X

আদম ও হাওয়ার স্বর্গচ্যুতির শিল্পকর্ম

ধর্ম বিষয়ক চিত্রশিল্প

শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে ইউরোপের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় চিত্রকর্মে আদম ও হাওয়ার যথেষ্ট প্রভাব রয়ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পকর্মে তাদের স্বর্গচ্যুতির ঘটনাকে চিত্রিত করা হয়েছে। সে সময়কার প্রায় সব চিত্রকর্মই খ্রিস্টধর্মীয় ধ্যান-ধারণাকে প্রতিফলিত করে।

মধ্যযুগে খ্রিস্টাদের বিভিন্ন প্রার্থনা সংকলিত বই থাকতো। এদেরকে ‘সময় পুস্তক’ ( book of hours) বলা হতো। বইগুলোতে প্রার্থনার পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়বস্তুভিত্তিক কিছু ছবি আঁকা হতো বলে এ এগুলোকে ‘চিত্রিত পাণ্ডুলিপি’ (illuminated manuscript) ও বলা হতো।

চিত্রিত পাণ্ডলিপি

জার্মানির পূর্বাঞ্চলে গোথ (Goth) নামে এক যাবাবর জাতি ছিল। এদের প্রধান দু’টি শাখার একটিকে ভিসিগোথ (Visigoth), অন্যটিকে ওসট্রোগোথ (Ostrogoth) বলা হতো। রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংসে এই গোথদের অবদান ছিল সবচে’ বেশী। মধ্যযুগীয় শিল্প-সাহিত্যেও গোথদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। এ প্রভাবকে গোথিক স্টাইল বলা হতো।

গোথিক স্টাইলের চিত্রিত পাণ্ডুলিপিতে করা বিখ্যাত সময় পুস্তকের নাম ‘ত্রেস রিচেস ওরেস দু দাক দে বেরি’ (Très Riches Heures du Duc de Berry)। এই বইয়ের একটি ক্ষুদ্র চিত্রের নাম ‘আদম-হাওয়ার সৃষ্টি, প্রলোভন এবং স্বর্গ থেকে বিতাড়ন’  (The Creation, Temptation, and Expulsion of Adam and Eve from the Garden of Eden)।  এ ছবিটিতে ঈশ্বরকে যিশু কল্পনা করে চিত্রায়ন করা হয়েছে। ডানাওয়ালা যেটি আদম-হাওয়াকে বের করে দিচ্ছে ওর নাম চেরুব (cherub)। বাংলায় এদেরকে ‘হুর’ বলা যেতে পারে।

আদম-হাওয়ার সৃষ্টি, প্রলোভন
এবং স্বর্গ থেকে বিতাড়ন

বাইবেল মতে, চেরুবরা স্বর্গের পাহাড়াদার এবং ফেরেশতাদের সমান মর্যাদা সম্পন্ন নয়। এরা গঠনে মানুষের মতো হলেও এদের চারটি মুখ ছিল, মানুষের, সিংহের, ষাড়ের ও ঈগলের (ইজাকিয়েল ১:৫, ১০)। চেরুবদের ডানা আছে (ইজাকিয়েল ১:৬,১১,২৩) ।

এ বিষয়ে বিখ্যাত আরেকটি শিল্পকর্মটি একটি ফ্রেসকো (fresco)। দেয়াল বা ছাদের ভেজা প্লাস্টারের উপরে জলরঙে করা শিল্পকর্মকে ফ্রেসকো বলে। প্লাস্টার শুকানোর সাথে সাথে রঙটা দেয়ালে বা ছাদে স্থায়ী হয়ে যায়। শিল্পকর্মটির নাম ‘স্বর্গ থেকে বিতাড়ন’ (The Expulsion from the Garden of Eden, 1424-27)।

এটি আঁকেন ইতালিয় রেনেসা শিল্পী ম্যাসাসিও (Masaccio)। এ চিত্রেও আদম-হাওয়ার পিছনে মাথার উপরে একটি তরবারি হাতে একটি চেরুবকে দেখা যায়।  ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের সান্তা মারিয়া দেল কারমাইন (Santa Maria del Carmine) গির্জার ব্রানকাসি চ্যাপেলের (Brancacci Chapel) দেয়ালে এ ফ্রেসকোটি আছে।

গির্জার ভেতরে প্রার্থনার জন্য বা অন্য কোনো কাজে কিছু ছোট ছোট ঘর থাকে, এ গুলোকে চ্যাপেল বলে; অর্থাৎ, একটি গির্জায় বিভিন্ন চ্যাপেল থাকে। এখানে একটু বলে রাখা ভাল যে গির্জার সাথে ক্যাথিড্রালের (Cathedral) পার্থক্য আছে। ক্যাথিড্রাল হলো কোন একটি  অঞ্চলের (diocese) বিশপের (bishop) জন্য নির্ধারিত গির্জা; অর্থাৎ, সকল ক্যাথিড্রাল গির্জা হলেও সকল গির্জা ক্যাথিড্রাল নয়।

স্বর্গ থেকে বিতাড়ন

আদম-হাওয়ার স্বর্গচ্যুতি নিয়ে একটি মোজাইক (mosaic) আছে। ছোট ছোট (রঙিন) কাঁচ, পাথর বা অন্য কোন বস্তুকে একসাথে কোন দেয়ালে বা অন্য কিছুতে বসিয়ে তৈরী শিল্পকর্মকে মোজাইক বলে। মোজাইকটির নাম ‘স্বর্গচ্যুতি’ (Expulsion from the Paradise)।

সম্ভবত ১২-১৩ শতকে এ মোজাইকটি তৈরী করা হয়েছিল। এখানে আদম-হাওয়া পোশাক পরিহিত, পিছনে একজন দেবদূত তাদেরকে বের করে দিচ্ছেন এবং তাঁর পিছনে একটি চেরুব দাড়িয়ে আছে। বর্তমানে ইটালির সিসিলি শহরের মনরিয়াল (Monreale) ক্যাথিড্রালে মোজাইকটি আছে।

স্বর্গচ্যুতি

ইতালিয় শিল্পী মাইকেলাঞ্জেলো (১৪৭৫-১৫৬৪) রেনেসা প্রভাবিত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী হলেও আদম-হাওয়ার স্বর্গচ্যুতি নিয়ে তাঁরও একটি ফ্রেসকো আছে। বিখ্যাত এ চিত্রশিল্পের নাম ‘মনুষ্যপতন’ (Fall of Man (and the Expulsion from Paradise), 1508-12)। ফ্রেসকোটি রয়েছে ভ্যাটিকান পোপের সরকারি বাসভবনের (Apostolic Palace) সিসিটিন চ্যাপেলের (Cappella Sistina) সিলিংয়ে। দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে চিত্রটি ১৩০.৬ x ৪৩.৫ ফুট।

মনুষ্যপতন

ফ্রেসকোটির এক পাশে আদম-হাওয়া শয়তানের কবলে, অন্য পাশে একটি চেরুব তাদেরকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। এ দুটি ঘটনাকে সংযুক্ত করেছে মাঝের একটি গাছ যেখানে সাপের দেহ ও মানুষের মাথা বিশিষ্ট নারী রূপী শয়তান গাছটি পেঁচিয়ে ধরে হাওয়ার হাতে ‘নিষিদ্ধ ফল’ তুলে দিচ্ছে।

ফ্রেসকোটিতে আঁকা ডুমুর গাছটি ‘পাপ-পূণ্যে জ্ঞানী গাছ’ (tree of the knowledge of good and evil) নামে পরিচিত।  নিষিদ্ধ ফল হিসেবে এখানে ডুমুর চিত্রিত করা হয়েছে। তবে নিষিদ্ধ ফল কি ছিল এটা নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। কখনো এটাকে আপেল, ডুমুর, ডালিম, আঙুর, গম বা মাশরুম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ