X

ফারাও শাসনের পুনরুত্থান (মিশরীয় সভ্যতা- ২য় ভাগ)

ফারাও শাসনের পুনরুত্থান: ফারাও-আকিমানিদ-আক্সুমাইট

ফারাও শাসনের পুনরুত্থান ঘটায় ১ম আহমোসিস। তিনি হাইকসস শাসনের (১৫, ১৬ ‍ও ১৭তম বংশ) অবসান ঘটিয়ে মিশরের শাসন পুনরায় মিশরীয়দের হাতে ফিরিয়ে আনে। থিবজ শহরকে কেন্ত্র করে সে অষ্টাদশ বংশের (১৫৫০–১২৯২ খ্রি.পূ.) প্রতিষ্ঠা করে। এ বংশের অন্যান্য ফারাওদের মধ্যে হ্যাতশেপসুট, আকনাথুন (৪র্থ আহমুনহোথেপ) ও তাঁর স্ত্রী নেফারতিতিতুতানখামুনের নাম উল্লেখযোগ্য।

ফারাও ৪র্থ আহমুনহোথেপ বা আখেনাথুন মিশরের অন্যতম বিখ্যাত রাজা। তিনি মিশরে বহুঈশ্বরবাদের অবসান ঘটিয়ে একেশ্বরবাদের প্রচলন করেন। তিনি নতুন সূর্য দেবতা আতেনের পূজা রীতি চালু করেন। আখেনাথুনের স্ত্রীর নাম ছিল নেফেরতিতি। স্বামীর মৃত্যুর পর কিছুকাল তিনি রাজসিংহাসনের অধিকারী হন। ফারাও তুতেনখামুন আখেনাথুনের পুত্র। আখেনাথুন দেবতা আতেনের নামে তাঁর নাম রেখে ছিলেন তুতেনখাতেন; কিন্তু সে পুনরায় আমুনসহ অন্যান্য দেবতাদের পুনরায় অধিষ্ঠিত করে নিজে তুতেনখামুন নাম গ্রহণ করে। তার জনগণরা তাকে অর্ধেক মানুষ এবং অর্ধেক দেবতা মনে করতো।

অষ্টাদশ রাজবংশের ফারাওগণ

১৮তম বংশের শেষ ফারাও হরেমহেবের কোন উত্তরাধিকার ছিলো না। সে মারা গেলে তার উজির রামসিজ নামে মিশরের সিংহাসনে বসে। মিশরে শুরু হয় রামসিজ বংশের (১৯তম, ১২৯২ থেকে ১১৮৯ খ্রি.পূ.) শাসন।  প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী ফারাওয়ের রামসিজ দ্য গ্রেট (১ম রামসিজের নাতি ২য় রামসিজ)। তিনি প্রায় ৬৭ বছর মিশর শাসন করে। রামসিজকে নিয়ে ইংরেজি কবি পার্সি বেসি শেলির বিখ্যাত কবিতার নাম ‘অজিম্যানদিয়াস’।

হিটাইট সাম্রাজ্যের শাসক ২য় মুয়াতাল্লির সাথে লেবানন-সিরিয়ার সীমান্তে রামসিজের এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ ‘কাদেশের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ১৬ বছর যুদ্ধের পর ‘মিশর-হিটাইট শান্তি চুক্তি’র মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান হয়।

কাদেশের যুদ্ধ (১২৭৪ খ্রি.পূ.)

ইহুদি, খ্রিস্ট এবং ইসলাম ধর্মে (২য়) রামসিজ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মোশি ইহুদি, খ্রিস্ট,এবং ইসলাম ধর্মে স্বীকৃত পয়গম্বর। মিশরীয়রা ইসরাইলিদেরকে দাস হিসেবে ব্যবহার করতো। এসময় মিশরের লিবাইট (বনী-ইসরাঈল) নামক ইসরাইলি পরিবারে মোশি জন্মগ্রহণ করেন। জ্যোতিষী গণনা করে রামেসিজকে বলেছিলেন, ইহুদি পরিবারের মধ্যে এমন এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে যে ভবিষ্যতে মিশরের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই তিনি আদেশ দিলেন কোনো ইহুদি পরিবারে পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলেই যেন তাকে হত্যা করা হয়।

জন্মের পর মোশির মা জোশিবেদ সকলের চোখের আড়ালে সম্পূর্ণ গোপনে শিশুসন্তানকে বড় করে তুলতে লাগলেন। এভাবে তিন মাস যাওয়ার পর সন্তানকে গোপন রাখা আর সম্ভব পর হচ্ছিল না। তখন পিতা আমরাম এবং জোশিবেদ শিশু মোশিকে একটা ছোট ঝুড়িতে করে নীল নদে ভাসিয়ে দেয়। নদীর পাড় ধরে শিশুবাহী ঝুড়িটিকে অনুসরণ করে চললেন মোশির বোন মিরিয়াম

ঝুড়িটি গিয়ে পৌছল এমন একটি ঘাটে যেখানে ফারাও রামসিজের কন্যা বিথিয়া (বা স্ত্রী আছিয়া) স্নান করছিল। ফুটফুটে সুন্দর একটা বাচ্চাকে একা পড়ে থাকতে দেখে তার মায়া হলো। সে তাকে তুলে নিয়ে এলো রাজপ্রাসাদে। সেখানে জোশিবেদকেই মোশির ধাত্রী হিসেবে নিযু্ক্ত করা হয়। এভাবে মোশি ফারাও প্রাসাদেই বড় হয়।

এক্সোডাস ম্যাপ
এক্সোডাস ম্যাপ-২

পরবর্তীকালে রামসিজের সাথে বিরোধের জের ধরে সকল ইসরাইলি দাসদেরকে মুক্ত করে মোশি সিনাই পর্বতে চলে যান। ইতিহাসে এ ঘটনা ‘এক্সোডাস’ (মহাযাত্রা) নামে পরিচিত। এ পর্বতে অবস্থান কালে মোশি ‘টেন কমান্ডমেন্ট’ (ওল্ড টেস্টামেন্টের ১০ মূলনীতি) লাভ করেন। মূসা ও রামসেজের এ ঘটনাকে আশ্রয় করেবেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এ গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘টেন কমান্ডমেন্টস’ (১৯২৩, ১৯৫৬, ২০০৭) ও  ‘এক্সোডাস: গডস অ্যান্ড কিংস’ (২০১৪)।

টেন কমান্ডমেন্টস

মমি মিশরীয় সভ্যতার অন্যতম এক নিদর্শন। মমি হল মৃতদেহ সংরক্ষণ করার বিশেষ এক পদ্ধতি। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো যে, মৃত্যুর পর মানুষ আরেক পৃথিবীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এই যাত্রা শেষে পরকালে বসবাসের জন্য তাদের দেহ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। আর এই ধারণা থেকে তারা মমি বানানো শুরু করে। মিশরীয়রা শুধু মানুষ নয়, অনেক প্রাণী যেমন- কুকুর, বিড়াল ইত্যাদির মৃতদেহকেও মমি বানিয়ে রাখতো।

মিশরীয় সভ্যতায় আমরা যে ধরণের মমি দেখতে পাই সেগুলো ধর্মীয় কারণে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হত। এগুলোকে বলে এন্থ্রোপজেনিক মমি। কিন্তু কিছু মমি সৃষ্টি হয়েছিল দুর্ঘটনাবশত। যেমন, গুয়ানাজুয়াতো, মেক্সিকোতে একশ এর বেশি মমির সন্ধান পাওয়া গেছে যাদের ইচ্ছাকৃত ভাবে মমি করা হয়নি। ধরে নেয়া হয়, প্রচণ্ড গরম বা তীব্র ঠাণ্ডার তাপমাত্রা, বদ্ধ কোন জলাভূমির মত বায়ু শূন্য অবস্থায় অথবা এলাকার মাটির নিচে বিপুল পরিমাণে সালফার এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থের কারণে অনেক মৃতদেহ মমিতে পরিণত হয়েছে। এগুলোকে বলে স্পন্টেনিয়াস মমি। এ কারণে লিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, ইরান, সাইবেরিয়া, ডেনমার্ক, ফিলিপিন, হাঙেরি, ইটালি ইত্যাদি দেশেও মমির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

যে সব দেহের মমি করা হতো তাদের শুকনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো লিলেন কাপড়ে পেঁচিয়ে ক্যানোপিক জার নামক  চার ধরণের বয়ামে ভরে রাখা হত। প্রতিটি বয়ামের ঢাকনাগুলো মিশরীয় দেবতা হোরাসের ৪ পুত্র- ইমসেটি, হেপি, দুয়ামাটেফ, কেবেসেনাফ এর আদলে তৈরি করা হত। মানুষের মাথার মত ইমসেটি জারে যকৃত, বেবুনের মাথার মত হেপি জারে ফুসফুস, খেকশিয়ালের মাথার মত দুয়ামাটেফ জারে পাকস্থলী এবং বাজপাখির মাথার মত জারে অন্ত্রসমূহ রাখা হতো। কফিনের মতো যে বাক্সের মধ্যে মমি সংরক্ষণ করা হতো তাকে বলা হয় স্যাক্রোফ্যাগাস

ক্যানোপিক জার

মমি রহস্য সবসময়ই মানুষকে অভিভূত করেছে। এ নিয়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ‘দি এজটেক মামি’ (১৯৫৭), ‘টেইল অভ দি মামি’ (১৯৯৮), ‘দি মামি’ (১৯৯৯), ‘দ্য মামি রিটার্নস’(২০০১),  ‘দ্য স্করপিয়ন কিং’ (২০০২), ‘লেজিয়ন অভ দ্য ডেড’ (২০০৫), ‘দ্য কারস অভ কিং টুট’স টুম’ (২০০৬), ‘দি মামিঃ টুম অভ দি ড্রাগন এমপেরর’ (২০০৮), ‘দ্য স্করপিয়ন কিং ২: রাইজ অভ অ্যা ওয়ারিওর’ (২০০৮) এবং ‘দ্য স্করপিয়ন কিং ৩: ব্যাটেল ফর রিডেম্পশন’ (২০১২) ‘দি মামি’ (২০১৭) উল্লেখযোগ্য।

প্রাচীন মিশরীয় সাহ্যিত্যের মধ্যে ‘বুক অভ ডেড’ বেশ পরিচিত । ‍মিশরীয়রা পরকালে বিশ্বাস করতো। তাদের ধারণা ছিল মৃত্যুর পর আত্মা ‘সেখেত-আরু’ নামের স্বর্গে চলে যায়। তবে সেখানে যাবার আগে  মৃতদের হৃদয়কে উটপাখির পালকের বিপরীতে দাড়িপাল্লায় ওজন করা হয়। যদি হৃদয় এই পালকের চেয়ে হালকা হয় তাহলে সে স্বর্গে যেতে পারে। যদি ভারি হয় তাহলে তাকে ‘আম্মিত’ নামক দৈত্যের খাদ্যে পরিণত হতে হয়। তাই পরকালে মৃত ব্যক্তিদের আত্মার দুর্গম পথ পাড়ি দেবার জন্যে পেপিরাসে বেশ কিছু মন্ত্র লিখে মৃত ব্যক্তির সাথে সমাহিত করা হতো। মন্ত্র সম্বলিত এ সংকলনের নাম ‘বুক অভ ডেড’।

১৯তম বংশের পরে আরও প্রায় পাঁচশো বছর (২০-২৪তম বংশ; ১১৮৯-৭২০ খ্রি.পূ.) ফারাওদের শাসন টিকে ছিলো। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার পতনের শুরু হয় কুশাইট নামে এক জাতির মাধ্যমে। এ সভ্যতার প্রায় সমসাময়িক সময়ে বর্তমান দক্ষিণ মিশর ও সুদানের নুবিয়া অঞ্চলে তীরন্দাজ হিসেবে খ্যাত কুশাইট জাতি কর্মা নামে এক শহরের গোড়াপত্তন করেছিল। কালক্রমে এ জাতি মিশরীয়দের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে সমৃদ্ধশালী হয়। খ্রি. পূ. ১১ শতকের শেষ ভাগে মিশরীয় ফারাওদের শাসন দূর্বল হয়ে পড়লে কুশাইটরা মিশরে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। ৭৫০/৭৪৪ খ্রি.পূর্বাব্দে কুশাইট রাজা কাশতা মিশরের সিংহাসনে আরোহন করে কুশ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। কুশ রাজ্য নুবিয়ান রাজ্য নামেও পরিচিত।

কুশ বা নুবিয়ান রাজ্য (৭০০ খ্রি.পূ.)

কুশ রাজ্যের সময়কালে বিশ্বে এক মহা পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য ছিলো- আকিমানিদ রাজ্য (পারস্য সম্রাজ্যের প্রথম ভাগ)। এ সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক মহান সাইরাসের পুত্র (২য়) ক্যামবাইসেস কুশ রাজ্যকে আকেমেনিদ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত (৫২৫ খ্রি.পূ.) করে।

আক্সুমাইট রাজ্য

২য় শতকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া অঞ্চলে আক্সুমাইট রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়েছিলো। এই আক্সুমাইট জাতির আক্রমণ ও লুণ্ঠনে কুশ রাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটে।

(ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর গল্প চলবে)