X

বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

প্রাচীন বাংলা

৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বদিকে সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমতলভূমিতে অবস্থিত মগধকে কেন্দ্র করে মৌর্য্য সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। এই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র।  চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য, বিন্দুসার ও অশোক এই সাম্রাজ্যকে দক্ষিণ ভারতে বিস্তার করেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ-উপদেষ্টা চাণক্য বা কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত ছিলেন একজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক। তিনি অর্থশাস্ত্র নামক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন। অশোকের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে বাংলার সমগ্র বদ্বীপ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী রাজ্য গড়ে উঠেছিলো। গঙ্গারিডি (গ্রিক) বা  গঙ্গারিডাই (ল্যাটিন) নামে পূর্ব ভারতের সেই শক্তিশালী রাজ্যের সৈন্যবাহিনীতে চার হাজার হাতির এক বিশাল বাহিনী ছিল। এ রাজ্যের বিলুপ্তি কোন নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায় না।

খ্রিষ্টীয় ৩২০ থেকে ৫৫০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল। শ্রীগুপ্ত হচ্ছেন গুপ্ত বংশের আদি পুরুষ। খ্রিস্টীয় তিন শতকের শেষ এবং চার শতকের প্রথমদিকে সম্ভবত প্রথম চন্দ্রগুপ্ত অথবা সমুদ্রগুপ্তের মাধ্যমে বাংলায় গুপ্ত শাসন সম্প্রসারিত হয়। সমুদ্রগুপ্তের শাসনাধীনে আনুমানিক চার শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার স্বাধীন রাজ্যগুলির প্রায় সবকটাই সমুদ্রগুপ্তের শাসনাধীনে চলে আসে।

খ্রিস্টীয় ছয় শতকের শেষের দিকে পরবর্তী গুপ্ত রাজাদের অধীনে পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার অংশ বিশেষে গৌড় রাজ্যের উদ্ভব হয়। সাত শতকের প্রথম দিকে শশাঙ্ক গৌড়ের ক্ষমতা দখল করেন। কর্ণসুবর্ণ ছিল তার রাজ্যের রাজধানী।    

শশাঙ্কের মৃত্যুর পরবর্তী একশ বছর (৬৫০ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) বাংলায় কোনো স্থায়ী সরকার ছিলো না বললেই চলে। সমগ্র দেশ অভ্যন্তরীণ কলহ- কোন্দলে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন এবং বৈদেশিক আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়েছএ সময়কালকে  মাৎস্যন্যায় বলে।

পাল বংশের (৭৮১ থেকে ১১২৪ খ্রিস্টাব্দ) প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার যুগ ছিল ধর্মপাল ও দেবপালের তেজোদ্দীপ্ত শাসনকাল। পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার ধর্মপালের অপর একটি বিশাল স্থাপত্য কর্ম। দেবপালের মৃত্যুর সাথে সাথেই এ গৌরবময় যুগের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় স্থবিরতার যুগ। প্রথম মহীপাল পাল সাম্রাজ্যের হারানো শৌর্য অনেকটা ফিরিয়ে আনেন এবং সাম্রাজ্যে নতুন প্রাণশক্তির সঞ্চার করেন। দ্বিতীয় এ মহীপালের রাজত্বকালে পালবংশের এ দুর্বলতা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। এ সময় কৈবর্ত প্রধান দিব্য এক সামন্ত বিদ্রোহের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলে (উত্তর বাংলা) স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। রামপালের শৌর্যবীর্য ও শক্তি ছিল পাল বংশের শেষ গুরুত্বপূর্ণ আলোকচ্ছটা। তিনি উত্তর বাংলায় পাল আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে পালদের রাজ্য বিস্তারের সক্ষমতা প্রমাণ করেন। কিন্তু এ সাফল্য ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং তাঁর উত্তরাধিকারীগণ এতোই দুর্বল ছিলেন যে সাম্রাজ্যের ক্রমাগত পতন রোধে তাঁরা ব্যর্থ হন।

পালদের পরে সেনগণ বাংলায় একশ বছরেরও (১০৯৭-১২০৬ খ্রি.) বেশিকাল ধরে কর্তৃত্ব করেন। এ বংশের পাঁচজন নৃপতি (বিজয়সেন,  বল্লালসেন,  লক্ষ্মণসেন, বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন) এ সময়ে রাজত্ব করেন।  এ বংশের প্রথম তিনজন রাজা বিজয়সেন, বল্লালসেন ও লক্ষ্মণসেন ছিলেন এ বংশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এ যুগে বাংলায় সংস্কৃত সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। সংস্কৃত কাব্য-সাহিত্যে বাংলার অবদানের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে জয়দেব এর গীতগোবিন্দ। লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় জয়দেব ছিলেন অন্যতম অলঙ্কারস্বরূপ। তাঁর সভায় অপরাপর গুণী ব্যক্তি ছিলেন কবি ধোয়ী (পবনদূত প্রণেতা),  উমাপতিধর, গোবর্ধন (আর্যা-সপ্তশতীর লেখক) ও শরণ। এ পাঁচজনকে লক্ষ্মণসেনের রাজসভার পঞ্চরত্ন হিসেবে গণ্য করা হয়।

মুসলিম শাসনামল (১২০৪-১৭৫৭)

তেরো শতকের সূচনালগ্নে (১২০৪-০৫) বখতিয়ার খলজী কর্তৃক রাজা লক্ষ্মনসেনের সাময়িক রাজধানী নদীয়া অধিকারের মধ্য দিয়ে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়।  বখতিয়ারের মৃত্যুর পর থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দে ইওজ খলজীর মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনাপর্ব বলে অভিহিত করা যায়। ইওজ খলজীর বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক যিনি সর্বপ্রথম মুদ্রা প্রবর্তন করেন।  ১২২৭-১২৮৮/৮৯ পযন্ত বাংলা দিল্লি সালতানাতের অধীনে লখনৌতি রাজ্যভূক্ত ছিল। 

ক) বলবনী বংশ: বুগরা খান এবং কায়কাউস ১২৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করেন। কায়কাউসের পর শামসুদ্দীন ফিরুজ (১৩০১-১৩২২) লখনৌতিতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ফিরুজ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ সুযোগে সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুগলক বাংলা দখল করেন এবং বাহরাম খান সোনারগাঁও ও সাতগাঁয়ের গভর্নর নিযুক্ত হন।

১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাহরাম খানের মৃত্যু হয়। এ সময়ে তাঁরই বর্ম-রক্ষক ফখরউদ্দীন সোনারগাঁও-এ ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহউপাধি গ্রহণ করেন। এ ঘটনা ক্ষমতা দখলের নতুন ধারাবাহিক দ্বন্দ্বের  জন্ম দেয় যার ফলে বাংলায় ইলিয়াসশাহী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ শাসন বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের সূচনা করে যা দুশ বছর অব্যাহত ছিল (১৩৩৮-১৫৩৮)।

খ) স্বাধীন সুলতানি আমল (১৩৩৮-১৫৩৮):

খ-১) প্রথম ইলিয়াসশাহী শাসন (১৩৪২-১৪১২): ইলিয়াসশাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলার স্বাধীন সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হাজী ইলিয়াস। ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে ইলিয়াস শাহ ফকরউদ্দীন মুবারক শাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী ইখতিয়ার উদ্দীন গাজী শাহকে পরাজিত করে সোনারগাঁও দখল করতে সক্ষম হন। এ বংশের পরবর্তী শাসকগণ হলেন- সিকান্দার শাহ, আজম শাহ ও  সাইফুদ্দীন হামজাহ শাহ।

হামজাহ শাহকে পরাজিত করে তাঁর  ক্রীতদাস শিহাবউদ্দীন বায়েজীদ শাহ  বাংলা শাসন (১৪১২-১৪১৪) করেন। শিহাবউদ্দীন বায়েজীদ শাহের পুত্র আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহকে নিহত করে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ রাজা গণেশ ও তাঁর পুত্র ও পৌপুত্র- জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ  ও  শামসুদ্দীন আহমদ শাহ  (১৪১৪-১৪৩৫/৩৬)।

খ-২) পরবর্তী ইলিয়াসশাহী বংশ   (১৪৩৫/৩৬-১৪৮৭): শামসুদ্দীন আহমদ শাহের হত্যার পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে অভিজাতবর্গ সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের এক বংশধর নাসিরউদ্দীনকে বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। এভাবে ইলিয়াসশাহী বংশের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

খ-৩) হাবশী শাসন   (১৪৮৭-১৪৯৩): ইলিয়াসশাহী বংশের শেষ শাসক  জালালউদ্দীন ফতেহ শাহের রাজত্বকালের শেষের দিকে হাবশী ক্রীতদাসগণ বাংলার শাহী দরবারে একটি বিপজ্জনক শক্তিতে পরিণত হয়। ক্ষমতালাভের উদ্দেশ্যে শাহজাদা নামে এক হাবশী খোজা ও ক্রীতদাসদের নেতা ফতেহ শাহকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসন দখল করে। এভাবে বাংলায় হাবশী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

খ-৪) হোসেনশাহী শাসন (১৪৯৩-১৫৩৮): শেষ হাবশী শাসক মুজাফফর শাহের নিপীড়নমূলক শাসনের ফলে তাঁর আরব বংশোদ্ভূত প্রধান উজির আলাউদ্দীন হোসেন শাহ গণবিদ্রোহে তাঁকে হত্যা করে সিংহাসন অধিকার করেন । তিনি হোসেনশাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীকালে বাংলার ক্ষমতায় আসেন নুসরত শাহ, আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহ ও শেষ হোসেনশাহী সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে মাহমুদ শাহের মৃত্যুতে বাংলার স্বাধীন সালতানাতের অবসান ঘটে।

গ) আফগান শাসন (১৫৩৯-১৫৭৬): ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আফগান শাসন শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৫৭৬ সালে। এ সময়কালের উল্লেখযোগ্য শাসক হলেন শেরশাহ ও ইসলাম শাহ। বাংলায় কররানী আফগানদের উত্থানের মধ্য দিয়ে তার বংশের রাজত্বকালের অবসান ঘটে।  ষোলো শতকের তৃতীয় চতুর্থাংশে পূর্ব ভারতে কররানী নামে নতুন আফগান বংশের উত্থানপতন পরিলক্ষিত হয়। ১৫৬৩ থেকে ১৫৭৬ সাল পযন্ত এরা বাংলায় শাসন করে।

ঘ) মুগল শাসন (১৫৭৬-১৭৫৭): ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে খান জাহানের কাছে কররানী আফগান সুলতান  দাউদ খান এর পরাজয়ের পর বাংলায় মুগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।  রাজা, ভূঁইয়া ও জমিদার- কতিপয় সামরিক দলপতি স্বাধীন বা অর্ধ-স্বাধীন দলপতি হিসেবে মুগল আগ্রাসন প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। মুগল আগ্রাসন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে বারো ভূঁইয়া (প্রায় ৩৬ জন) নামে পরিচিত ভূঁইয়ারা ছিলেন সর্বাধিক খ্যাত। তবে বারো ভূঁইয়ার প্রধান ঈসা খানের মৃত্যুর পরে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সুবাহদার ইসলাম খান চিশতি ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে মুসা খানকে পরাজিত করে সমগ্র বাংলা (চট্টগ্রাম ছাড়া) মুগলদের কর্তৃত্বাধীনে আনেন। এর পরে শাহজাদা শাহ সুজা, মীর জুমলা ও শায়েস্তা খান বাংলা সুবাহদার হন। চট্টগ্রাম বিজয়ের জন্য বাংলায় শায়েস্তা খান সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত।

১৬৫১ সালে  সুবাহ্ বাঙ্গালার  সুবাহদার শাহ সুজার নিকট থেকে একটি নিশানের ওপর ভিত্তি করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বার্ষিক নির্দিষ্ট তিন হাজার টাকা পরিশোধের শর্তে এ দেশে বিনা শুল্কে বাণিজ্য শুরু করে।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের সমর্থনপুষ্ট হয়ে মুর্শিদকুলী খান ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবাহদার হন।  ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে  আলীবর্দী খান বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নওয়াব হন। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর দৌহিত্র  সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুনপলাশীর প্রান্তরে মীর জাফর ও তাঁর সহযোগীদের চক্রান্তে ইংরেজদের হাতে সিরাউদ্দৌলা পরাজিত হলে মুগল শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

ঔপনিবেশিক শাসন (১৭৫৭-১৯৪৭) 

ক) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন (১৭৫৭-১৮৫৮): বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) মীর কাসিমের চূড়ান্ত পরাজয় কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে। কোম্পানি নীতি গ্রহণ করল সরাসরি ক্ষমতা দখল না করে একজন নামেমাত্র নওয়াব গদিসীন রেখে প্রকৃত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে তুলে নিয়ে দেশের রাজস্বের ওপর হিস্যা বসানো। এ নীতির অংশ হিসেবেই ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর রবার্ট ক্লাইভ সম্রাটের নিকট থেকে বাংলা, বিহার ও উরিষ্যার দীউয়ানি লাভ করেন। এটি দ্বৈতশাসন (১৭৬৫) নামে পরিচিত।

দীউয়ানির নামে বাংলায় কোম্পানি যে শোষণ ও উৎপীড়নের রাজ্য কায়েম করে ১৭৬৯/৭০ সালের (বাংলা ১১৭৬) মহাদুর্ভিক্ষ তার প্রমাণ। ফলে ব্রিটিশ সরকার  রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩) ও পিট-এর ভারত আইন (১৭৮৪) বলে কোম্পানির বঙ্গ রাজ্যের ওপর ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় করা হলো।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় ইংরেজ শাসক ও তাদের রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের গরীব হিন্দু-মুসলমান চাষীরা বিদ্রোহ করেছিল যা সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। প্রায় তিন দশক ধরে এ বিদ্রোহ চলে। তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সন্ন্যাসী ও ফকিরেরা। তাদের নেতাদের মাঝে প্রধান ছিলেন মজনু শাহ্ ও ভবানী পাঠক।

ইংরেজ রাজত্বের প্রথম একশ’ বছরে ভিন্ন ধরনের প্রতিরোধ সংগ্রাম ওয়াহাবি (১৭৭১-১৮৩১) ও ফরাজী আন্দোলন (১৮৪৩)। বারাসাতের স্বরূপনগর ও বাদুড়িয়া অঞ্চলে এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন মীর নেসার আলী তিতুমীর। তিনি এক বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন। যুদ্ধে তিমুমীরসহ ৪০ জন প্রাণ দিলেন।

একটি স্থায়ী ভূমি ব্যবস্থা ও দক্ষ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গরাজ্যকে একটি শক্তিশালী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য বৃটিশ সরকার লর্ড  কর্নওয়ালিসকে গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত করে। কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) প্রবর্তন করেন।

১৮১৩ ও ১৮৩৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট বলে  কোম্পানির বঙ্গ রাজ্য ব্রিটিশ ভারতের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। এর্ ফলে ১৮৫৪ সালে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা মিলে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গঠিত হয় এবং স্যার ফ্রেডারিক জেমস হ্যালিডেকে বাংলার প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিয়োগ করা হয়।

ওয়াহাবি আন্দোলনেরই সমগোত্রীয় ছিল ফরাজি আন্দোলন। ১৮৪২ সালে এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেন দুদু মিয়া। ওয়াহাবি ও ফরাজি আন্দোলন প্রধানত মুসলমানদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকার ফলে এর একটা ধর্মীয় সীমাবদ্ধতার দিকও ছিল।

সিধু, কানু, ভৈরব প্রমুখের নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল ইংরেজ শাসনের অবসান ও স্বাধীন সাঁওতাল রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সংকল্পে কলকাতা মার্চ করে (সাঁওতাল বিদ্রোহ , ১৮৫৫)। সংঘর্ষে ২৩ হাজার সাঁওতালকে হত্যা করে ইংরেজরা।

১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা ও সিপাহী বিদ্রোহ  হয়। মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে ব্যারাকপুরে সিপাহী বিদ্রোহ হয় এবং শীঘ্রই তা বাংলা জুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। ফলে ১৮৫৮ সালে কোম্পানি বিলুপ্ত ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি ভারত শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

খ) বৃটিশ শাসন (১৮৫৯-১৯৪৭): বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে দেখা দেয় নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ ‘নীল বিদ্রোহ’ (১৮৫৯-১৮৬০) নামেই পরিচিত। যশোরে ১৮৩০তে ও পরে ১৮৮৯-৯০তে বিহারের দ্বারভাঙ্গা ও চকারণে ১৮৬৬-৬৮ পর্যন্ত চললো নীল বিদ্রোহ।

ভারতীয়দের ব্রিটিশবিরোধী পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষ নিরসনের জন্যই ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্দ্যোগে এবং ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হয়।

বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৫ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আদেশে বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ রদ করার প্রস্তাবকদের জন্য এক মর্মস্পর্শী গান আমার সোনার বাংলা লেখেন, যা অনেক পরে, ১৯৭২ সালে, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়। ১৯১২ সালে বঙ্গভঙ্গ করা হয়। বঙ্গভঙ্গ ও পরবর্তীকালের ঘটনা প্রবাহে বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে আরো যাদের নাম প্রাণিধানযোগ্য তাঁদের মধ্যে রয়েছে ক্ষুদিরাম, বাঘা যতিন, মাস্টারদা সূর্য সেন ও ওয়াদ্দেদার।

স্বদেশী আন্দোলন  ভারতে ব্রিটিশ একটি বিরোধী আন্দোলন। এ আন্দোলন ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ হতে উদ্ভূত হয়ে ১৯০৮/১১ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল।  এ আন্দোলনের মুখ্য প্রবক্তাগণ ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বীর সাভারকর, লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক, ও লালা লাজপত রায়। এটিকে বন্দে মাতরম আন্দোলনও বলা হতো।

বৃটিশ শাসন আমলে অবিভক্ত ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও স্বশাসনের চেতনা জাগ্রত হয়। আর এ ক্ষেত্রে মুসলিম স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ।

অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-১৯২২) মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পরিচালিত ভারতব্যাপী অহিংস গণ-আইন অমান্য আন্দোলনগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম। এই আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে “গান্ধী যুগ”-এর সূত্রপাত ঘটায়।

বাংলার হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক বিভেদের সমাধানের লক্ষ্যে চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ছিল বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩)। 

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন  (১৯৩০) শুরু হয় । এ আন্দোলনের পটভূমি হলো সাইমন কমিশন (১৯২৭)। ভারতের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন এবং তা চূড়ান্তকরণের জন্য ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক সাইমন কমিশন গঠিত হয়। কেবল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের নিয়ে এ কমিশন গঠিত হওয়ার কারণে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের সব ধরনের নেতা ও কর্মীরা এটিকে পুরোপুরি একটি শ্বেতাঙ্গ কমিশন বলে বর্জন করে।

১৯৩৫ সালে বৃটিশদের ভারত শাসন আইন সাম্প্রদায়িক ও তফশিলি রাজনীতির জন্ম দেয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের ফলের মাধ্যমে সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনীতি উপমহাদেশের রাজনীতির গতিাধারা বদলে দিল। ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কর্তৃক প্রস্তাব লাহোর প্রস্তাব ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব ছিল ঔ পরিবর্তিত রাজনৈতিক চিন্তাধারারই বহিঃপ্রকাশ। প্রথম স্বতন্ত্র নির্বাচন, তারপর স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। এ হেন অভাবিত পরিবর্তনকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস দল মেনে নিতে পারেনি। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সালের ভারত ও বঙ্গ বিভাগ পর্যন্ত সময়কালটি ছিল বাঙালি জাতির জন্য ক্রান্তিকাল। এর প্রথম পরিণতি দেশ বিভাগ ও অজস্ত্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা।

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শ্বেতাঙ্গ-বিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপক আন্দোলন ভারত ছাড় আন্দোলন (১৯৪২)।

সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র‌্যাডক্লিফের নকশাঁয় ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত বিভাগের  মাধ্যমে ভারত এবং পাকিস্তান নামে দু’টি দেশ সৃষ্টি হয়। বাংলা প্রদেশটি পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা নামের দুটি ভূখন্ডে বিভক্ত হয়। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের এবং পশ্চিম বাংলা ভারতের অংশ হয়। এভাবে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব বাংলা নামক প্রদেশের জন্ম হয়। ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয়।  

পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-১৯৭১)

ভাষা আন্দোলন  (১৯৫২) হলো বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে সংগঠিত গণআন্দোলন। ১৯৪৭ সালের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন, ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস দলের সদস্য  ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের  বাংলাকে অন্যতম ভাষা করার দাবি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্যদের আন্দোলন, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল  মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা, ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠণ, ১৯৫২ সালের খাজা নাজিমুদ্দীন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বক্তব্য, আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ ১৪৪ ধারা অমান্য করে ২১ ফেব্রয়ারিতে রফিক,   জববার,  বরকত, শফিউর ও সালামের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন বিজরের মুখ দেখে। ১৯৫৬ সালে গণপরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে একটি বিল পাস করা হয়।  ভাষা আন্দোলন থেকে এ ভূখন্ডে স্বাধিকারের চিন্তা-চেতনা শুরু হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে  আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে।

১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হলে খাজা নাজিমউদ্দীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল এবং নূরুল আমীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। নূরুল আমীন ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। পূর্ব বাংলার জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি (১৯৫০) ও ভাষা আন্দোলন তাঁর আমলের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কে.এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একটি অংশের নেতা-কর্মীদের কনভেনশনে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন আওয়ামী লিগের যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হিসেবে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়।

পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে। এ নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলাম ২১ দফার ভিত্তিতে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে। নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলমান আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২১৫টি (৭ জন সতন্ত্র সদস্যসহ মোট ২২২টি) আসন লাভ করে প্রাদেশিক সরকার গঠনের সুযোগ পায়। শুরুতেই মন্ত্রিপরিষদ গঠন নিয়ে মনোমালিন্য শুরু হয় এবং যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়।  এ সুযোগে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করে। ১৯৫৬ সালে ফজলুল হক পূর্ব বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ সালে বৈদেশিক নীতিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দলটি বিভক্ত হয়ে পড়লে মওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। এই সংকটময় মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সালের মার্চ মাস থেকে ১৯৫৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সাতটি মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ও তিনবার গভর্নরের শাসন চালু হয়। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান ইসকান্দার মির্জাকে সরিয়ে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করে।

আইয়ুব খানের স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক শাসনামলের অভিনব সৃষ্টি হচেছ মৌলিক গণতন্ত্র। ১৯৫৯ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রণীত মৌলিক গণতন্ত্র্র ছিল চার স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ছাড়াও মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবন্থায় আইয়ুব খান গ্রাম পর্যন্ত সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। ১৯৬০ সালের ১১ জানুয়ারি সারাদেশে মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৬২ সালে সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হলে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় যা ‘বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন’ নামে অভিহিত।

১৯৬৩ এ সোহরাওয়ার্দী ইন্তেকাল করার পরে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খান জয়ী হয়। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনেও মুসলিম লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। প্রমাণ হয় যে, মৌলিক গণতন্ত্র যতদিন থাকবে ততদিন আইয়ুব খানকে অপসারণ করা সম্ভব হবে না। সুতরাং মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা বাতিল করার দাবি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ইস্যু হয়।

ছয়দফা কর্মসূচি  (২৩ মার্চ ১৯৬৬) হলো পাকিস্তানের দু অংশের মধ্যকার বৈষম্য এবং পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশিক শাসনের অবসানের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ঘোষিত কর্মসূচি।

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণসর্মথন লাভ করে। এতে ভীত হয়ে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মরত ও প্রাক্তন সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি অফিসারদের (৩৫ জন) বিরুদ্ধে “রাষ্ট্রদ্রোহীতা বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য” নামক মামলা দায়ের করে। এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং  মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সরকারি এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ সকল বন্দির মুক্তির দাবিতে গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। গণআন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত আইয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবসহ সকল বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয়। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবর রহমানসহ মামলায় অভিযুক্তদের এক গণসম্বর্ধনা দেয়া হয় এবং তৎ​কালীন ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। জয় বাংলা শ্লোগানের উদ্ভবও ঘটে ওই সভায়।

সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং  মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঐ আন্দোলন ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন যৌথভাবে ‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে এবং আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ১১ দফা দাবি ঘোষণা করে। গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারের মুখে টিকতে না পেরে শেষাবধি আইয়ুব খান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ক্ষমতা গ্রহণের ৮ মাস পর ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন যে ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদের এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনামলে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ সনে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টির মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে।

সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায়   জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহবান করা হয়। কিন্তু, ১ মার্চ ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান এক ঘোষণা জারির মাধ্যমে ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে তিনি ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ভাষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার রূপরেখা প্রণয়ন করেন। ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকা আসেন এবং ২৪ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের সংগে বৈঠক করেন। ২১ মার্চ ভুট্টো ঢাকায় এসে আলোচনায় যোগ দেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাসদস্য ও সামরিক সরঞ্জামাদি আসতে থাকে। অবশেষে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় আকস্মিকভাবে গণহত্যা শুরু করে। পাকবাহিনীর এ নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।

মুক্তিযুদ্ধ (২৬ মার্চ- ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১)

১৯৭১-এর ৭ মার্চ শেখ মুজিব যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তাতেই পাকিস্তানী সামরিক জান্তার নিকট তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন।

২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে আর মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর তত্ত্বাবধানে প্রথম সদরদপ্তরটি গঠিত হয় এবং মেজর জেনারেল খাদিম রাজাকে প্রদেশের অবশিষ্টাংশে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। অপারেশনের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। গ্রেপ্তারের আগে ঐ রাতে (২৬ মার্চ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন।

এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে মুক্তিবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চা বাগানে পরিবৃত আধা-পাহাড়ি এলাকা তেলিয়াপাড়ায় অবস্থিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের সদরদপ্তরে একত্রিত হন। এ সভাতেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাহিনী সম্পর্কিত সাংগঠনিক ধারণা এবং কমান্ড কাঠামোর রূপরেখা প্রণীত হয়। কর্নেল এম.এ.জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বময় নেতৃত্ব দেয়া হয়। কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ বাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপিত হয়। ১২ এপ্রিল থেকে এই সদরদপ্তর কার্যক্রম শুরু। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত ও অনিয়মিত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। অনিয়মিত বাহিনী গণবাহিনী নামে পরিচিত ছিল। নিয়মিত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সৈন্যরা। নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ‘জেড ফোর্স’, ‘এস ফোর্স’ ও ‘কে ফোর্স’ গঠিত হয়।  ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন সেক্টরে গণবাহিনীতে নিয়োগ করা হতো। গণবাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শত্রুর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাঠানো হয়। নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরা সশস্ত্রবাহিনীর প্রথাগত যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন।

১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার তথা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। ১০ থেকে ১৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের এক সম্মেলনে অপারেশন চালানোর সুবিধার্থে সমগ্র বাংলাদেশকে এগারোটি সেক্টর ও বিভিন্ন সাব-সেক্টরে বিভক্ত করা হয়।

পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি আরও অনেক বাহিনী সংগঠিত হয়। এ সকল বাহিনীর মধ্যে টাঙ্গাইলের কাদের বাহিনী, সিরাজগঞ্জের লতিফ মির্জা বাহিনী, ঝিনাইদহের আকবর হোসেন বাহিনী, ফরিদপুরের হেমায়েত বাহিনী, বরিশালের কুদ্দুস মোল্লা বাহিনী ও গফুর বাহিনী এবং ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী ও আফতাব বাহিনী উল্লেখযোগ্য।

নাগাল্যান্ডের দিমাপুরে ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠিত হয়। এর সংগঠক ছিলেন এয়ার কমোডর এ.কে খন্দকার। পাকিস্তান নৌবাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা নৌসেনাদের নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর প্রথম নৌবহর ‘বঙ্গবন্ধু নৌবহর’ উদ্বোধন করা হয়।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা যৌথ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন।

মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকে। ফলে পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজয় ও আত্মসমর্পণ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে ভেটো প্রয়োগ করায় এই প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল পাঁচটা এক মিনিটে রমনা রেসকোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যৌথ কম্যান্ডের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তান বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন।

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ