুদ্রে ঘুর্ণাবর্তের দৈত্য কারিবদিস (Charybdis) এবং সাপদেহী ও মাথাভর্তি সাপ বিশিষ্ট নারী গরগন (Gorgon)। গরগনদের মধ্যে মেডুসা (Medusa) বেশ পরিচিত।

থাউমাস ও সমুদ্রপরী ইকেট্রা থেকে জন্ম নেয় হার্পিস (Harpies) ও দেবী আইরিস (Iris)। হার্পিসরা নাবিকদের খাবার চুরি করতো আর আইরিস ছিল বার্তাবাহক।

গাইয়া ও পন্তাসের জ্যেষ্ঠ্য পুত্র নেরেয়াস ‘সমুদ্রের বৃদ্ধ’ নামে পরিচিত ছিল। তার ঔরসে তিতান কন্যা জলপরী (ওশেনিদ- ২য় ভাগে বিস্তারিত) দোরিস (Doris) এর গর্ভে ৫০ কন্যা ও এক পুত্র জন্ম নেয়। পুত্রের নাম নেরাইতেস (Nerites)। কন্যারা পরিচিত ছিল নেরেইদ্স (Nereids) নামে। এদের মধ্যে এমফিত্রাইত (Amphitrite) ও থেতিস (Thetis) উল্লেখযোগ্য।

ইউরিবিয়া ছিল সমুদ্রজ্ঞান সম্পন্ন এক দেবী। গাইয়া ও ইউরেনাসের পুত্র ক্রাইয়াসকে (Crius) নিয়ে তার নিজের পরিবার গড়ে ওঠে। এ পরিবারে তিন সন্তান-সন্ধ্যা দেব এস্ত্রিয়াস (Astraeus), প্রলয় দেব পারসিজ (Perses) ও যুদ্ধ দেব প্যালাস (Pallas)।

৪) গাইয়া ও ইউরেনাস পরিবার

গাইয়া ও ইউরেনাসের মাধ্যমে দৈত্য, বনপরী মিলিই (Meliae), পাতালপুরীর প্রতিহিংসাপরায়ণ স্ত্রী জাতীয় প্রাণি এরিনাইয়েস (Erinyes) বা ফিউরিস (Furies), করিবানতিস (Korybantes) নর্তকী, ও বারো জন তিতান (Titans) জন্ম হয়। দৈত্যদের মধ্যে ছিলো এক চোখওয়ালা সাইক্লোপস (Cyclopes), ৫০ মাথা ও ১০০ হাতওয়ালা হেকাতনকারিস (Hecatoncheires) ও জিগান্তেস (Gigantes) নামের অন্যান্য দৈত্য।

দ্বাদশ তিতান

বারো জন তিতান দ্বাদশ তিতান নামে পরিচিত ছিল। এদের ছয় জন ছিল পুরুষ তিতান আর বাকী ছয় জন ছিল মহিলা তিতান। একত্রে সবাইকে দ্বাদশ তিতান বলে। জোড়ায় জোড়ায় এই তিতানরা হলো-অশেয়ানোস (Oceanus) ও তেথুস (Tethys), হাইপেরিয়ন থেইয়া, কয়উস (Coeus) ও ফয়বে (Phoebe), ক্রোনাস (Cronos) ও রেয়া (Rhea), নিমোসাইনে (Mnemosyne) ও ক্রাইয়াস (Crius) এবং থেমিস (Themis) ও ইয়াপেতুস (Iapetus)।

এই দ্বাদশ তিতানদেরকে নিয়ে গ্রিক পৌরাণিক দেব-দেবীদের দ্বিতীয় প্রজন্ম শুরু হয়েছিলো।

পুরাণ গাঁথা