X

ফেসবুক, না টুইটার- ভেবে দেখার সময় এখনি

উন্নত দেশে ফেসবুক-এর চেয়ে টুইটার কেন জনপ্রিয় হচ্ছে?

২০১৬ সাল ছিল ফেসবুক-এর স্বর্ণযুগ। সে সময়ে বিশ্বের ৮৫ শতাংশের বেশি লোক ফেসবুক ব্যবহার করতো। তখন টুইটার ব্যবহার করতো মাত্র ৩ শতাংশ লোক। এর পরে চিত্রপট পাল্টাতে থাকে। সারা বিশ্বে একদিকে কমতে থাকে ফেসবুক ব্যবহার, অন্যদিকে বাড়তে থাকে টুইটারের ব্যবহার। বর্তমানে (মার্চ ২০২০) বিশ্বে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যববহারকারীদের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহার করছে ৬৪ শতাংশ, টুইটার প্রায় ১৫ শতাংশ।

কেন বাড়ছে টুইটার, কেন কমছে ফেসবুক ব্যবহার? ফেসবুক ও টুইটারের এই বৃদ্ধি হ্রাসে উন্নত ও তৃতীয় বিশ্বের জনগণ কিভাবে আচরণ করছে? কেন করছে?

তৃতীয় বিশ্বে ফেসবুকের ব্যবহার (ডিসেম্বর ২০১৯)

প্রথমে বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহ ও অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের কিছু রাষ্ট্রের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন তুলে ধরি। বর্তমান বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী লোকজনের ৯৩.২৮ শতাংশ (মার্চ ২০২০) ফেসবুক ব্যবহার করে। এ দেশে ইউটিউবের ব্যবহার বিশ্বের গড় ব্যবহারের (৩.১%) থেকে বেশি, ৩.৩১ শতাংশ। কিন্তু পিনটারেস্ট (১.২৪%) বাদে বাকী সোশ্যাল মিডিয়ার- টুইটার (০.৯৮%), লিঙ্কডইন (০.১৩%), ও ইনস্ট্যাগ্রাম (০.৫১%)- ব্যবহারের সংখ্যা ১ শতাশের নীচে।

তৃতীয় বিশ্বে টুইটারের ব্যবহার (ডিসেম্বর ২০১৯)

একই সময়ে ভারতের চিত্রে তাদের ফেসবুক (৮৪.৯৪%) ও ইউটিউব (২.৬১%) ব্যবহারের হার আমাদের থেকে কম; কিন্তু টুইটার, ইনস্ট্যাগ্রাম, পিনটারেস্ট ব্যবহারের হার বেশি। ভারতীয়রা বাংলাদেশ হতে প্রায় তিন গুণ বেশি টুইটার ব্যবহার করে। ২.৫৮ শতাংশ (১ কোটি ১০ লক্ষ, বিশ্বে ৬ষ্ঠ) ভারতীয় এখন টুইটার ব্যবহার করছে। মিয়ানমার (৯৪.৭৫%) নেপাল (৯৩.৮২%), পাকিস্তান (৯৫.৩%) এদের সবার ফেসবুকের ব্যবহার বাংলাদেশের কাছাকাছি হলেও এদের সবার টুইটার ব্যবহার আমাদের থেকে কয়েকগুণ বেশী। অর্থাৎ এ সব দেশে টুইটার ব্যবহারকারী লোক বাড়লেও বাংলাদেশের চিত্রপট ভিন্ন। এখানে টুইটার ব্যবহারকারী দিনকে দিন কমছে।

উন্নত দেশগুলির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা যাক। সেখানকার লোকের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের চিত্র এ অঞ্চলের লোকের ব্যবহারের চিত্রের অনেকটাই উল্টো। সেখানে ফেসবুক ব্যবহার কমছে। পক্ষান্তরে টুইটার, ইনস্ট্যাগ্রাম, পিনটারেস্ট এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫.৬৯ শতাংশ (মার্চ ২০২০) লোক এখন টুইটার ব্যবহার করে। ব্রিটেনে ফেসবুকের ব্যবহার (৩৯.৬৪%) কমতে কমতে এখন সেটা প্রায় টুইটারের সমান (৩৫.৩৮%) হয়ে দাড়িয়েছে। কানাডায় কমেছে ফেসবুকের ব্যবহার (৫০.৭৯%), উপরে উঠছে টুইটারের (১৭.৮১%) গ্রাফ।

উন্নত বিশ্বে ফেসবুকের ব্যবহার (ডিসেম্বর ২০১৯)

এবার প্রাচ্যের কিছু উন্নত দেশের দিকে দেখা যাক যাদের কাছে সময়ের মূল্য অন্য অনেক কিছু থেকে বেশি। জাপানিজরা এখন (মার্চ ২০১০) ফেসবুকের (১৯.৪২%) আড়াইগুণ বেশি টুইটার (৪৮.০৯%) ব্যবহার করে। দক্ষিণ কোরিয়াতে লোকজন ফেসবুকের চেয়ে সাড়ে চারগুণ বেশী টুইটার ব্যবহার করে। রাশিয়াতেও ফেসবুক হতে টুইটার বেশি ব্যবহৃত হয়।

উন্নত বিশ্বে টুইটারের ব্যবহার (ডিসেম্বর ২০১৯)

সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর মধ্য সবচেয়ে জনপ্রিয় ফেসবুক কেন দিনে দিনে কেন আস্তাকুঁড়েতে পরিণত হচ্ছে? উন্নত সমাজের লোকেরা কেন ফেসবুক হতে দিনে দিনে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? আর কেনই বা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা ও ব্যবহার প্রতি নিয়ত বেড়ে চলেছে?

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশে এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। শুধু অভিজ্ঞতা লব্ধ ব্যবহারিক জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে আমি এ বিষয়ে আমার মতামত তুলে ধরছি।

উন্নত বিশ্বের সবচেয়ে দামী বস্তুটি বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সবচেয়ে সস্তা। আমাদের জীবনের এ সস্তা বস্তুটির নাম সময়। আমাদের কাছে সময়ের দাম একেবারে নেই বললেই চলে। আমরা যেখানে সেখানে কারনে-অকারনে সময় নষ্ট করি। যে দিন আমাদের কাছে সময়ের মূল্য তৈরি হবে সে দিন আমরা আর তৃতীয় বিশ্ব থাকবে না।

ফেসবুকের এ ক্রমাবনতির অন্যতম প্রধান দুটি কারণ হলো ফেক আইডি তৈরির সুযোগ ও প্রোফাইল লক রাখার অপশন। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এই দুই সুযোগে যেমন ফেসবুক ব্যবহার বেড়েছে, ঠিক সেই কারণে উন্নত বিশ্বে এর ব্যবহার কমেছে।

এ সুযোগের যথেচ্ছা ব্যবহার করছে এক শ্রেণির অবাঞ্চিত মানুষরূপী জানোয়ার। এরা ফেসবুকে গুজব ছড়ায়, সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ায়, লাইক-কমেন্টের জন্য অযাচিত ছবি বা ভিডিও ছড়ায়, আজে-বাজে কথা বলে বা গালিগালাজ করে। এদের কারো প্রোফাইল চেক করে কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। ফলে এদের বিরুদ্ধে সহজে কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। এ সব পরিচয় জানতে ফেসবুকের দ্বারস্থ হতে হয়। এটা সময়সাধ্য ও যথেষ্ট পরিশ্রমের। ফলে এ সব লোকজন একটার পর একটা ফেক আইডি খুলে মনের আনন্দে তাদের কাজ চালিয়ে যায়।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় একটাই। কাউকে ফেসবুকে যুক্ত করার আগে, কারো সাথে চ্যাট করার আগে, কারো মন্তব্যের উত্তর দেবার আগে তার প্রোফাইলে ঢুকুন। এ শ্রেণির বেশিরভাগ লোকের প্রোফাইলে কোন তথ্য পাবেন না। মাত্র কয়েকটি বিচিত্র ছবি, শেয়ার ইত্যাদি থাকবে। কারো কারো আবার প্রোফাইল লক থাকে। এ শ্রেণির লোকের সাথে যে কোন ধরণের ফেসবুক তথ্য আদান-প্রদান শুধু আপনার ফেসবুকের নিরাপত্তা জন্য় নয়, আপনার জীবনের নিরাপত্তার জন্যেও হুমকি।

এরা গালি দিক বা যাই বলুক না কেন, আপনার চুপ থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ ব্যক্তি হিসেবে আপনার প্রোফাইলে আপনার পরিচিতি দেয়া আছে। এ পরিচিতির একটা সামাজিক মূল্য আছে। যার এসব নেই, তার কোন সমস্যা নেই। তাই এ শ্রেণির কোন সচেতনতার প্রয়োজন হয় না।

এ শ্রেণির লোকের নিজের কোন সামজিক মূল্য নেই বলে এরা অন্যেরটা বোঝে না, বুঝতে চাইবেও না। বরং কাউকে অবাঞ্চিত ভাষায় গালিগালাজ করতে পারলে এরা আনন্দ লাভ করে, পৈশাচিক এক শান্তি পায়। মনোবিজ্ঞানে তাদের আনন্দলাভের এ আচরণকে ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে-এর দৃষ্টিকোণ থেকে বা সমাজবিজ্ঞানে একে শ্রেণিবৈষম্যের আঙ্গিকে গবেষণা করার সুযোগ আছে।

এবার আরেকটি বিষয়ে আসি। এটা হলো ফেসবুকের অযাচিত ব্যবহার। এক শ্রেণির লোক আছে যাদের ফেসবুক আইডি বা প্রোফাইল সব ঠিক থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো এরা বিভিন্ন ধরণের আলতু-ফালতু ছবি, ভিডিও শেয়ার করতে থাকে।

এ শ্রেণির লোকেরা নিজের সময়ের মূল্য নেই বলে তারা অন্যের সময়ের মূল্য দিতে জানে না। এরা যখন আপনার সাথে যুক্ত থাকে তখন এ সব লোকের ঐ সব ফালতু বিষয় আপনার ফেসবুক ফিডে চলে আসে। আপনি যখন নিজের ফেসবুক পেজ ট্রল করেন, তখন ঐ সকল পোস্ট আপনার সময় নষ্ট করে। শুধু তাই নয়, এ সমস্ত ফালতু পোস্টের আড়ালে তথ্যমূলক প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো তখন হারিয়ে যায়।

এ সকল পোস্ট এড়িয়ে চলার সহজ উপায় হলো কাউকে দ্বিতীয় সুযোগ না দেয়া। আপনার ফিডে সময় নষ্ট করছে, ভ্রান্ত তথ্য ‍দিচ্ছে এমন কোন পোস্ট দেখলেই সেই ব্যক্তিকে ‘আনফলো’ করুন। মেসেঞ্জারে অবাঞ্চিত  কোন ম্যাসেজ পাওয়ার সাথে সাথে তাকে সেখানে ব্লক করুন। এভাবে একটু কষ্ট করে মাসখানিক আনফলো, ব্লক করলে দেখবেন যে মাসের শেষে আপনার ফেসবুকের হোমপেজ অনেক সাশ্রয়ী ও তথ্যবহুল হয়ে উঠেছে।

একটু ভেবে বলুন তো, আপনার ফেসবুকের বন্ধুদের শতকরা আশি ভাগ লোককে কি আপনি চেনেন? উত্তরটা সম্ভবত ‘না’। তাদের বেশির ভাগেরই কোন পরিচয় আপনার জানা নেই। এমনকি তারাও আপনাকে চেনে না। শুধু বেশী লাইক-কমেন্টের লোভে কখন যে তারা-আপনারা এক সাথে যুক্ত হয়েছেন তা আপনারা নিজেরাও জানেন না।

আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য এমন হতে পারে যে, এ সব বন্ধুদের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশই ফেক আইডি। এ কথা বিশেষ করে তাদের জন্য সত্য যাদের বন্ধু তালিকায় হাজার হাজার লোক আছে। আপনার বন্ধু তালিকায় এমন অনেকেই আছে যাদের সাথে কোনদিন আপনার কোন তথ্য বিনিময় হয়নি, চ্যাট হয়নি, লাইক-কমেন্ট হয়নি। কিন্তু তারপরেও তারা আপনার বন্ধু। কেন, কিভাবে?

ফেসবুকের এ সব দূর্বলতার সুযোগে উঠে আসছে টুইটার। টুইটারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো খুব সামান্য একটি তথ্য আপনার সামনে (ফিডে) আসবে। এটি দেখতে সময় কম লাগে। তার পাশে থাকবে একটি লিঙ্ক। যদি আপনি সামন্য তথ্যটি পছন্দ করেন তবে লিঙ্ককে গিয়ে পড়তে পারেন। তা না হলে দ্রুত লীভ করতে পারেন। ফেসবুকে সেই সুযোগ হয় না। অবাঞ্চিত পুরো পোস্টটাই আপনার সামনে এসে পড়বে। মনোযোগ নষ্ট করবে ও আপনাকে দিকবিভ্রান্ত করবে।

এ জন্য বলা হয় যে, ফেসবুকে দশটি পোস্ট দেখতে যে সময় লাগে, সেই সময়ে টুইটারে ফিড দেখা যায় শ’খানেক। এটাই টুইটারের শক্তি। তাই রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান থেকে শুরু করে বিশ্বের সব বিখ্যাত মানুষগুলো এখন নিয়মিত টুইট দেখছেন, টুইট করছেন।

বাংলাদেশে টুইটার ব্যবহার বৃদ্ধি না পাবার একটি সঙ্গত কারণ হলো ফেসবুকের সহজ ব্যবহার-বিধি। কারো সাহায্য নিয়ে একটি ফেসবুক খুলে, কিংবা স্বল্প জ্ঞানের অল্প আঁচে লাইক-শেয়ার-কমেন্ট দিয়ে ফেসবুক চালানো যায়। বাংলাদেশের এ রকম ব্যবহারকরীর সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। কিন্তু টুইটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সম্পর্কে জ্ঞানের বাটখারা কিছুটা ভারী হতে হয়। আমাদের এ বাটখারা ভারী হতে আরো সময় লাগবে।

শেষ যে কারণটি মনে হল সেটা হলো আমাদের বেশী কথা বলার অভ্যাস। টুইটারের পোস্টে শব্দ ব্যবহারের একটা সীমা আছে। কোন কিছু কম শব্দে বলা আমাদের অভ্যেস নয়। ফেসবুক আমাদেরকে বেশি কথা বলার অবারিত সুযোগ দিয়েছে। টুইটার তা দিতে পারেনি। তাই এটা জনপ্রিয় হতে পারেনি।

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩-৪ ঘণ্টা সময় কেড়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য জানার জন্য, জানানোর জন্য, সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার জন্য আমরা সবাই এ সময় ব্যয় করছি। যদি ফেসবুকের ঐ সব আলতু-ফালতু পোস্ট আপনার সেই সময়টি নষ্ট করে, তবে আপনার ব্যয়িত সময় বেড়ে যাবে, না হয় আপনি পুরো সময়টাকেই নষ্ট করবেন।

সময় এখনই সজাগ হওয়ার। ফেসবুক, না টুইটার- বিষয়টি ভেবে দেখার সময় এসেছে।

তথ্যসূত্র- ১। স্ট্যাটকাউন্টার, গ্লোবালস্ট্যাট ২। স্ট্যাটিসটা.কম

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ