X

ইসলামের প্রতীক- সরু বাঁকা চাঁদ ও তারা

সরু বাঁকা চাঁদ ও তারা প্রতীক-এর বুৎপত্তি

বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করা হয়। যেমন খ্রিস্টান ধর্মে ‘ক্রুশ’, হিন্দু ধর্মে ‘ওম’। ইসলাম ধর্মের প্রতীকী রূপ প্রকাশে অনেক সময় একটি সরু বাঁকা চাঁদ ও তারা ব্যবহৃত হয়। সরু বাঁকা চাঁদটিকে আরবিতে বলে ‘হিলাল’ আর হিলালের পেটের ভাঁজে থাকে এক বা একাধিক তারা।

৭ম শতকের শেষের দিকে মুসলিম খলিফাদের মুদ্রাতে হিলালের সাথে পাঁচ বা ছয় মাথাওয়ালা একটি তারা ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে বাইজানটাইন সভ্যতার মুদ্রাতেও এ প্রতীক দেখা যায়। তুর্কিরা বাইজানটাইন সভ্যতা দখল করে অটোম্যান সাম্রাজ্য গঠন করে। এর পরে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতাকাতে হিলাল ও তারার প্রতীক ব্যবহার করা হয়।

ফলে ১২ শতকের পরবর্তী কালের মুসলিম স্থাপত্য শিল্পে ব্যাপকভাবে চাঁদ-তারা প্রতীক ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে তুরস্ক, পাকিস্তান, মৌরিতানিয়া, আলজেরিয়া, তিউনেসিয়া, লিবিয়ার পতাকায় চাঁদ-তারা, মালয়েশিয়ার পতাকায় চাঁদ ও চৌদ্দ মাথাওয়ালা তারা, আজারবাইজানের পতাকায় চাঁদ ও আট মাথা তারা, কমোরোস ও তুর্কমেনিস্তানের পতাকায় চাঁদ ও পাঁচটি তারা, উজবেকিস্তানের পতাকায় চাঁদ ও বারোটি তারা, মালদ্বীপ ও মুসলিম বিশ্বে রেড ক্রসের শাখা রেড ক্রিসেন্টের পতাকায় শুধু চাঁদ ব্যবহৃত হচ্ছে। মুসলিম প্রধান না হলেও সিঙ্গাপুরের পতাকায় চাঁদ ও পাঁচটি তারা আছে।

রোমান শাসক হাদ্রিয়ানের মুদ্রায় চাঁদ-তারা
বাইজানটাইন মুদ্রায় চাঁদ ও তারা
উমাইয়াদ মুদ্রায় চাঁদ ও তারা
বাইজানটাইন মুদ্রা- আর্তেমিস ও চাঁদ-তারা

ইসলামের সাথে এই চাঁদ-তারার সম্পর্ক কী বা আদৌও কোন সম্পর্ক আছে কী না তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। ইসলামের সূতিকাগার মরুভূমিতে মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়, বিশেষ করে রাতে চলাচলের জন্য চাঁদ-তারা উপর নির্ভরশীল ছিল। সঠিক দিক নির্দেশনায় চাঁদ-তারার এ ভূমিকা বিবেচনায় ইসলামের সাথে চাঁদ-তারার একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। ইসলামিক পঞ্জিকা চাঁদের উপর নির্ভরশীল, সেই (নতুন) চাঁদ যখন দেখা যায় সেটার আশেপাশে কিছু তারাও থাকে, এ থেকেও চাঁদ-তারা সাথে ইসলামের সম্পর্ক তৈরি করা যেতে পারে। এমন মনে করা যেতে পারে যে, তারার পাঁচটি মাথা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভকে নির্দেশ করে।

৬ষ্ঠ শতকের শেষ দিকে ইসলাম ধর্ম যাত্রা শুরু করে। কিন্তু, চাঁদ-তারার এমন ব্যবহারের ইতিহাস তার চেয়ে অনেক পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব ২১ শতকের ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় ‘উর নামু’রের (Ur Namu) স্টেলেতে (stele) চাঁদ-তারার এমন প্রতিকৃতি দেখা যায়। ঐ স্টেলের চাঁদ দিয়ে চন্দ্র দেবতা ‘সিন’ (Sin) ও তারা দিয়ে সূর্য দেবতা ‘শামাশ’কে (Shamash) নির্দেশ করা হয়েছিল।

উর নামুরের স্টেলেতে চাঁদ ও তারা

পরবর্তী কালে এই চন্দ্র দেবতা নারীত্ব লাভ করে। গ্রিকদের দেবী ‘আর্তেমিস’ (Artemis) ও রোমান চন্দ্র দেবী ‘ডায়ানা’ (Diana) সেই ‘সিন’ দেবতার পরবর্তী সংস্করণ। দেবী ডায়ানার মূর্তির মাথায় সরু বাঁকা একটি চাঁদ ছিল। মূলত রোমান সভ্যতার শেষ লেজুড় বাইজানটাইন সভ্যতার মাধ্যমে সেলজুক তুর্কিদের হাত ঘুরে অটোম্যান সাম্রাজ্যের মধ্য দিয়েও চাঁদ-তারা সংস্কৃতি ইসলামে ঢুকে যায়।

রোমান চন্দ্র দেবী ডায়ানা

মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিকসে চাঁদ-তারা দিয়ে ‘মাস’ বোঝানো হতো। তুরস্কে বাইজানটাইন সভ্যতা শুরুর আগে মিথ্রাডেটস দ্য গ্রেট (খ্রি.পূ. ১২০-৬৩) নামে এক রাজা ছিল।  তিনি তাঁর মনোগ্রামে চাঁদের প্রতীক ব্যবহার করতেন।  এছাড়া, নব্য-ব্যবিলনীয় সভ্যতার রাজা নাবোনিদাসের (Nabonidus, খ্রি.পূ. ৫৫৬-৫৩৯) স্টেলেতেও চাঁদ-তারা প্রতীক ব্যবহৃত হয়েছে।

নাবোনিদাসের স্টেলেতে চাঁদ ও তারা

চাঁদ-তারা বিভিন্ন কালে বিভিন্ন রূপে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এতে এটাই প্রমাণ হয় যে সময়ের সাথে প্রতীকের ব্যবহার বদলায়। এখন যেমন হিলাল ও তারা ইসলাম ধর্ম বোঝাতে তা ব্যবহৃত হচ্ছে, হয়তো বা কয়েক শত বছর পরে তা অন্য কোন অর্থ বহন করতে পারে।

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ