X

ইতিহাসের সেরা ২০-টি ভুল

ভুলের উর্ধে কেউ নয়। সাধারণ মানুষের জীবনের পরতে পরতে ভুলের কালিমা লেগে আছে। কিছু ভুল মার্জনা করা যায়, কিছু ভুল শুধরে নেয়া যায়। কিন্তু কিছু কিছু ভুল থাকে যার যার প্রতিফল হাজার বছরেও শেষ হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু ছোটখাট ভুল আছে যে গুলোর মাশুল ছিল অনেক বড়। সেগুলো অনেক বড় বড় ঘটনার জন্ম দিয়েছে। সে রকম ১৯-টি ভুলের একটি সংকলন দেয়া হল-

১) ভুল চুক্তি, ভুল অপারেশন ও পাঁচ হাজার জীবন

ঘটনার শুরু ‘মিউনিখ চুক্তি’ দিয়ে। ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানির মিউনিখে হিটলারের সাথে ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রেট ব্রিটেনের নেতাদের একটা কনফারেন্স হয়। সেই কনফারেন্সে হিটলার হুমকি দেন জার্মানির প্রতিবেশী দেশ চেকোশ্লোভাকিয়াকে জার্মানির হাতে না তুলে দেওয়া হলে তিনি যুদ্ধ শুরু করবেন। হিটলারের হুমকির কারণে কেউ আর চেকোশ্লোভাকিয়ার সাথে জোট গঠন করেনি। মিউনিখ চুক্তির পরেই ফলে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই হিটলারের সেনাবাহিনী জাতিগতভাবে জার্মান প্রধান বোহেমিয়া (Bohemia)এবং মোরাভিয়ার (Moravia) বেশ কিছু এলাকার দখল নেয়। ১৯৩৯ সালের মার্চ মাসে হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রায় পুরোটাই দখল করে নেয়। চেকোশ্লোভাকিয়ান সরকার লন্ডনে আশ্রয় গ্রহণ করে।

চেকোশ্লোভাকিয়ায় যাতে নাৎসি বিরোধী কোনো প্রতিরোধ গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য হিটলার তার থার্ড ইন কমান্ড রাইনহার্ড হাইডরিককে (Reinhard Heydrich) চেকোশ্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগে পাঠিয়ে দেন। এই রাইনহার্ড হাইডরিক ছিলেন হলোকাস্ট বা ইউরোপের ইহুদিদের নির্বিচারে হত্যা করার প্রধান আর্কিটেক্ট। এইভাবে হত্যা করাকে হিটলারের নাৎসি বাহিনি নাম দিয়েছিল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য ‘ফাইনাল সল্যুশন’। হাইডরিকের নৃশংসতার জন্য তার নাম হয়েছিল ‘দ্য বুচার অব প্রাগ’—প্রাগের জল্লাদ/কসাই। হাইডরিকের সম্পর্কে হিটলার বলেছিলেন, ‘দ্য ম্যান উইদ দ্য আয়রন হার্ট’। ইউরোপের ১.৩ মিলিয়ন ইহুদি সহ দুই মিলিয়ন মানুষ হত্যার জন্য সরাসরি দায়ী রাইনহার্ড হাইডরিক।

লন্ডন থেকে চেকোশ্লোভাকিয়ান সরকার রাইনহার্ড হাইডরিককে হত্যার পরিকল্পনা করে চেকোশ্লোভাকিয়াতে গুপ্তঘাতক প্রেরণ করে। হাইডরিককে হত্যা করার এই অপারেশনের নাম—অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড (Anthropoid)। সরাসরি আক্রমণে (২৭ মে, ১৯৪২) হাইডরিক মরেনি, আহত অবস্থায় তাঁকে বুলভকা (Bulovka) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুরুতর আহত রাইনহার্ড ঘটনার ৮ দিন পর মারা যান। হাইডরিককে হত্যা হওয়ার পরে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল মিউনিখ চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে চেকোস্লোভাকিয়াকে সম্মিলিত জোটের শক্তিশালী অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

মিউনিখ চুক্তিঅপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড– পর পর দুইটি ভুল। এই ভুলের চরম মাশুল গুণতে হয়েছিল চেকোশ্লোভাকিয়াকে। হাইডরিককে হত্যা হবার পরে তাঁর গুপ্তঘাতকদেরকে সহায়তা করার গুজবে নাৎসী জার্মানীর গেস্টাপো প্রধান কার্ল হেরমান ফ্রাঙ্কের (Karl Hermann Frank) নির্দেশে এসএস (SS বা Schutzstaffel, যার আক্ষরিক অর্থ প্রতিরক্ষা বাহিনী, যা নাৎসি পার্টির অধীনে একটি প্যারামিলিটারি বাহিনী ছিল) সেনারা প্রাগের ২০ কি.মি. দূরের ছোট্ট একটি গ্রাম লিদিৎসেকে (Lidice) নিশ্চিহ্ন করে দেয়। তারা এ গ্রামের সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ নারীকে হত্যা করে এবং বাকী জীবিত নারী এবং শিশুদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়। এ শিশুদেরকে গেষ্টাপো অফিসে হস্তান্তর করা হয়, পরে তাদের প্রায় সবাইকে পোল্যান্ডে চেলনো (Chelmno) নামে একটি স্থানে এক্সটারমিনেশন বা ডেথ ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়। অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েডের কারণে আনুমানিক ৫০০০ চেক অধিবাসীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।

কার্ল হেরমান ফ্রাঙ্ক মার্কিন বাহিনীর কাছে পরে আত্মসমর্পণ করেন, ১৯৪৬ সালে প্রাগে তাঁর বিচার হয়। প্রায় ৫০০০ মানুষের সামনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

০২- হিমশৈল নয়, এক গোছা চাবি

আমরা সবাই জানি, হিমশৈলে আঘাতের কারণে টাইটানিক ডুবে গিয়েছিল। তবে ব্যাপারটি কিন্তু পুরোপুরি সেটা নয়। টাইটানিক ডুবে গিয়েছিল এ গোছা চাবির জন্য। সে সময়ে বাইনোকুলার দিয়ে মহাসমুদ্রে হিমশৈলের অবস্থান দেখা হতো। যে কক্ষে সেই বাইনোকুলারটি রাখা হতো তার চাবি থাকতো জাহাজের ‘সেকেন্ড অফিসার’ ডেভিড ব্লেয়ারের (David Blair) ইউনিফর্মের পকেটে। জাহাজ ছাড়ার শেষ মুহুর্তে নতুন ‘সেকেন্ড অফিসার’ হিসাবে দায়িত্ব পায় চার্লস লিটোলার (Charles Lightoller)। লিটোলারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাবার সময় ডেভাড পকেট থেকে বাইনোকুলার রাখা সেই রুমের চাবির গোছাটা তাকে হস্তান্তর করতে ভুলে গিয়েছিলেন। এর পরের ঘটনা আমাদের সবাই জানা আছে………।

০৩- রাইফেল না কেনার জন্য চার বছরের গৃহযুদ্ধ

সস্তা বৃটিশ ‘এনফিল্ড’ (Enfield) রাইফেল কেনার মতো সামান্য একটি সিদ্ধান্ত নিতে জেদাজেদীর কারণে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ চার বছরের (১৮৬১-৬৫) বেশী দীর্ঘায়িত হয়েছিল। গৃহযুদ্ধের সময় আমেরিকা উত্তর (The Union States) ও দক্ষিণে (the Confederacy) বিভক্ত ছিল। যুদ্ধের শুরুতে উত্তরের সেনারা বৃটিশ ‘এনফিল্ড’ রাইফেল কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; কিন্ত প্রধান অস্ত্রাগাররক্ষক জেমস উলফ পুরানো শত্রু বৃটিশদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার বিরোধীতা ও গড়িমসি শুরু করে। এ সুযোগে দক্ষিণের সেনারা ঐ রাইফেলগুলো কিনে নেয়। শুধু এই অস্ত্রর সরবরাহ উত্তরের বিজয়কে অনেক দীর্ঘায়িত করেছিল। জয়ের পরে তারা জেমস উলফকে নির্বাসন দিয়েছিল।

০৪) শুধু একটি খোলা দরজা- একটি সাম্রাজ্যের পতন, অন্যটির উত্থান

রোমান সভ্যতার শেষ চিহ্নটুকু ‘বাইজানটাইন সাম্রাজ্য’ নামে টিকে ছিল। সে সময়কার ‘কনস্ট্যান্টেনোপল’ বা বর্তমানের ইস্তান্বুল ছিল ঐ বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। ৫ম শতকের মধ্যভাগ থেকে ত্রয়োদশ শতকের পূর্বভাগ পর্যন্ত এই কনস্ট্যান্টেনোপল ছিল ইউরোপের সবচেয়ে বড় সমৃদ্ধশালী নগরী।

কনস্ট্যান্টেনোপল শহরটি দূর্গের মতো করে চারদিকে ওয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। চীনের প্রাচীরের মতো শক্তিশালী এ দেয়ালের কারণে স্থল বা নদী পথে কোনোভাবেই কখনো বহিঃশত্রুরা কনস্ট্যান্টেনোপলকে ঘায়েল করতে পারেনি।

১৪৫৩ সালে ২১ বছর বয়সী সুলতান দ্বিতীয় মেহমুদের নেতৃত্ব অটোম্যান তুর্কিরা (Ottoman Turks) কনস্ট্যান্টেনোপল আক্রমণ করে। সাত সপ্তাহ যাবৎ তারা শহরটি অবরোধ করে সবিরাম গোলা-গুলি বর্ষণ করে ফাটলও ধরাতে পারেনি শহরের কোনো দেয়ালে।

এ অভেদ্য দূর্গ প্রাচীরের ছোট্ট একটি দরজার নাম ছিল কেরকোপোর্তা (Kerkoporta)। হায় কপাল! অবরোধ চলাকালে এ দরজার রক্ষীরা শুধু ভুলবশতঃ একদিন সেটি বন্ধ করেনি। ঘটনাটি মেহমেদের কানে পৌঁছায়। এতটুকুনই…।

সমাপ্তি ঘটে বাইজানটাইন তথা রোমান সভ্যতার শেষ চিহ্নটুকু, উত্থান ঘটে অটোম্যান সাম্রাজ্যের।

০৫) বৌয়ের জন্মদিনের বিনিময়ে ফ্রান্সের স্বাধীনতা

জুন মাসের ৬ তারিখকে ‘ডি-ডে’ (D-day) বলে। ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৪৪ সালের এই দিনে মিত্র বাহিনী (ব্রিটেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র) জার্মানির নাৎসি বাহিনীকে বিস্মিত করে নরম্যান্ডিতে (দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে ডেনমার্ক) আকষ্মিক হামলা চালিয়ে ফ্রান্সকে স্বাধীন করে।

জুনের ৫ তারিখে নরম্যান্ডির উপকূল অঞ্চলে অত্যন্ত খারাপ আবহাওয়া ছিল। সেদিন ‘ডেজার্ট ফক্স’ ফিল্ড মার্শাল রোমেল ভাবলেন…

এই দূর্যোগময় আবহাওয়াতে মিত্র বাহিনীর জেনারেল আইজেনহাওয়ার নিশ্চিতভাবে কয়েক সপ্তাহ আর কোনো আক্রমণ করবে না। এদিকে প্রায় বছর পাঁচেক বউ-বাচ্চার সাথে দেখা নেই। তাছাড়া, কালতো লুসির (স্ত্রী লুসিয়া রোমেল, তবে মতান্তরে বলা হয়, আসলে লুসির জন্মদিন ছিল ৬ মে) জন্মদিন; একটা পার্টি-টার্টিতো করা দরকার। সুতরাং, আবহাওয়ার এই সুযোগে একটু বাড়িতে বেড়িয়ে আসি। নরম্যান্ডির উপকূলে অপ্রস্তুত সেনাদল ফেলে রোমেল বৌয়ের জন্মদিন করতে চলে গেলেন।

আর এ দিকে…… লারে লাপ্পা।

০৬) হারিয়ে গেল “NOT”, ধর্ম ভজঘট

পবিত্র বাইবেলের ‘দশ অনুশাসন’ (Ten Commandments)-এর ‘সপ্তম অনুশাসন’ হলো ‘ব্যভিচার করিও না’ (Thou shalt not commit adultery)।

১৬৩১ সালে রাজা প্রথম চার্লসের আমলে ‘রবার্ট বেকার’ ও ‘মার্টিন লুকাস’ পবিত্র বাইবেল মুদ্রন করেছিল। বাইবেলের ঐ মুদ্রনে ছাপাখানার ভুলে “Thou shalt not commit adultery”-এর “not” বাদ পড়েছিল; ফলে বাইবেলের সপ্তম অনুশাসন হলো, ‘তোমরা ব্যভিচার করো’।

ধর্মের কল বাতাসে নড়েছিল। সপ্তাদশ শতকে ইংল্যান্ডে প্রকাশ্য যৌনাচার, ব্যভিচার বেড়ে গিয়েছিল। যা হোক, অবশেষে রাজা প্রথম চার্লসের নির্দেশে প্রকাশকদ্বয়ের লাইসেন্স বাতিল করে ঐ মুদ্রনের সকল বাইবেল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। তবে আজও সেই মুদ্রনের ১১-টি কপি টিকে আছে।

ওরে “NOT” রে তুই সময় মতো আইলি না।

০৭) ‘ছোটকু’ অনুবাদের ভুলে জাপানে ‘ছোটন’ এসেছিল

পার্ল হারবারে জাপানিদের অযাচিত আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে টেনে এনছিল। যুদ্ধের শেষ দিকে জাপানিদের অবস্থা যখন ত্রাহি মধুসূদন তখন ২৬ জুলাই ১৯৪৫ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন মিলে জাপানিদেরকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের আহবান জানিয়ে যে ঘোষণা দিয়েছিল ইতিহাসে তা ‘পোটসড্যাম ঘোষণা’ নামে পরিচিত। এ ঘোষণার চূড়ান্ত শর্তে (ultimatum) বলা হয়েছিল যদি জাপান আত্মসর্মপন না করে তবে জাপানকে সমূলে ধ্বংস করা হবে। ভাষাটি ঠিক এমন ছিল… “The alternative for Japan is prompt and utter destruction”।

অফিসিয়ালি এ ঘোষণার কোনো প্রত্যুত্তর দেয়নি জাপান। তবে ‘পোটসড্যাম ঘোষণা’র প্রেক্ষিতে জাপান কী ভাবছে?’- টোকিওর কোনো এক প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী ‘কানতারো সুজুকি’ এ বিষয়ে জাপানের অভিমত জানাতে বলেছিলেন “মোকুসাতসু” (mokusatsu)। “মোকুসাতসু” শব্দটির দুটি অর্থ- (১) ‘কোনো মন্তব্য নেই’ (‘no comments’)’; (২) ‘থোরাই কেয়ার করি’ (‘I ignore’)। সুজুকির এই বক্তব্য ‘থোরাই কেয়ার করি’ অর্থে ইংরেজিতে অনুদিত হয়ে প্রচারিত হয়। অনেক যুদ্ধ বিশ্লেষক মনে করেন, সুজুকি ‘নো কমেন্টস’ বোঝাতে “মোকুসাতসু” শব্দটি বলেছিলেন।

এ ঘটনার মাত্র মাস খানেক আগে যুক্তরাষ্ট্র আণবিক বোমার সফল পরীক্ষা শেষ করে। তাজা বোমার তেজ তখনও কাটেনি। দামী নতুন মোবাইল কিনলে কারণে-অকারণে যেমন বের করে দেখাতে ইচ্ছা করে, তেমনি ঐ বক্তব্যের কোনো রকম বাছবিচার না করে যুক্তরাষ্ট্র বক্তব্যের পরেরদিনই (৬ আগস্ট ১৯৪৫) জাপানের হিরোশিমায় ও তিন দিন পরে নাগাসাকিতে আণবিক বোমা হামলা করে। এ দুটি হামলায় আনুমানিক দেড় থেকে আড়াই লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটে।

হিরোশিমাতে যে বোমাটি ফেলা হয় তার নাম ছিল “ছোটন” (Little Boy)। লক্ষাধিক মানুষের প্রাণঘাতি এ বোমার নাম শুনলে পুরানো একটি ঘটনা মনে পড়ে।আমাদের গ্রামে আঠারো বছর বয়সী এক ছেলের সুন্নতে খতনার দাওয়াতে গিয়েছিলাম। খতনার প্রস্তুতিকালে ডাক্তার সাহেব তাকে একবার জিজ্ঞেস করলো, ‘বাবা, তোমার নাম কি?’ সে উত্তর দিয়েছিল, ‘ছোটকু’। ‘নাম তো ছোটকু, কিন্তু…’ ডাক্তার সাহেব থামলেন। তিনি আর কথা বাড়াননি। আমার মনে হয় ডাক্তার সাহেব সেদিন ‘ছোটকু’ নামটি শুনে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন।

০৮) বার্লিন দেয়ালঃ ‘ভুল যদি হয় মধুর এমন, হোক না ভুল’..

তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তির ছায়াতলে দুই জার্মানিকে বিভক্ত করে বার্লিন দেয়াল তোলা হয় ১৯৬১ সালে, সৃষ্টি হয় সোভিয়েত প্রভাবিত পূর্ব ও পুঁজিবাদী পশ্চিম জার্মানি। এই দুই জার্মানির লোকজনের মধ্যে সব ধরণের যোগযোগ বন্ধ ছিল।

অপরিকল্পিতভাবে ভাগাভাগিরেএকই পরিবারের বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন ভিন্ন ভিন্ন জার্মানির অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে দেখা-শোনা, চলাচল বা অন্য যেকোন ধরণের যোগাযোগ বন্ধ ছিল।

ধীরে ধীরে দুই জার্মানির বিভেদের মাত্রা কমে আসলে পূর্ব জার্মানির সরকার দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা শিথিলে সম্মত হয়েছিল।

এ বিষয়ে জনগণকে অবহিত করার জন্য গুন্টার শাবোস্কি (Günter Schabowski) নামে পূর্ব জার্মানির একজন রাজনীতিবিদ কোনো রকম পূর্ব-প্রস্তুতি ছাড়া ৯ জুলাই ১৯৮৯ তারিখে এ বিষয়ে একটি লিখিত বক্তব্য নিয়ে মঞ্চ ওঠেন। লিখিত বক্তব্য অনুসারে তিনি নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষটি জনগণকে অবহিত করেন।

বক্তব্যের শেষে একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করে “কখন থেকে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আদেশ কার্যকরী হবে?” শাবোস্কি এ ধরণের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি কাগজ উল্টাতে লাগলেন, কোথাও কিছু পেলেন না। মিডিয়ার সামনে এ রকম বিব্রতকর অবস্থায় বিড়বিড় করে তিনি হঠাৎ করেই বলে দিলেন, “এক্ষুনি” (Immediately, right away)।

ব্যস, এটুকুনই। বিদ্যুৎ গতিতে এ সংবাদ ছড়িয়ে গেল দুই জার্মানিতে। লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়লো দেয়াল ভাঙার কাজে। ভেঙে পড়লো ২৮ বছরের বার্লিন দেয়াল……….

০৯) ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম…’

ত্রয়োদশ শতক। মহাপরাক্রমশালী, দুর্ধর্ষ চেঙ্গিশ খান (Genghis Khan) তখন মোঙ্গল সাম্রাজ্যের অধিপতি। তাঁর পশ্চিম পাশের সাম্রাজ্যের নাম ছিল ‘খারেজমিদ’ (Khwarezmid) সাম্রাজ্য যা এখন ইরাক-ইরানের অন্তর্গত। শাহ আলাদ-দিন মোহাম্মদ নামে এক শাসক তখন এ অঞ্চলে শাসন করতো।

সৎ প্রতিবেশী নীতিতে কূটনৈতিক বন্ধুত্ব ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চেঙ্গিশ খান খারেজমিদের শাহের কাছে তাঁর দূত পাঠিয়ে ছিলেন।

এই সময়কার ইরাক-ইরান দেখলে অনুমান করা যায় তারা সে সময়েও কতটা গোঁয়ার ছিল। কোনো কারন ছাড়াই চেঙ্গিশ খানের এ অফার প্রত্যাখ্যান করে শাহ তাঁর দূতের শিরশ্ছেদ করে। এতে ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়েছিল চেঙ্গিশ খান। পরে ২ লক্ষ সেনা পাঠিয়ে সে খারেজমিদ সাম্রাজ্য তছনছ করে ফেলে…..।

১০) ‘ফেসবুক’ও ওঁদের ‘ফেস’ দেখে ‘বুক’টা পড়তে পারেনি

২০০৯ সালে ব্রায়ান একটন (Brian Acton) ও জ্যান কৌম (Jan Koum) ফেসবুকে চাকুরির ইন্টারভিউ দিয়েছিল। ওখানে তাঁদের চাকুরিটা হলো না। সে সময়ে একটন তাঁর এক টুইটে লিখেছিল “ফেসবুক আমাকে ফিরিয়ে দিল। …….জীবনের পরবর্তী সাহসী পদক্ষেপের প্রত্যাশায়” (Facebook turned me down………..Looking forward to life’s next adventure)।

কী ছিল সেই ‘সাহসী পদক্ষেপ’? একটন ও কৌম মিলে অনলাইনে ফ্রি চ্যাটিংয়ের জন্য তৈরি করলো “হোয়াটসঅ্যাপ” (Whatsapp)। সে সময়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেল এ অ্যাপটি। ফেসবুক পরবর্তীতে একটন ও কৌমের “হোয়াটসঅ্যাপ” কিনে নেয়। এ জন্য ফেসবুক তাঁদেরকে ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করেছে।

১১) ইতিহাসের শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না

তিনটি দেশের সামরিক বাহিনী একই ভুল বার বার করেছিল- সুইডেন, ফ্রান্স ও জার্মানি। এরা তিন জনই শীতের কারণে রাশিয়া আত্রমণ করে ধরা খেয়েছিল।

১৭০৮ সালে সুইডেনের দ্বাদশ চার্লস রাশিয়া আক্রমণ করে। এ যুদ্ধে ১৬০০০ সৈন্য হারিয়ে রাশিয়ার পিটার দ্যা গ্রেটের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় চার্লস।

ঐ ঘটনার শতাধিক কাল পরে ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন রাশিয়ার প্রথম আলেকজান্ডরকে আক্রমণ করে। এ আক্রমণে নেপোলিয়নের মস্কো দখল করতে করতে ঠাণ্ডায় হাজার হাজার সৈন্যের মৃত্যু ঘটে। ফলশ্রুতিতে নেপোলিয়ন পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।

একই ভুল তৃতীয়বার করেছিল হিটলার। অভিযানটির নাম ছিল ‘অপারেশন বারবারোসা’। ১৯৪১ সালের জুন মাসে এক মিলিয়ন সৈন্য নিয়ে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করে। শীতের আগেই সে রাশিয়া দখল করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ মাসেও তা সম্ভবপর হয়নি। ফলে নভেম্বর আসতে আসতে ভয়াবহ ঠান্ডায় দুই-তৃতীয়াংশ সেনা মৃত্যুবরণ করে।

১২) কলম্বাস কী করতে গিয়ে কী করেছিলেন!!

কলম্বাসের ইচ্ছে ছিল ইউরোপ থেকে আটলান্টিক অতিক্রম করে পশ্চিম দিক দিয়ে তিনি এশিয়ায় যাতায়াতের জন্য একটি জলপথের সন্ধান করা। এ জন্য তিনি ১৪৯২ সালে ‘নিনা’, ‘পিনটা’ ও ‘সান্তা মারিয়া’ নামের তিনটি জাহাজ নিয়ে যাত্রা করেন।

ক্যারিবিয় সাগরের বাহামাতে গিয়ে জাহাজ ঠেকলো। এ সময়ে তিনি হাইতি ও ডোমিনিকান রিপাবলিকেরও সন্ধান পেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে পশ্চিম দিকের এশিয়ান দ্বীপগুলিতে পৌঁছেছেন। পূর্বে আবিস্কৃত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্যান্য মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহ হতে এদেরকে আলাদা করে বোঝানোর জন্য তিনি দ্বীপগুলোর নামকরণ করেন ‘ওয়েস্ট উন্ডিজ’।

১৪৯৩, ১৪৯৮ ও ১৫০২- এর পরে তিনি আরো তিন বার পশ্চিম দিক দিয়ে তিনি এশিয়ায় যাতায়াতের জলপথ আবিস্কারের চেষ্টা করেন। তবে কোনো বারেই তাঁর সফলতা আসেনি।

যদিও কলম্বাসকে আমেরিকার আবিস্কারক বলে, তবু আমেরিকা বলতে যে উত্তর আমেরিকা বোঝায় কলম্বাস কিন্তু সেটা আবিস্কার করেননি। তাছাড়া, ইউরোপিয়দের মধ্যেও তিনি আমেরিকা মহাদেশে প্রথম পৌঁছাননি। ইউরোপিয়দের মধ্যে কলম্বাসেরও অনেক আগে আমেরিকায় পৌঁছেছিল স্ক্যান্ডনেভিয়ান দেশগুলোর ভাইকিংসরা। এখন চীনাদের দাবী, কলম্বাস আমেরিকার মাটিতে পা দেওয়ার প্রায় ৩ হাজার বছর আগেই নাকি চীনারা পৌঁছে গিয়েছিল আমেরিকায়। তাদের এ দাবীর কিছু প্রমাণও নাকি তাদের হাতে আছে।

যদি চীনারা সর্বপ্রথম আমেরিকায় পৌঁছে থাকে, তবে তারা আমেরিকায় প্রথম যে লোকটির সাক্ষাৎ পেয়েছিলো তাঁর পৈতিক নিবাস খুঁজলে দেখা যাবে সেটা বাংলাদেশের কোনো একটা অঞ্চলে। কোন অঞ্চল হতে পারে?

১৩) বদরাগী কাস্টমার ও পটেটো চিপস

১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। নিউইয়র্কের ‘সারাটোগা স্প্রিংস’ শহরের এক রেস্টুরেন্ট, নাম ‘ক্যারেই মুন লেইক হাউজ’। এ রেস্টুরেন্টের কুকের নাম জর্জ ক্রাম। একদিন ক্রামের দোকানে বদমেজাজি এক কাস্টমার আলু ফ্রাইয়ের অর্ডার দিলো। ক্রাম তাকে আলু ফ্রাই পাঠাল। নাহ, ভাজি তার মন মতো হলো না। আলুর স্লাইস গুলো নাকি একটু মোটা হয়েছে, লবণ কম, আর ফ্রাইটাও নাকি ঠিকমতো হয়নি। ক্রাম নতুন আরেকটা আলু স্লাইস করে তাকে ফ্রাই করে দিলো। এবারও সে খুশী না। সে আবারও আলু ফ্রাই ফেরত পাঠালো। ক্রামের মেজাজটা বেজায় খারাপ হলো। এবারে সে রাগের বশে খুব পাতলা করে আলু কেটে তাতে বেশী করে লবণ মাখিয়ে কড়া করে ফ্রাই করলো। আশ্চর্য! মেজাজী কাস্টমারের মনটা চনমনে হয়ে উঠলো। সে আরো আলু ফ্রাইয়ের অর্ডার দিলো। আলুর এ ধরণের ফ্রাই সে সময়ে ‘সারাটোগা চিপস’ নামে খ্যাতি পেয়েছিল। সেই ‘সারাটোগা চিপস’ই আজকের জনপ্রিয় পটেটো চিপস।

১৪) প্যারানইড স্ট্যালিনঃ শয়তান মরে ত্যানা প্যাঁচাইয়া

প্যারানইয়া (paranoia) বা ‘নির্যাতন ভ্রম’ এক ধরণের মানসিক বৈকল্য। এ ব্যাধিতে আক্রান্ত লোকজন অযথা অন্যদেরকে সন্দেহ করে, বিনা কারণে অন্যদেরকে নিজের জীবনের জন্য হুমকি বলে মনে করে।

রাশিয়ার অন্যতম স্বৈরশাসক জোসেফ স্ট্যালিনের মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন ধরণের গুজব প্রচলিত আছে। এ সব গুজবের মধ্যে অন্যতম তাঁর প্যারানইয়া সমস্যা। স্ট্রোকের কারণে ১৯৫৩ সালের ৫ মার্চে স্ট্যালিন মারা যান।

প্যারানইয়ার সমস্যার কারণে অনুমতি ছাড়া স্ট্যালিনের রুমে যে কারো প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। স্ট্যালিনের দ্বাররক্ষীরা ছিলনে উভয় সঙ্কটে- একদিকে যেমন এ আদেশ অমান্যকারীর একমাত্র শাস্তি ছিল শিরশ্ছেদ; অন্যদিকে, যদি কোন প্রয়োজনীয় মুহূর্তে কোনো রক্ষীকে পাওয়া না যায় তবে সেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে। মার্চের এক তারিখ সন্ধ্যায় স্ট্যালিন তাঁর রুম থেকে বের হলেন না। দ্বাররক্ষীরা চিন্তিত হয়ে পড়লো। তারা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো। বাইরে থেকে তারা কয়েকবার ভিতরে গোঙানির আওয়াজ শুনলেও কেউই ভিতরে যেতে সাহস করলো না। এ ভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যেতে লাগলো।

অবশেষ ডাক্তার এলো। তারা সবাই ঘরে ঢুকে দেখলো মেঝেতে পড়ে আছে স্ট্যালিন। নেয়া হলো হাসপাতালে। এ ঘটনার পরে তিন দিন কোমায় থেকে চতুর্থ দিনে স্ট্যালিন মারা যায়।

পোস্টমর্টেম রিপোর্ট মতে, স্ট্যালিনের স্ট্রোক হয়েছিল সেই ১ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়।

১৫) বিড়াল পড়েছে ধরা ইঁদুরের ফাঁদে

১৯৫৯ সালে ফিডেল ক্যাস্ট্রো মার্কিন মদদপুষ্ট শাসক জেনারেল ফুলগেনসিও বাতিস্তার (Fulgencio Batista) কাছ থেকে কিউবা কেড়ে নেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি বীচ থেকে মাত্র ৯০ কি.মি. দূরে অবস্থিত কিউবা থেকে সোভিয়েত রাশিয়া ঘেঁষা কমিউনিজমে দীক্ষিত ফিদেল কাস্ট্রোকে উৎখাত করার জন্য মার্কিনিদের সিআইয়ের তৎপরতা বেড়ে যায়। এ ষড়যন্ত্রের সূত্র ধরে ফিদেলের ক্ষমতা দখলের দুই বছর পরে মার্কিনিরা কিউবাতে বড়সড় এক আক্রমণের পরিকল্পনা করে। ইতিহানে এ আক্রমণ ‘বে অভ পিগস হামলা’ নামে পরিচিত।

মার্কিনিদের এ আক্রমণ কৌশল ছিল দুই দিক থেকে একসাথে আক্রমণ, এক দল আকাশ পথে আর অন্য দলটি জলভাগ দিয়ে ‘বে অভ পিগসে’ আক্রমণ করবে। ফিদেলের ক্ষমতা দখলের পরে কিউবা থেকে যারা আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিল তাদের মধ্য থেকে আমেরিকায় প্রশিক্ষিতদের নিয়ে গঠিত ‘ব্রিগেড ২৫০৬’ জলপথে ‘বে অভ পিগসে’ পৌঁছাবে। একই সময়ে নিকারাগুয়ায় অবস্থিত মার্কিন এয়ারবেস থেকে ‘বি-২৯’, ‘বি-২৬বি’ বোম্বারসগুলো উড়ে এসে কিউবার মিলিটারি এয়ারক্রাফটগুলোর উপর আঘাত হানবে। একই সাথে ইউ.এস. নেভী এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার থেকে আরো কিছু ফাইটার জেট এসে ঐ ‘বি-২৯’ বোম্বারসগুলোকে কাভার করবে।

প্ল্যান, আক্রমণের ধরণ সবকিছু ঠিকঠাক ছিল, তারপরেও ছোট্ট একটি ভুলের কারণে এ হামলায় লজ্জাজনকভাবে মার্কিনিদের পরাজয় ঘটে। ভুলটি হলো নিকারাগুয়ার মার্কিন বেস ও কিউবার মধ্যে সময়ের পার্থক্য।

কিউবার স্থানীয় সময় ছিল নিকারাগুয়ার স্থানীয় সময়ের ২ ঘণ্টা বেশী। ফলে ‘বি-২৯’, ‘বি-২৬বি’ বোম্বারসগুলো ইউ.এস. নেভী এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার থেকে কাভার করতে আসা ফাইটার জেটগুলোর এক ঘণ্টা আগে সেখানে পৌঁছে আক্রমণ শুরু করে। অর্থাৎ, কাভার করা ফাইটার জেটগুলো বোম্বারসদের একঘণ্টা পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়; কিন্তু ততক্ষণে দুটো ‘বি-২৬বি’ ধরাশায়ী, মার্কিন বিমান বাহিনীর চারজন হৃত।

১৬) রাশিয়ার পরকিয়া ক্রিমিয়াঃ ভুল একটি, মাশুল বহুবিধ

গোভজদোভ ও ফিওদরভের নেতৃত্বে রুশ অভিযাত্রী দল ১৭৩২ সালে আলাস্কা আবিস্কার করেছিল। এরপর থেকে আলাস্কা রাশিয়ার সঙ্গে ছিল। ১৭৯৯ সাল থেকে এক রুশ-মার্কিন কোম্পানি রাশিয়ার হয়ে আলাস্কা দেখভাল করার কাজ করতো। রুশ নাগরিকরা কখনো আলাস্কায় জনবসতি গড়ে তোলার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। নগণ্য সংখ্যক রুশী, কয়েক হাজার এস্কিমো ও রেড ইন্ডিয়ানদের নিয়ে একটি বৃহৎ অঞ্চলের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ঐ কোম্পানিকে দিনে দিনে দেনাগ্রস্ত করে তোলে। ধীরে ধীরে আলাস্কার ব্যাপারে রাশিয়াও উদাসীন হতে থাকে। এ সময়কালে কানাডা বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল; অর্থাৎ, আলাস্কার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বের সমগ্র ভূ-ভাগই ছিল ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে।

১৮৫৩ সালের অক্টোবর মাসে তুরস্কের নিয়ন্ত্রিত দারদানেলিস প্রণালি দিয়ে যুদ্ধজাহাজ চলাচলের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তুরস্কের খ্রিস্টানদের রক্ষার অজুহাতে অটোমান সাম্রাজ্যের তুর্কি এলাকায় রাশিয়া আক্রমণ চালালে ক্রিমিয়া যুদ্ধের সূচনা হয়। অটোমান সাম্রাজ্যের মিত্রশক্তি ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং সার্দিনিয়া রাশিয়ার সঙ্গে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে । রাশিয়ার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ১৮৫৬ সালে প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। চুক্তির শর্ত অনুসারে রাশিয়া তাদের অধিকৃত কিছু এলাকা তুরস্কের হাতে ছেড়ে দেয়। উল্লেখ্য, ক্রিমিয়া এখন ইউক্রেনের অংশ আর সারডিনিয়া পরবর্তীতে ইটালির অংশ হয়ে যায়।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয়ের পরে রাশিয়ার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। ঐ যুদ্ধের পরে পদাতিক ও নৌবাহিনী পুনরুদ্ধার করার জন্য রাশিয়ার প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। অর্থের প্রয়োজন থেকেও বেশি জোরালো ছিল আলাস্কার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বের বৃটিশদের হাতে আলাস্কা খোয়াবার ভয়। একদিকে অর্থের যোগান, অন্যদিকে বৃটিশভীতি- এ দুয়ে মিলে রাশিয়া আলাস্কা বিক্রয়ে ব্যতিব্যস্ত হয় পড়ে।

১৮৫৯ সালে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে আলাস্কা ক্রয়ের প্রস্তাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে মতামত দেবার আগেই যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-১৮৬৫) শুরু হয়। ভেস্তে যায় রাশিয়া ক্রয়-বিক্রয়ের সব পরিকল্পনা। গৃহযুদ্ধ শেষে বিষয়টি আবার পুনরায় আলোচনায় আসলে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী উইলয়াম সেয়ার্ড (William Seward) প্রস্তাবটি লুফে নেন। ১৮৬৭ সালের ১৮ অক্টোবর তারিখে রুশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আলাস্কা ভূখণ্ড হস্তান্তরিত হয়। প্রতি একর ১.৯ সেন্ট হিসেবে (প্রতি বর্গ কিলোমিটার ৪.৭৪ ডলার) আলাস্কার মোট মূল্য নির্ধারিত হয় প্রায় ৭২ লক্ষ মার্কিন ডলার। সে সময়ে নিউইয়র্কের যেকোন পাঁচ তলা ভবনের চেয়েও কমে যুক্তরাষ্ট্র এ বিশাল ভূ-খণ্ড ক্রয় করে। ১৯৫৯ সালে আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯তম অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা লাভ করে।

মজার ব্যাপার হলো, আলাস্কা ক্রয় করে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেয়ার্ড যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছিলেন। তাঁর আলাস্কা ক্রয়কে তখন ‘সেয়ার্ডের বোকামি’ (Seward’s Folly) বলে ব্যাপক লেখালেখি হয়। শুধু তাই নয়, মার্কিন সিনেটে এ সিদ্ধান্তটি পাস করানোর জন্য নাকি ঘুষ দেয়া হয়েছিল বলে জনশ্রুতিও আছে। আলাস্কা বিক্রয় করে রাশিয়া উত্তর আমেরিকায় শুধু কৌশলগত একটি অবস্থান হারায়নি, সেই সাথে হারিয়েছে খনিজ তেল, গ্যাস, প্ল্যাটিনাম ও কয়লাসমৃদ্ধ এ বিশাল ভূ-খণ্ড। এ সব কিছুর পেছনে দায়ী ছিল একটি ভুল- ক্রিমিয়া আক্রমণ। তবে, রুশদের মতে সেটা ভুল বলে বিবেচ্য নাও হতে পারে।

১৭) গাড়ীচালকের রাস্তা ভুলের খেরাসত, এক বিশ্বযুদ্ধ

গাড়ীচালকের একটি ছোট ভুলে একটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফি বোমা হামলায় আহত লোকজনকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিল। ফেরার পথে গাড়ীচালক রাস্তা ভুল করে তাদেরকে অন্য যে রাস্তায় নিয়ে যায় ঘটানাচক্রে সেখানেই এক সার্বিও আঁততায়ীর ওঁত পেতে ছিল। হত্যা হলো যুবরাজ ও তাঁর পত্নী; তারপর, বিশ্বযুদ্ধর ঘণ্টা বেজে উঠলো…

১৮) ওরাকলের গ্যাঁড়াকলে রাজ্যনাশ

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের মাঝামাঝিতে পশ্চিম আনাতোলিয়াতে (বর্তমানে তুরস্ক) লাইডিয়া (Lydia) নামে একটি রাজ্য ছিল। অসম্ভব সম্পদশালী লাইডিয়া রাজ্যের পূর্বে ও পশ্চিমে ছিল দুই শক্তিশালী সাম্রাজ্য। পশ্চিমে গ্রিস (Ionian Greek) আর পূর্বে পারস্য রাজা দ্যা গ্রেট সাইরাস (Cyrus the Great)। সাইরাসের ঐ সাম্রাজ্য মিডিয়া (Empire of the Medes) নামেও পরিচিত ছিল।

মাত্র ২৫ বছর বয়সে ক্রোয়েসাস (Croesus) লাইডিয়ার (রাজ্যকাল ৫৬০-৫৪৭ খ্রিঃপূঃ) রাজ্যাসনে বসেন। ক্রোয়েসাসের পিতা অত্যন্ত রাজ্যকৌসুলী ছিলেন। তিনি পারস্য ও গ্রীস উভয় শক্তির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। কিন্তু, পুত্র পিতার নীতিতে অটল থাকলেন না। তিনি গ্রীসের সহায়তা নিয়ে পারস্য জয়ের নেশায় মত্ত হলেন।

গ্রিসের ডেলফাই নগরে গ্রিক দেবতা এপোলোর এক মন্দির ছিল। এই মন্দিরের মহিলা ধর্মযাজকের নাম ছিল পাইথিয়া (Pythia)। গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল যে পাইথিয়ার ভবিষ্যৎ বাণী করার ক্ষমতা আছে। তাই গ্রিকরা ভবিষ্যৎ জানার জন্য পাইথিয়ার কাছে যেতো। পারনাসাস নামের এক পাথরের (Mount Parnasus) উপর বসে পাইথিয়া ভবিষ্যৎ বাণী করতেন। তাঁর এসব ভবিষ্যৎ বাণী ডেলফাইয়ের ভবিষ্যৎ বাণী (Oracle of Delphi) নামে পরিচিত। পারস্য আক্রমণের পূর্বে ক্রোয়েসাস যুদ্ধের ভবিষ্যৎ জানার জন্য গ্রীকদের ভবিষ্যৎ প্রবক্তা মন্দির ডেলফাইয়ের শরণাপণ্ন হলেন।

ডেলফাইয়ের ভবিষ্যৎ বাণী সব সময়ই ছিল খুবই গোলমেলে ও রহস্যময়। ক্রোয়েসাস তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, তিনি পারস্য আক্রমণ করলে কি হবে? পাইথিয়া বললেন, ক্রোয়েসাস যুদ্ধে গেলে একটি বিশাল একটি সাম্রাজ্য ধ্বংস হবে। ক্রোয়েসাস আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর রাজ্য কতদিন টিকে থাকবে? উত্তর এলো, যতদিন পর্যন্ত মিডিয়া সম্রাজ্যে (সাইরাসের সাম্রাজ্যে) একজন খচ্চর ক্ষমতায় না আসবে ততদিন লাইডিয়া টিকে থাকবে। ক্রোয়েসাস খুশি মনে সাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলো।

মাস না পেরুতেই সাইরাস লাইডিয়া দখল করে নেয়। বন্দী হয় ক্রোয়েসাস। তবে কি ডেলফাইয়ের ভবিষ্যৎ বাণী মিথ্যা ছিল? না, মিথ্যাছিল না। পাইথিয়া বলেছিল, একটি বিশাল একটি সাম্রাজ্য ধ্বংস হবে। হ্যাঁ, লাইডিয়া ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ভবিষ্যৎ বাণী, খচ্চরের মিডিয়া সাম্রাজ্য শাসন?

হ্যাঁ, এটাও সত্য ছিল। পারস্য ও মিডিয়া দুই রাজ্যের দুই বংশের দুইজন ছিলেন সাইরাসের পিতা-মাতা। যেমনি গাধা ও ঘোড়ার প্রজননে জন্ম নেয় খচ্চর, তেমনি দুই বংশের শঙ্করজাত সন্তান ছিল সাইরাস। শঙ্কর জন্মের বিবেচনায় সাইরাসকে তো খচ্চর বলা যেতেই পারে।

ওরাকলের গ্যাঁড়াকলে রাজ্যনাশ হলো লাইডিয়ার।

১৯) সালেম ডাকিনী বিচারকাণ্ড

যে সময়ে ভারত বর্ষের রাজা-বাদশারা ময়ুর সিংহাসনে বসে রাজ্য শাসন করতো তখন মার্কিনীরা কাপড়-চোপড় পড়তেও শেখেনি। পাঁচশো বছর আগে আমেরিকা আবিস্কার হয়। ঐ অঞ্চলের বন-বাদাড়ে তখন প্রায় উলঙ্গ কয়েকশ জাতিগোষ্ঠী ছিল। এদেরকে বলতো রেড ইন্ডিয়ান। এ সব রেড ইন্ডিয়ানদের রক্তের উপর দাড়িয়ে যখন ইউরোপিয়ানরা মার্কিন সভ্যতার গোড়াপত্তন করছিল, ভারতবর্ষে তখন শতবর্ষী তৈমুরি সাম্রাজ্যের সূর্যের অস্তাচল, ভোরের আভায় ফুটে উঠছে মুঘল সাম্রাজ্যের নাম।

মার্কিনীরা এখন যতটা সভ্য, আধুনিক হিসেবে নিজেদেরকে জাহির করার চেষ্টা করুক না কেন তাদের এ সভ্যতার বয়স দুশো বছরের বেশী নয়। এর আগে তাদের ইতিহাসে খুনোখুনি আর ধর্মীয় কুসংস্কারের শতশত বর্বরতম কালো অধ্যায় রয়েছে। এদের একটির নাম ‘সালেম ডাকিনী বিচার’ (Salem Witch Trials)।

কারণটা সঠিক জানা নেই। সতের শতকের শেষ দশকে (১৬৯২ সালে) আমেরিকার ম্যাসাচুয়েটস (Massachusetts) রাজ্যের পূর্ব দিকে, বিশেষ করে সালেম নামের একটি গ্রামে ব্যাপকভাবে মৃগীরোগের (hysteria) প্রকোপ ঘটে। এ রাজ্যে সে সময়ে খ্রিস্টানদের প্রটেস্ট্যান্ট (Protestant) উপদলের একটি মৌলবাদী পিউরিটান (Puritanism) মতালম্বীদের আধিপত্য ছিল। পিউরিটানরা ডাকিনীবিদ্যায় বিশ্বাস ছিল। তাদের ধারণা ছিল গ্রামের কিছু মানুষরূপী ডাইনীদের জন্য মৃগীরোগ ছড়াচ্ছে। ভারত উপমহাদেশেও এমন কিছু ধারণা প্রচলিত ছিল, যেমন গ্রামে ‘ওলাবিবি’র আগমন হলে গুটি বসন্ত ছড়িয়ে পড়তো।

সালেম গ্রামের ঘরে ঘরে যখন মৃগীরোগ দেখা দিতে লাগলো তখন তারা প্রথমে তিতুবা (Tituba) নামের এক দাসী, সারাহ ওসবার্ন (Sarah Osburn) ও সারাহ গুড (Sarah Good) নামের দুই বিধবা নারীকে ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করলো। দেখতে দেখতে সে সংখ্যা একশতে গিয়ে দাড়াল। ঐ বছরের জুন মাসে ম্যাসাচুয়েটসের গভর্নর উইলিয়াম ফিপস (William Phips) ঐ সকল ডাইনিদের বিচারের জন্য একটি বিশেষ আদালত গঠন করলো।

হাস্যকর সব স্বাক্ষ্য-প্রমাণও মিললো! বিচার শুরু হলো তথাকথিত ডাইনিদের। প্রহসনমূলক সেই বিচারে অভিযুক্ত কুড়িখানেক লোককে ডাইনি চিহ্নিত করে কাউকে ফাঁসীতে ঝোলানো হলো, আবার কাউকে জীবন্ত পোড়ানো হলো। মজার ব্যাপার হলো অভিযুক্তদের সবাই ছিল গ্রামের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী। যে গভর্নর সালেম ডাকিনী বিচারের আয়োজন করেছিল এবার তাঁর পালা। ফিপসের স্ত্রীকে ডাকিনী হিসেবে চিহ্নিত হলো। টনক নড়লো ফিপসের। অক্টোবর মাস থেকে ডাকিনি সন্দেহে গ্রেফতার নিষিদ্ধ হলো। শেষ হলো আমেরিকার ইতিহাসের জঘন্যতম এক অধ্যায়, সালেম ডাকিনী বিচারকাণ্ড।

২০) চড়ুই মারার অভিশাপে চীনা দূর্ভিক্ষ

১৯৫৮ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট মাও সেতুং একটি উদ্যো নিয়েছিল। উদ্যোগের নাম ছিল ‘চার আপদ’ (Four Pests)। এ উদ্যোগে তিনি মশা, ইঁদুর (rodents), মাছি (airborne flies) ও চড়ুই (sparrows) নিধন কর্মকাণ্ড শুরু করেন। চড়ুইয়ের মধ্যে বিশেষ করে ইউরেশিয়ান ট্রি স্প্যারো গুলোকে বিশেষ ভাবে হত্যা করা হয়। এর কারণ হলো এরা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ফসল খেয়ে ফেলতো। তখন এক বছরের মধ্যে বিভিন্ন উপায়ে ২২ কোটি চড়ুই মেরে ফেলা হলো।

মাও সেতুংয়ের এই উদ্যোগে একটি ভুল হিসাব ছিলো। সেটা হলো, এই পাখিগুলো ফসল যেমন খেতো, তেমনি বিভিন্ন ফসলের অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড়ও খেয়ে ফেলতো। পাখিগুলো যখন মরে গেল তখন পোকামাকড়ের উপদ্রব চরমে উঠলো। কমে গেল ফসলের উৎপাদন, দেখা দিল দূর্ভিক্ষ। চীনাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দূর্ভিক্ষ, দ্য গ্রেট চাইনিজ ফেমাইন’ (Great Chinese Famine, ১৯৫৯-৬১)।

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ