ইস্কুল খুইলাছেরে মাওলা, ইস্কুল খুইলাছে

“ইস্কুল খুইলাছেরে মাওলা, ইস্কুল খুইলাছে

গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী ইস্কুল খুইলাছে।”

– ছেলেবেলায় এমনও দিন গেছে যে সারাদিন এ গান গেয়েছি। অবশ্য এই দু’লাইন মাত্র।

গানটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন পপ শিল্পী জানে আলম। তাঁর আরও একটা গান খুব জনপ্রিয় ছিল- ‘একটি গন্ধমের লাগিয়া, আল্লায় বানাইছে দুনিয়া’।

কখনও জানা হয়নি “ইস্কুল খুইলাছে” গানটি কোথা থেকে এল। সে সময়ে এসব খোঁজার বয়স ছিল না, ইচ্ছাও না। আধুনিককালে কেউ কোনো গান গাইলে নিচে গীতিকার ও সুরকারের নাম ভেসে ওসে ওঠে। কেবল লোকগীতির বেলায় এসব করা হয় না। আগেও হত না। সম্ভবত ভুখানাঙ্গা, অশিক্ষিত, কাঙাল বাউলাদের এসব স্বীকৃতি দিতে নেই।

‘জলের গান’ নতুন করে গানটি গেয়েছেন। বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ডলারও কামাবে। তবে তারাও তাদের গানে মূল গীতিকারের কথা মুখে উল্লেখ করেনি।

“ইস্কুল খুইলাছে” গানটির গীতিকার একজন পেশাদার নরসুন্দর। কিন্তু নিজের পেশাকে ছাপিয়ে তিনি মাইজভাণ্ডারী (ভক্তিমূলক কবিগান) গানের কিংবদন্তী সাধক। একজন প্রতিবাদী গণসঙ্গীত শিল্পী। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক।

১৯৫৪ সালের জনগণের ভোটে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। নুরুল আমিনকে পূর্ব বাংলার গভর্নর নিয়োগ করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার। তাকে ব্যঙ্গ করে তিনি লিখেছিলেন-

“হঠাৎ দেখি পচা আণ্ডা

মন্ত্রিকে করিতেছে ঠাণ্ডা।

উড়তে লাগলো কাল ঝাণ্ডা

মন্ত্রীর চোখের উপর।”

এ গানের জন্য সে সময়ে তিনি ১ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে তাঁর সাহিত্য ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

লোকসাহিত্যের এই প্রথিতযশা কিংবদন্তীর নাম কবিয়াল রমেশ শীল মাইজভাণ্ডারী। তিনি ১৮৭৭ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। পরলোকগত হয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে।

“ইস্কুল খুইলাছে” গানটির ২য় লাইনে আছে “গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী ইস্কুল খুইলাছে”। এই গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী হলেন গাউসুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)। তিনি বাংলাদেশে মাইজভাণ্ডারী গানের জনক। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে তাঁর দরবার শরীফ আছে।

কবিয়াল রমেশ শীলের উদ্যোগে ১৯৩৮ সালে বাংলা কবিগানের ইতিহাসে প্রথম সমিতি গঠিত হয়। নাম ‘রমেশ উদ্বোধন কবি সংঘ’। অশ্লীলতামুক্ত কবিগান ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।

একটি ঘটনা বলি। ১৮৯৮ সালে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারে মাঝিরঘাটে দুর্গাপূজা উপলক্ষে কবিগানের আয়োজন করা হয় । প্রায় হাজার পঞ্চাশেক মানুষের উপস্থিতিতে কবিগান শুরু হয় । প্রধান কবিয়াল ছিলেন তৎকালীন জনপ্রিয় কবিয়াল মোহনবাঁশী ও চিন্তাহরণ । কিন্তু গানের আসরে চিন্তাহরণ অসুস্থ হয়ে পড়েন । এতে শ্রোতারা হট্টগোল শুরু করেন । তখন আয়োজকরা কবিয়াল দীনবন্ধু মিত্রকে মঞ্চে আসার জন্য অনুরোধ করেন । কিন্তু কবিয়াল দীনবন্ধু মিত্র তাদের অনুরোধ গ্রহণ না করে রমেশ শীলকে মঞ্চে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন । প্রথমে ভয় পেলেও কোমরে চাঁদর পেঁচিয়ে মঞ্চে উঠে যান রমেশ শীল । জীবনের প্রথম আসরে তিনি টানা আট ঘণ্টা কবিগান গেয়েছিলেন। ঐ আসরে কেও কাউকে হারাতে পারেনি । তবে তখন থেকেই রমেশ শীলের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে ।

রমেশ শীল রচিত পুস্তক সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভূল তথ্য পাওয়া যায় না। যেসকল গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে আশেকমালা, শান্তিভান্ডার, নুরে দুনিয়া, দেশের গান, ভোট রহস্য, চট্টল পরিচয়, ভান্ডারে মওলা, জীবন সাথী, মুক্তির দরবার, মানব বন্ধু, চাটগায়ের পল্লীগীতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও রমেশ শীল বেদুঈন ছদ্দনামে “বদলতি জমানা” শীর্ষক এবং ঋষিভত্ত ছদ্মনামের “ভণ্ড সাধুর” কবিতা শীর্ষক দু’টি পুস্তক প্রকাশ করে ছিলেন। ২০০২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

রমেশ শীলের সৃষ্টিকর্মকে লোকে মনে রাখলেও তাঁকে আজ ক’জনে চেনে! ক’জনে জানে “ইস্কুল খুইলাছে” গানটি বাজলেই তিনি আবার বেঁচে ওঠেন। তবুও তিনি অমর হয়ে আছেন। থাকবেন চিরকাল।

শেয়ার করুন