X

৬৪ জেলার নামকরণের ইতিহাস

ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন বাংলা প্রদেশে সর্বপ্রথম বিভাগ গঠন করা হয়। সে সময় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম এই তিনটি বিভাগ গঠন করা হয়। পরবর্তীতে রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের একাংশ নিয়ে ১৯৬০ সালে খুলনা বিভাগ গঠিত হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে এই চারটি বিভাগ ছিল। পরবর্তী কালে খুলনা বিভাগের একাংশ নিয়ে ১৯৯৩ সালে বরিশাল বিভাগ গঠিত হয় এবং ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম বিভাগকে ভেঙে সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১০ সালে বৃহত্তর রংপুর আর দিনাজপুর অঞ্চল নিয়ে রংপুর বিভাগ গঠন করা হয়, যা আগে রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১৫ সালে অষ্টম বিভাগ হিসেবে ময়মনসিংহ বিভাগ-এর নাম ঘোষণা করা হয়।পূর্বে এটি ঢাকা বিভাগের অংশ ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিভাগের সংখ্যা আট।

(ক) ঢাকা বিভাগ

ঢাকা বিভাগ বাংলাদেশ এর আটটি প্রশাসনিক বিভাগের অন্যতম।এটি  বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত। ১৩-টি জেলা- ঢাকা, ফরিদপুর, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী জেলা, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগ গঠিত।

১. ঢাকাঃ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মোঘল-পূর্ব যুগে কিছু গুরুত্বধারন করলেও শহরটি ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করে মোঘল যুগে। ঢাকা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট করে তেমন কিছু জানা যায় না। এ সম্পর্কে প্রচলিত মতগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপঃ ক) একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর ঢাক গাছ (বুটি ফুডোসা) ছিল; খ) রাজধানী উদ্বোধনের দিনে ইসলাম খানের নির্দেশে এখানে ঢাক অর্থাৎ ড্রাম বাজানো হয়েছিল; গ) ‘ঢাকাভাষা’ নামে একটি প্রাকৃত ভাষা এখানে প্রচলিত ছিল; ঘ) রাজতরঙ্গিণী-তে ঢাক্কা শব্দটি ‘পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে অথবা এলাহাবাদ শিলালিপিতে উল্লেখিত সমুদ্রগুপ্তের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ডবাকই হলো ঢাকা। মোঘল পূর্ব যুগের পুরাতাত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঢাকা শহরে দু’টি এবং মিরপুরে একটি মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রাচীনতমটির নির্মাণ তারিখ ১৪৫৬ খ্রিষ্টাব্দ (জোয়াও দ্য ব্যারোস ঢাকাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে দেখতে পান এবং ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে তার অঙ্কিত মানচিত্রে এর অবস্থান নির্দেশ করেন। আকবর নামা গ্রন্থে ঢাকা একটি থানা (সামরিক ফাঁড়ি) হিসেবে এবং আইন-ই- আকবরী গ্রন্থে সরকার বাজুহার একটি পরগনা হিসেবে ঢাকা বাজু উল্লিখিত হয়েছে। ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম খান চিশতি সুবাহ বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাটের নামানুসারে এর নামকরণ করে জাহাঙ্গীরনগর। প্রশাসনিকভাবে জাহাঙ্গীরনগর নামকরণ হলেও সাধারণ মানুষের মুখে ঢাকা নামটিই থেকে যায়। সকল বিদেশী পর্যটক এবং বিদেশী কোম্পানির কর্মকর্তারাও তাদের বিবরণ এবং চিঠিপত্রে ঢাকা নামটি ব্যবহার করেন।

২. ফরিদপুরঃ ব্রিটিশ শাসন আমলে সৃষ্ট একটি অন্যতম প্রাচীন জেলার নাম ফরিদপুর। অনেক আউলিয়া-দরবেশ, রাজনীতিক, পূণ্যাত্মার আবাসভূমি হিসেবে এ অঞ্চল অত্যন্ত সুপরিচিত। এ জেলার পূর্বনাম ছিল ‘‘ফতেহাবাদ’’। প্রখ্যাত সাধক এবং দরবেশখাজা মাইনউদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর শিষ্য শাহ ফরিদ (রহঃ) এরনামানুসারে এ জেলার নামকরণ করা হয় ফরিদপুর। ফরিদপুর জেলার প্রতিষ্ঠা সন১৭৮৬ হলেও তখন এটির নাম ছিল জালালপুর এবং প্রধান কার্যালয় ছিল ঢাকা। ১৮০৭খ্রিঃ ঢাকা জালালপুর হতে বিভক্ত হয়ে এটি ফরিদপুর জেলা নামে অভিহিত হয় এবংহেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয় ফরিদপুর শহরে।

৩. গাজীপুরঃ মহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকালে জনৈক মুসলিম কুস্তিগির গাজী এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং তিনি বহুদিন সাফল্যের সঙ্গে এ অঞ্চল শাসন করেছিলেন। এ কুস্তিগির/পাহলোয়ান গাজীর নামানুসারেই এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় গাজীপুর বলে লোকশ্রুতি রয়েছে। আরেকটি জনশ্রুতি এ রকম যে, সম্রাট আকবরের সময় চব্বিশ পরগনার জায়গিরদার ছিলেন ঈশা খাঁ। এই ঈশা খাঁরই একজন অনুসারীর ছেলের নাম ছিল ফজল গাজী। যিনি ছিলেন ভাওয়াল রাজ্যের প্রথম ‘প্রধান’। তারই নাম বা নামের সঙ্গে যুক্ত ‘গাজী’ পদবি থেকে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় গাজীপুর। তবে, গাজীপুরের আগের নাম জয়দেবপুর এবং তারও আগের নাম ভাওয়াল। ভাওয়ালের জমিদার ছিলেন জয়দেব নারায়ণ রায় চৌধুরী। বসবাস করার জন্য এ জয়দেব নারায়ণ রায় চৌধুরী পীরাবাড়ি গ্রামে একটি গৃহ নির্মাণ করেছিলেন। গ্রামটি ছিল চিলাই নদীর দক্ষিণ পাড়ে। এ সময় ওই জমিদার নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে এ অঞ্চলটির নাম রাখেন ‘জয়দেবপুর’ এবং এ নামই বহাল ছিল মহকুমা হওয়ার আগ পর্যন্ত। যখন জয়দেবপুরকে মহকুমায় উন্নত করা হয়, তখনই এর নাম পাল্টে জয়দেবপুর রাখা হয়। উল্লেখ্য, এখনো অতীতকাতর-ঐতিহ্যমুখী স্থানীয়দের অনেকেই জেলাকে ‘জয়দেবপুর’ বলেই উল্লেখ করে থাকেন।

৪. গোপালগঞ্জঃ গোপালগঞ্জ জেলা শহরের রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস। অতীতের রাজগঞ্জ বাজার আজকের জেলা শহর গোপালগঞ্জ। আজ থেকে প্রায় শতাব্দীকাল পূর্বে শহর বলতে যা বুঝায় তার কিছুই এখানে ছিলো না। এর পরিচিতি ছিলো শুধু একটি ছোট্ট বাজার হিসেবে। এ অঞ্চলটি মাকিমপুর ষ্টেটের জমিদার রানী রাসমণির এলাকাধীন ছিলো। উল্লেখ্য, রানী রাসমণি একজন জেলের মেয়ে ছিলেন। সিপাই মিউটিনির সময় তিনি একজন উচ্চ পদস্থ ইংরেজ সাহেবের প্রাণ রক্ষা করেন। পরবর্তীতে তারই পুরস্কার হিসাবে বৃটিশ সরকার রাসমণিরকে মাকিমপুর ষ্টেটের জমিদারী প্রদান করেন এবং তাঁকে রানী উপাধিতে ভূষিত করেন। রানী রাসমণির এক নাতির নাম ছিলো নবগোপাল। তিনি তাঁর স্নেহাস্পদ নাতির নাম এবং পুরানো ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নাতিন নামের ‘গোপাল’ অংশটি প্রথমে রেখে তার সাথে রাজগঞ্জের ‘গঞ্জ’ যোগ করে এ জায়গাটির নতুন নামকরণ করেন গোপালগঞ্জ।

৫. কিশোরগঞ্জঃ বর্তমান কিশোরগঞ্জ তৎকালীন জোয়ার হোসেনপুর পরগনার অন্তর্ভক্ত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকেও কিশোরগঞ্জ এলাকা ‘কাটখালী’ নামে পরিচিত ছিল। ইতিহাসবিদদের ধারণা ও জনশ্রুতি মতে এ জেলার জমিদার ব্রজকিশোর মতান্তরে নন্দকিশোর প্রামানিকের ‘কিশোর’ এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত হাট বা গঞ্জের ‘গঞ্জ’ যোগ করে কিশোরগঞ্জ নামকরণ করা হয়।

৬. মাদারীপুরঃ প্রাচীনকালে মাদারীপুরের পূর্বাংশ ইদিলপুর এবং পশ্চিম অংশ কোটালীপাড়া নামে পরিচিত ছিল। ইদিলপুর চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের একটি উন্নত জনপদ ছিল। তখন এ অঞ্চলের প্রশাসনিক নাম ছিল নাব্যমন্ডল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে সাধক হযরত বদরুদ্দিন শাহ মাদার (র) এর নামানুসারে ইদিলপুর বদলে মাদারীপুর হয়।

৭. মানিকগঞ্জঃ মানিকগঞ্জের নামের ঋৎপত্তি ইতিহাস আজও রহস্যবৃত। অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে সুফি দরবেশ মানিক শাহ সিংগাইর উপজেলার মানিকনগরে আসেন এবং খানকা প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। আবার কারও মতে দূর্ধর্ষ পাঠান সর্দার মানিক ঢালীর নামানুসারে মানিকগঞ্জ নামের উৎপত্তি। কেউ মনে করেন, নবাব সিরাজ উদ-দৌলার বিশ্বাসঘাতক মানিক চাঁদের নামানুসারে মানিকগঞ্জ নামকরণ হয়। মানিকগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কীত উপরোক্ত তিনটি পৃথক স্থানীয় জনশ্রুতি এবং অনুমান নির্ভর।

৮. মুন্সীগঞ্জঃ মুন্সিগঞ্জে প্রাচীন নাম ছিল ইদ্রাকপুর। মোঘল শাসনামলে এই ইদ্রাকপুর গ্রামে মুন্সী হায়দার হোসেন নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মোঘল শাসক দ্বারা ফৌজদার নিযুক্ত ছিলেন। অত্যন্ত সজ্জন ও জনহিতৈষী মুন্সী হায়দার হোসেনের নামে ইদ্রাকপুরের নাম হয় মুন্সীগঞ্জ। কারো কারো মতে জমিদার এনায়েত আলী মুন্সীর নামানুসারে মুন্সীগঞ্জে নামকরণ করা হয়।

৯. নারায়ণগঞ্জঃ ১৭৬৬ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা বিকন লাল পান্ডে(বেণু ঠাকুর বা লক্ষীনায়ায়ণ ঠাকুর) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট থেকে এ অঞ্চলের মালিকানা গ্রহণ করে। তিনি প্রভু নারায়ণের সেবার ব্যয়ভার বহনের জন্য একটি উইলের মাধ্যমে শীতলক্ষা নদীর তীরে অবস্থিত মার্কেটকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। তাই পরবর্তীকালে এ স্থানের নাম হয় নারায়ণগঞ্জ।

১০. নরসিংদী জেলাঃ কথিত আছে, প্রাচীনকালে এ অঞ্চলটি নরসিংহ নামক একজন রাজার শাসনাধীন ছিল। আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজা নরসিংহ প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে নরসিংহপুর নামে একটি ছোট নগর স্থাপন করেছিলেন। তাঁরই নামানুসারে নরসিংদী নামটি আবির্ভূত হয়। নরসিংহ নামের সাথে ‘দী’ যুক্ত হয়ে নরসিংদী হয়েছে। ‘নরসিংহদী’ শব্দের পরিবর্তিত রূপই “নরসিংদী”।

১১. রাজবাড়ীঃ রাজা সূর্য্য কুমারের নামানুসারে রাজবাড়ীর নামকরণ করা হয়। রাজা সূর্য্য কুমারের পিতামহ প্রভুরাম নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার রাজকর্মী থাকাকালীন সময়ে কোন এক কারণে ইংরেজদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। পলাশীর যুদ্ধের পর বর্তমান নাটরের লক্ষীকোলে এস আত্মগোপন করেন। পরে তাঁর পুত্র দ্বিগেন্দ্র প্রসাদ রাজবাড়ী অঞ্চলে জমিদারী গড়ে তোলেন। দ্বিগেন্দ্র প্রসাদের পুত্র সূর্য্য কুমার ১৮৮৫ সালে জনহিতকর কাজের জন্য রাজা উপাধি প্রাপ্ত হন।

১২. শরীয়তপুরঃ বৃটিশ বিরোধী ফরায়েজী আন্দোলনের অন্যতম নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহর নামানুসারে শরীয়তপুরের নামকরণ করা হয়।

১৩. টাঙ্গাইলঃ টাঙ্গাইলের নামকরণ বিষয়ে রয়েছে বহু জনশ্রুতি ও নানা মতামত আছে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রেনেল তাঁর মানচিত্রে এ সম্পূর্ণ অঞ্চলকেই ‘আটিয়া’ বলে দেখিয়েছেন। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের আগে টাঙ্গাইল নামে কোনো স্বতন্ত্র স্থানের পরিচয় পাওয়া যায় না। ১৫ নভেম্বর ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে আটিয়া মহকুমার সদর দপ্তর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে স্থানান্তরের সময় থেকে টাঙ্গাইল নামটি পরিচিতি লাভ করে।

টাঙ্গাইলের ইতিহাস প্রণেতা খন্দকার আব্দুর রহিম সাহেবের মতে, ইংরেজ আমলে এদেশের লোকেরা ‘উচু’ শব্দের পরিবর্তে ‘টান’ শব্দই ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিল বেশি। এখনো টাঙ্গাইল অঞ্চলে ‘টান’ শব্দের প্রচলন আছে। এই টানের সাথে ‘আইল’ শব্দটি যুক্ত হয়ে হয়েছিল ‘টান আইল’। আর সেই ‘টান আইল’টি রূপান্তরিত হয়েছে টাঙ্গাইলে।

কারো কারো মতে, বৃটিশ শাসনামলে মোগল প্রশাসন কেন্দ্র আটিয়া অঞ্চল জমজমাট হয়ে উঠে। সে সময়ে ঘোড়ার গাড়ি ছিল যাতায়াতের একমাত্র বাহন। একে টাঙ্গাইলের স্থানীয় লোকেরা বলত ‘টাঙ্গা’।‘আল’ শব্দটি সীমা নির্দেশক, যার স্থানীয় উচ্চারণ আইল। একটি স্থানকে যে সীমানা দিয়ে বাঁধা হয় তাকেই ‘আইল’ বলা হয়। তাই টাঙ্গাওয়ালাদের বাসস্থানের সীমানাকে বোঝাতে ‘টাঙ্গাইল’ নামকরণ করা হয়েছে।

কেউ কেউ মনে করেন, ভূ-প্রকৃতি অনুসারে টাঙ্গাইল এলাকা উঁচু ও ঢালু। স্থানীয়ভাবে যার সমার্থক শব্দ হলো ‘টান’। তাই এই ভূমিরূপের কারণেই এ অঞ্চলকে হয়তো পূর্বে ‘টান আইল’ বলা হতো। যা পরিবর্তীত হয়ে টাঙ্গাইল হয়েছে।

খ) বরিশাল বিভাগ

বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। বরিশাল, বরগুনা, ঝালকাঠী, পটুয়াখালি, পিরোজপুর ও ভোলা এই ৬ জেলা নিয়ে বরিশাল বিভাগ গঠিত হয়।

১. বরিশালঃ বরিশাল নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। পূর্বে এখানে খুব বড় বড় শাল গাছ জন্মাতো, আর এই বড় শাল গাছের কারণে (বড়+শাল) বরিশাল নামের উৎপত্তি। কেউ কেউ দাবি করেন, পর্তুগীজ বেরি ও শেলির প্রেমকাহিনীর জন্য বরিশাল নামকরণ করা হয়েছে। কারো মতে, গিরদে বন্দরে (গ্রেট বন্দর) ঢাকা নবাবদের বড় বড় লবণের গোলা ও চৌকি ছিল। ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকরা বড় বড় লবণের চৌকিকে ‘বরিসল্ট’ (বরি>বড় + সল্ট>লবণ) বলতো। আবার অনেকের ধারণা, এখানকার লবণের দানাগুলো বড় বড় ছিল বলে ‘বরিসল্ট’ বলা হতো । ‘বরিসল্ট’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ‘বরিশাল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

২. বরগুনাঃ বরগুনা নামের উৎপত্তি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া না। মনে করা হয়, উত্তরাঞ্চলের কাঠ ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলে কাঠ নিতে এসে খরস্রোতা খাকদোন নদী অতিক্রম করতে গিয়ে অনুকুল প্রবাহ বা বড় গোনের জন্য এখানে অপেক্ষা করত বলে এ স্থানের নাম হয় বড় গোনা। কারো মতে, স্রোতের বিপরীতে গুন (দড়ি) টেনে নৌকা অতিক্রম করতে হতো বলে এ স্থানের নাম বরগুনা। কেউ কেউ বলেন, বরগুনা নামক কোন প্রভাবশালী রাখাইন অধিবাসীর নামানুসারে বরগুনা হয়েছে। আবার কারো মতে, বরগুনা নামক কোন এক বাওয়ালীর নামানুসারে এ স্থানের নামকরণ বরগুনা করা হয়।

৩. ভোলাঃ ভোলা জেলার নামকরণের পিছনে স্থায়ীভাবে একটি লোককাহিনী প্রচলিত আছে। ভোলা শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বেতুয়া নামক খালটি এক সময় পরিচিত ছিল বেতুয়া নদী নামে। খেয়া নৌকার সাহায্যে নদীতে পারাপার করা হত। বুড়ো এক মাঝি এখানে খেয়া নৌকার সাহায্যে লোকজন পারাপার করতো। তাঁর নাম ছিল ভোলা গাজী পাটনী। বর্তমানে যোগীরঘোলের কাছেই তাঁর আস্তানা ছিল। এই ভোলা গাজীর নামানুসারেই এক সময় স্থানটির নাম দেয়া হয় ভোলা। সেই থেকে আজ অব্দী ভোলা নামে পরিচিত।

৪. ঝালকাঠিঃ এজেলার নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ জেলার জেলে সম্প্রদায়ের ইতিহাস। মধ্যযুগ পরবর্তী সময়ে সন্ধ্যা, সুগন্ধা, ধানসিঁড়ি আর বিষখালী নদীর তীরবর্তী এলাকায় জেলেরা বসতি স্থাপন করে। এর প্রাচীন নাম ছিল ‘মহারাজগঞ্জ’। মহারাজগঞ্জের ভূ-স্বামী শ্রী কৈলাশ চন্দ্র এখানে জমিদারি বৈঠক করতেন। পরবর্তীতে তিনি এ স্থানটিতে এক গঞ্জ বা বাজার নির্মাণ করেন। এ গঞ্জে জেলেরা জালের কাঠি বিক্রি করত। এ জালের কাঠি থেকে পর্যায়ক্রমে ঝালকাঠি নামকরণ করা হয় বলে ধারণা করা হয়। জানা যায়, বিভিন্ন স্থান থেকে জেলেরা এখানে মাছ শিকারের জন্য আসত এবং যাযাবরের মতো সুগন্ধা নদীর তীরে বাস করত। এ অঞ্চলের জেলেদের পেশাগত পরিচিতিকে বলা হতো ‘ঝালো’। এরপর জেলেরা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে এখানে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। এভাবেই জেলে থেকে ঝালো এবং জঙ্গল কেটে বসতি গড়ে তোলার কারণে কাটি শব্দের প্রচলন হয়ে ঝালকাটি শব্দের উৎপত্তি হয়। পরবর্তীকালে ঝালকাটি রূপান্তরিত হয় ঝালকাঠিতে।

৫. পটুয়াখালীঃ ঐতিহাসিক ঘটনাবলি থেকে জানা যায যে, পটুয়াখালী চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। পটুয়াখালী নামকরণের পিছনে প্রায় সাড়ে তিনশত বছরের লুণ্ঠন, অত্যাচারের ইতিহাস জড়িত আছে বলে জানা যায়। পটুয়াখালী শহরের উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত নদীটি পূর্বে ভরনী খাল নামে পরিচিত ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে পর্তুগীজ জলদস্যুরা এই খালের পথ দিয়ে এসে সন্নিহিত এলাকায় নির্বিচারে অত্যাচার, হত্যা, লুণ্ঠন চালাত। স্থানীয় লোকেরা এই হানাদারদের ‘নটুয়া’ বলত এবং তখন থেকে খালটি নটুয়ার খাল নামে ডাকা হয়। এই “নটুয়ার খাল” খাল থেকে পরবর্তীতে এ এলাকার নামকরণ হয় পটুয়াখালী।

৬. পিরোজপুরঃ “ফিরোজ শাহের আমল থেকে ভাটির দেশের ফিরোজপুর,
বেনিয়া চক্রের ছোয়াচ লেগে পাল্টে হলো পিরোজপুর”- উপরোক্ত কথন থেকে পিরোজপুর নামকরণের একটা সূত্র পাওয়া যায়। নাজিরপুর উপজেলার শাখারী কাঠির জনৈক হেলাল উদ্দীন মোঘল নিজেকে মোঘল বংশের শেষ বংশধর হিসেবে দাবি করেছিলেন। বাংলার সুবেদার শাহ সুজা আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার নিকট পরাজিত হয়ে বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলে এসে আত্মগোপন করেন। এক পর্যায়ে নলছিটি উপজেলার সুগন্ধা নদীর পাড়ে একটি কেল্লা তৈরি করে তিনি কিছুকাল অবস্থান করেন। মীর জুমলার বাহিনী এখানেও হানা দেয়। শাহ সুজা তাঁর দুই কন্যাসহ আরাকান রাজ্যে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি অপর এক রাজার চক্রান্তে নিহত হন। পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর স্ত্রী ও এক শিশুপুত্র রেখে যান। পরবর্তীতে তারা অবস্থান পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে পশ্চিমে চলে আসে এবং বর্তমান পিরোজপুরের পাশ্ববর্তী দামোদর নদীর মুখে আস্তানা তৈরি করেন। এ শিশুর নাম ছিল ফিরোজ এবং তাঁর নামানুসারে হয় ফিরোজপুর। কালের বিবর্তনে ফিরোজপুরের নাম হয় ‘পিরোজপুর’।

গ) চট্টগ্রাম বিভাগ

চট্টগ্রাম, বান্দরবন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনী,  খাগড়াছড়ি, লক্ষীপুর, নোয়াখালী ও রাঙ্গামাটি- এই ১১-টি জেলা নিয়ে চট্রগ্রাম বিভাগ গঠিত।

১. চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রামের প্রায় ৪৮-টি নামের খোঁজ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রম্যভূমি, চাটিগাঁ, চাতগাও, রোসাং, চিতাগঞ্জ, জাটিগ্রাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। পন্ডিত বার্নোলির মতে, আরবি ‘শ্যাত’ (অর্থ বদ্বীপ)ও ‘গাঙ্গ’ (অর্থ ‘গঙ্গা নদী’) থেকে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। অপর এক মতে, ত্রয়োদশ শতকে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন বার জন আউলিয়া। তাঁরা একটি বড় বাতি বা চেরাগ জ্বালিয়ে উঁচু জায়গায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘চাটি’ অর্থ বাতি বা চেরাগ এবং গাঁও অর্থ গ্রাম। এ থেকে নাম হয় “চাটিগাঁও”। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম মোঘল সম্রাজের অংশ হয়। আরাকানদের পরাজিত করে মোঘলরা এর নাম রাখেন ইসলামাবাদ। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর কাশিম আলী খান ইসলামাবাদকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করেন। পরে কোম্পানি এর নাম রাখেন চিটাগাং।

২. বান্দরবনঃ বান্দরবন জেলার নামকরণ নিয়ে একটি কিংবদন্তি আছে। এলাকার বাসিন্দাদের মুখে প্রচলিত রূপকথায় অত্র এলাকায় এ সময় অসংখ্য বানর বাস করত। আর এই বানরগুলো শহরের প্রবেশ মুখে ছড়ার পাড়ে প্রতিনিয়ত লবণ খেতে আসত। এক সময় অতি বৃষ্টির কারণে ছড়ার পানি বৃদ্ধি পেলে বানরের দল ছড়া পাড় থেকে পাহাড়ে যেতে না পারায় একে অপরকে ধরে সারিবদ্ধভাবে ছড়া পার হয়। বানরের ছড়া পারাপারের এই দৃশ্য দেখতে পায় এই জনপদের মানুষ। এই সময় থেকে জায়গাটি “ম্যাঅকছি ছড়া” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মার্মা ভাষায় ‘ম্যাঅক’ শব্দটির অর্থ হল বানর আর ‘ছি’ শব্দটির অর্থ হল বাধঁ। কালের প্রবাহে বাংলা ভাষাভাষির সাধারণ উচ্চারণে এই এলাকার নাম বান্দরবন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তবে মার্মা ভাষায় বান্দরবনের প্রকৃত নাম “রদ ক্যওচি চিম্রো’।

. ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নামকরণ নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। এস এম শাহনূর প্রণীত “নামকরণের ইতিকথা” থেকে জানা যায়, সেন বংশের রাজত্বকালে এই অঞ্চলে অভিজাত ব্রাহ্মণকুলের বড়ই অভাব ছিল। যার ফলে এ অঞ্চলে পূজা অর্চনার জন্য বিঘ্নতার সৃষ্টি হত। এ সমস্যা নিরসনের জন্য সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষণ সেন আদিসুর কন্যকুঞ্জ থেকে কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারকে এ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে কিছু ব্রাহ্মণ পরিবার শহরের মৌলভী পাড়ায় বাড়ী তৈরি করে। সেই ব্রাহ্মণদের বাড়ির অবস্থানের কারণে এ জেলার নামকরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। অন্য একটি মতানুসারে দিল্লী থেকে আগত ইসলাম ধর্ম প্রচারক শাহ সুফী হযরত কাজী মাহমুদ শাহ এ শহর থেকে উল্লেখিত ব্রাহ্মণ পরিবার সমূহকে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ প্রদান করেন, যা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক উচ্চারণ ‘বাউনবাইরা’।এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিকৃত নাম ‘বি-বাড়িয়া’ বহুল প্রচলিত। যার ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ অবস্থার উত্তরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন হতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন হতে সকল ক্ষেত্রে বি-বাড়িয়ার পরিবর্তে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ লেখার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

৪. চাঁদপুরঃ ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজ জরিপকারী মেজর জেমস রেনেল তৎকালীন বাংলার যে মানচিত্র অংকন করেছিলেন তাতে চাঁদপুর নামে এক জনপদ ছিল। তখন চাঁদপুরের দক্ষিণে নরসিংহপুর (বর্তমানে যা নদীগর্ভে বিলীন) নামক স্থানে চাঁদপুরের অফিস-আদালত ছিল। পদ্মা ও মেঘনার সঙ্গমস্থল ছিল বর্তমান স্থান থেকে প্রায় ৬০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। মেঘনা নদীর ভাঙ্গাগড়ার খেলায় এ এলাকা বর্তমানে বিলীন। বার ভূঁইয়াদের আমলে চাঁদপুর অঞ্চল বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদরায়ের দখলে ছিল। ঐতিহাসিক জে.এম সেনগুপ্তের মতে, চাঁদরায়ের নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম চাঁদপুর। কথিত আছে, চাঁদপুরের পুরিন্দপুর মহল্লার চাঁদ ফকিরের নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম চাঁদপুর। কারো কারো মতে, শাহ আহমেদ চাঁদ নামে একজন প্রশাসক দিল্লী থেকে পঞ্চদশ শতকে এখানে এসে একটি নদী বন্দর স্থাপন করেছিলেন। তাঁর নামানুসারে চাঁদপুর।

৫. কুমিল্লাঃ প্রাচীনকালে এটি সমতট জনপদের অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীতে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ হয়। কুমিল্লা নামকরণের অনেকগুলো প্রচলিত লোককথা আছে। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য চৈনিক পরিব্রাজক ওয়াং চোয়াং কর্তৃক সমতট রাজ্য পরিভ্রমণের বৃত্তান্ত। তাঁর বর্ণনায় ‘কিয়ামলঙ্কিয়া’ ( Kiamolonkia) নামক স্থানের বর্ণনা রয়েছে। এ থেকে কমলাঙ্ক বা কুমিল্লা নামকরণ হয়েছে।

৬. কক্সবাজারঃ আরব ব্যবসয়ী ও ধর্ম প্রচারকগণ ৮ম শতকে চট্টগ্রাম ও আকিব বন্দরে আগমন করেন। এই দুই বন্দরের মধ্যবর্তী হওয়ায় কক্সবাজার এলাকা আরবদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসে। নবম শতাব্দীতে কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম হরিকেলের রাজা কান্তিদেব দ্বারা শাসিত হয়। ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজা সুলাত ইঙ্গ চট্টগ্রাম দখল করে নেবার পর থেকে কক্সবাজার আরাকান রাজ্যের অংশ হয়। ১৭৮৪ সালে বার্মারাজ বোধাপায়া আরাকান দখল করে নেয়। ১৭৯৯ সালে বার্মারাজের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রায় ১৩ হাজার আরাকানি কক্সবাজার থেকে পালিয়ে যায়। এদের পূনর্বাসন করার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হিরাম কক্স নামে একজনকে নিয়োগ করে। পূনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ হবার পূর্বেই হিরাম কক্স মৃত্যুবরণ করেন। পূনর্বাসন প্রক্রিয়ায় তাঁর অবদানের জন্য কক্স-এর বাজার নামক একটি বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই কক্স-এর বাজার থেকে কক্সবাজার নামের উৎপত্তি।

৭. ফেনীঃ ফেনী নদীর নাম অনুসারে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় ফেনী। ষোড়শ শতাব্দীতে কবি কবীন্দ্র পরমেশ্বর পরাগলপুরের বর্ণনায় লিখেছেন, ‘ফনী নদীতে বেষ্টিত চারিধার, পূর্বে মহাগিরি পার পাই তার’। সতের শতকে মির্জা নাথানের ফার্সী ভাষায় রচিত ‘বাহরিস্থান-ই-গায়েরীতে’ ফনী শব্দ ফেনীতে পরিণত হয়। মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের ভাষায় ‘ফনী’ শব্দ ফেনীতে পরিণত হয়েছে।

৮. খাগড়াছড়িঃ খাগড়াছড়ি একটি নদীর নাম। নদীর পাড়ে খাগড়া বন থাকায় খাগড়াছড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে।

৯. লক্ষীপুরঃ লক্ষ্মীপুর জেলার নামকরণ নিয়ে কয়েকটি মত প্রচলিত রয়েছে। লক্ষ্মী, হিন্দু ধর্মানুসারে ধন-সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী (দুর্গা কন্যা ও বিষ্ণু পত্নী) এবং পুর হল শহর বা নগর। এ হিসাবে লক্ষ্মীপুর এর সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় সম্পদ সমৃদ্ধ শহর বা সৌভাগ্যের নগরী। ঐতিহাসিক কৈলাশ চন্দ্র সিংহ রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস লিখতে গিয়ে তৎকালীন নোয়াখালীর পরগণা ও মহালগুলোর নাম উল্লেখ করেছেন। এতে দেখা যায়, বাঞ্চানগর ও সমসেরাবাদ মৌজার পশ্চিমে লক্ষ্মীপুর নামে একটি মৌজা ছিল। আজকের পশ্চিম লক্ষ্মীপুর মৌজাই তৎকালীন লক্ষ্মীপুর মৌজা।

আবার অন্যমতে, সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা আরাকান পলায়নের সময় ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মে ঢাকা ত্যাগ করেন। তিনি ধাপা ও শ্রীপুর হয়ে ৯ মে লক্ষ্মীদাহ পরগনা ত্যাগ করে ভুলুয়া দুর্গের ৮ মাইলের মধ্যে আসেন। ১২ মে ভুলুয়া দুর্গ জয় করতে না পেরে আরাকান চলে যান। সেই লক্ষ্মীদাহ পরগনা থেকে লক্ষ্মীপুর নামকরণ করা হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

শ্রী সুরেশ চন্দ্রনাথ মুজমদার রাজপুরুষ যোগীবংশ নামক গবেষণামূলক গ্রন্থে লিখেছেন দালাল বাজারের জমিদার রাজা গৌর কিশোর রায় চৌধুরী ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী থেকে রাজা উপাধি পেয়েছেন। তার পূর্বপুরুষরা ১৬২৯ থেকে ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে দালাল বাজার আসেন। তার বংশের প্রথম পুরুষের নাম লক্ষ্মী নারায়ণ রায় (বৈষ্ণব) এবং রাজা গৌর কিশোরের স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী প্রিয়া। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, লক্ষ্মী নারায়ণ রায় বা লক্ষ্মী প্রিয়ার নাম অনুসারে লক্ষ্মীপুরের নামকরণ করা হয়।

১০. নোয়াখালীঃ নোয়াখালী জেলা প্রচীন নাম ছিল ভুলুয়া। নোয়াখালী সদর থানার আদি নাম ছিল সুধারাম। ইতিহাসবিদদের মতে, একবার ত্রিপুরার পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে ভুলুয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয়ে ফসলি জমির ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি করে।এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করে পানি প্রবাহকে ডাকাতিয়া নদী হতে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ী ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে প্রবাহিত করা হয়। এই বিশাল খালকে নোয়াখালীর ভাষায় ‘নোয়া (নতুন) খাল’ বলা হত। এর ফলে ‘ভুলুয়া’ নামটি পরিবর্তিত নোয়াখালী নামে পরিচিতি লাভ করে।

১১. রাঙ্গামাটিঃ রাঙামাটি জেলা নামকরণ সম্পর্কে বিলু কবীরের লেখা ‘বাংলাদেশ জেলা: নামকরণের ইতিহাস’ বই থেকে যা জানা যায় তা হলো, এই এলাকায় পর্বতরাজি গঠিত হয়েছিল টারশিয়ারি যুগে। এই যুগের মাটির প্রধান ব্যতিক্রম এবং বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর রঙ লালচে বা রাঙা। এই এলাকার গিরিমৃত্তিকা লাল এবং মাটিও রাঙা বলেই এই জনপদের নাম হয়েছে রাঙামাটি। প্রকৃতি সূচক এই নামকরণটির বিষয়ে অন্য প্রচলিত কথাপরম্পরা হলো- বর্তমান রাঙামাটি জেলা সদরের পূর্বদিকে একটি ছড়া ছিল, যা এখন হ্রদের মধ্যে নিমজ্জিত। এই হ্রদের স্বচ্ছ পানি যখন লাল বা রাঙামাটির উপর দিয়ে ঢাল বেয়ে প্রপাত ঘটাতো, তখন তাকে লাল দেখাতো। তাই এই ছড়ার নাম হয়েছিল ‘রাঙামাটি’। এই জেলা সদরের পশ্চিমে আরও একটি ছড়া ছিল। অনুরূপ কারণে তারও নাম দেয়া হয়েছিল ‘রাঙাপানি’। এই দুই রাঙা ছড়ার মোহনার বাঁকেই গড়ে উঠেছে বর্তমান জেলা শহর। যা মূলত ছিল অনাবাদী টিলার সমষ্টি এবং বহু উপত্যকার এক নয়নাভিরাম বিস্ময়ভূমি। এই দুটি ছড়া রাঙামাটি ও রাঙাপানি হতে ‘রাঙামাটি’ জেলার নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

ঘ) খুলনা বিভাগ

খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, নড়াইল, সাতক্ষীরা- এই মোট ১০-টি জেলা নিয়ে খুলনা বিভাগ গঠিত।

১. খুলনাঃ হযরত পীর খানজাহান আলীর (র.) স্মৃতি বিজড়িত ও ভৈরব-রূপসা বিধৌত পৌর শহর খুলনার ইতিহাস নানাভাবে ঐতিহ্য মন্ডিত। খুলনা নামকরণের উৎপত্তি সম্বন্ধে নানান মত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচিত মতগুলো হলো- ধনপতি সাওদাগরের দ্বিতীয় স্ত্রী খুল্লনার নামে নির্মিত ‘খুল্লনেশ্বরী কালী মন্দির’ থেকে খুলনা; ১৭৬৬ সালে ‘ফলমাউথ’ জাহাজের নাবিকদের উদ্ধারকৃত রেকর্ডে লিখিত Culnea শব্দ থেকে খুলনা; বা ইংরেজ আমলের মানচিত্রে লিখিত Jessore-Culna শব্দ থেকে খুলনা শব্দটি এসেছে।

২. চুয়াডাঙ্গাঃ চুয়াডাঙ্গার নামকরণ সম্পর্কে কথিত আছে, এখানকার মল্লিক বংশের আদিপুরুষ চুঙ্গো মল্লিকের নামে এ জায়গার নাম চুয়াডাঙ্গা হয়েছে। ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চুঙ্গো মল্লিক তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ভারত হতে মাথাভাঙ্গা নদীপথে এখানে এসে বসতি গড়েন। ১৭৯৭ সালের এক রেকর্ডে এ জায়গার নাম চুঙ্গোডাঙ্গা উল্লেখ রয়েছে। ফারসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার সময় উচ্চারণের বিকৃতির কারণে চুঙ্গোডাঙ্গা থেকে চুয়াডাঙ্গা নামটা এসেছে।

৩. যশোরঃ ১৭৮১ সালে যশোর একটি পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জেলা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্বাধীন হওয়া জেলাও যশোর। যশোর সমতটের একটা প্রাচীন জনপদ। নামটি অতি পুরানো। যশোর নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। যশোর (জেসিনরে) আরবি শব্দ। যার অর্থ সাকো। এককালে যশোরের সর্বত্র নদী নালায় পরিপূর্ণ ছিল। পূর্বে নদী বা খালের উপর সাকো নির্মিত হতো। খানজাহান আলী বাঁশের সাকো নির্মাণ করে ভৈরব নদী পার হয়ে যশোরের মুড়লীতে আগমন করেন বলে জানা যায়। এই বাঁশের সাকো (জেসিনরে) থেকে যশোর নামের উৎপত্তি। তবে এই মতে সমর্থকদের সংখ্যা খুবই কম। অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, প্রতাপদিত্যের পতনের পর চাঁচড়ার রাজাদের যশোরের রাজা বলা হত। কেননা তারা যশোর রাজ প্রতাপাদিত্যের সম্পত্তির একাংশ পুরস্কার স্বরূপ অর্জন করেছিলেন। এভাবেও মশোর নামটি আসতে পারে।

৪. ঝিনাইদহঃ প্রাচীনকালে ঝিনাইদহের উত্তর-পশ্চিম দিকে নবগঙ্গা নদীর ধারে ঝিনুক কুড়ানো শ্রমিকের বসতি গড়ে ওঠে বলে জানা যায়। কলকাতা থেকে ব্যবসায়ীরা মুক্তা সংগ্রহের জন্য এখানে ঝিনুক কিনতে আসতো। সে সময় ঝিনুক প্রাপ্তির স্থানটিকে ঝিনুকদহ বলা হত। অনেকের মতে ঝিনুককে আঞ্চলিক ভাষায় ঝিনেই বা ঝিনাই বলে। দহ অর্থ বড় জলাশয়, গ্রাম। এ অর্থে ঝিনুক দহ বলতে ঝিনুকের জলাশয় অথবা ঝিনুকের গ্রাম। ঝিনুক ও দহ থেকেই ঝিনুকদহ বা ঝিনেইদহ নাম হয়েছে, যা রূপান্তরিত হয়ে আজকের এই ঝিনাইদহ।

৫. বাগেরহাটঃ এক সময় বাগেরহাটের নাম ছিল খলিফাতাবাদ বা প্রতিনিধির শহর। খানজাহান আলী (রঃ) গৌড়ের সুলতানদের প্রতিনিধি হিসেবে এ অঞ্চল শাসন করতেন। কেউ কেউ মনে করেন, বরিশালের শাসক আঘা বাকের এর নামানুসারে বাগেরহাট হয়েছে। কেউ বলেন, পাঠান জায়গীদার বাকির খাঁ এর নামানুসারে বাগেরহাট হয়েছে। আবার কারো মতে, বাঘ শব্দ হতে বাগেরহাট নাম হয়েছে। জনশ্রুতি আছে খানজাহান আলী (রঃ) এর একটি বাগ(বাগান) বা বাগিচা ছিল। এ বাগ শব্দ হতে বাগেরহাট। অনেকে মনে করে, নদীর বাঁকে হাট বসতো বিধায় বাঁকেরহাট; বাঁকেরহাট হতে বাগেরহাট।

৬. কুষ্টিয়াঃ কুষ্টিয়া জেলার নামকরণ নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। কুষ্টিয়ায় এক সময় কোস্টার(পাট) চাষ হত। স্থানীয় জনগণ একে কুষ্টি বলে ডাকত। এ কোস্ট শব্দ থেকে কুষ্টিয়ার উৎপত্তি।

৭. মাগুরাঃ কখন থেকে মাগুরা নাম এসেছে তার সঠিক হিসেব মিলানো কষ্টকর। মাগুরা প্রাচীন আমলের একটি গ্রামের নাম। সে সময়ে মাগুরা দু’টি অংশে বিভক্ত ছিল- মহকুমা সদরের পূর্বে মাগুরা ও পশ্চিমে ছিল দরি মাগুরা। দরি শব্দের অর্থ মাদুর বা সতরঞ্জি। দরি মাগুরায় মাদুর তৈরি সম্প্রদায়ের লোক বাস করতো বলে নাম হয়েছিল দরি মাগুরা। ধর্মদাস নামে জনৈক মগ আরাকান খেকে এসে আগুরা শহরের পূর্ব কোণের সোজাসুজি গড়াই নদীর তীরে খুলুমবাড়ি মৌজা অঞ্চল দখল করে। লোকে তাকে মগ জায়গীর বলে আখ্যায়িত করেছিল। অনেকের মতে মগরা থেকে মাগুরা নামের উৎপত্তি। লোক মুখে শোনা যায়, এককালে মাগুরা এলাকায় বড় বিল ছিল। সেই বিলে পাওয়া যেতো প্রচুর মাগুর মাছ। এই মাগুর মাছের নাম থেকেও মাগুরা নামের উৎপত্তি হতে পারে।

৮. মেহেরপুরঃ মেহেরপুর নামকরণ সম্পর্কে এ পর্যন্ত দুটি অনুমান ভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমটি, ইসলাম প্রচারক দরবেশ মেহের আলী নামীয় জনৈক ব্যক্তির নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেহেরপুর রাখা হয়। দ্বিতীয়টি, বচনকার মিহির ও তাঁর পুত্রবধু খনা এই শহরে বাস করতেন বলে প্রচলিত আছে। মিহিরের নাম থেকে মিহিরপুর এবং পরবর্তীতে তা মেহেরপুর হয়।

৯. নড়াইলঃ নড়াইল নামকরণ নিয়ে ঐতিহাসিকবিদরা ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। কিংবদন্তী আছে, নড়িয়াল ফকিরের আশীর্বাদপুষ্ট নড়ি থেকে নড়িয়াল নামের উৎপত্তি। নড়িয়াল ফকিরের আশীর্বাদপুষ্ট তাই নাম হয় নড়িয়াল। পরবর্তীতে লোকমুখে বিকৃত হয়ে নড়িয়াল থেকে নড়াইল।

১০. সাতক্ষীরাঃ সাতক্ষীরা জেলার আদি নাম ছিল সাতঘরিয়া। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কর্মচারী হিসেবে ১৭৭২ সালে নিলামে এই পরগনা কিনে গ্রাম স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র প্রাণনাথ চক্রবর্তী সাতঘর কুলীন ব্রাক্ষ্মণ এনে এই পরগনায় প্রতিষ্ঠিত করেন তা থেকে সাতঘরিয়া নাম হয়।

ঙ) রাজশাহী বিভাগ

রাজশাহী বিভাগ গঠিত হয়েছে ৮-টি জেলা নিয়ে। এগুলো হলো- রাজশাহী, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, চাপাইনবাবগঞ্জ,পাবনা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ।

১. রাজশাহীঃ রাজশাহী নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলেই কয়েক শতাব্দী পূর্বে ফিরে যেতে হয়। এ শহরের প্রাচীন নামটি ছিল মহাকাল গড়।পরে রূপান্তরিত হয়ে দাঁড়ায় রামপুর-বোয়ালিয়ায়। রামপুর-বোয়ালিয়া থেকে রাজশাহী নামটির উদ্ভব কিভাবে হলো এর সুস্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা নাই । ব্রিটিশ আমলের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসে ও রাজশাহী নামক কোন জনপদ বা স্থানের উল্লেখ নাই । অনেকে মনে করেন, এই জনপদ একদা বহু হিন্দু, মুসলিম, রাজা, সুলতান আর জমিদার শাসিত ছিল বলে নামকরণ হয়েছে রাজশাহী।


ঐতিহাসিক ব্লকম্যানের (Bolch Mann) মতে, খ্রিষ্টীয় ১৫শ শতকে গৌড়ের মুসলিম সালতানাত এই জেলার ভাতুড়িয়ার জমিদার রাজা গণেশ কতৃর্ক আত্মসাতের সময় থেকে রাজশাহী নামের উদ্ভব হয়েছে। হিন্দু রাজ আর ফারসী শাহী এই শব্দ দুটির সমন্বয়ে উদ্ভব হয়েছে মিশ্রজাত শব্দটির। কিন্তু ব্লকম্যানের অভিমত গ্রহণে আপত্তি করে বেভারিজ (Beveridge) বলেন, নাম হিসেবে রাজশাহী অপেক্ষা অর্বাচীন এবং এর অবস্থান ছিল রাজা গণেষের জমিদারী ভাতুড়িয়া পরগনা থেকে অনেক দূরে।

রাজা গণেশের সময় এই নামটির উদ্ভব হলে তার উল্লেখ টোডরমল প্রণীত খাজনা আদায়ের তালিকায় অথবা আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী নামক গ্রন্থে অবশ্যই পাওয়া যেত। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের মতে, নাটোরের রাজা রামজীবনের জমিদারী রাজশাহী নামে পরিচিত ছিল এবং সেই নামই ইংরেজরা গ্রহণ করেন এই জেলার জন্য। অনেকে এসব ব্যাখ্যাকে যথার্থ ইতিহাস মনে করেননা।তবে ঐতিহাসিক সত্য যে, বাংলার নবাবী আমল ১৭০০ হতে ১৭২৫ সালে নবাব মুশির্দকুলী খান সমগ্র বাংলাদেশকে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য ১৩ (তের) টি চাকলায় বিভক্ত করেন। যার মধ্যে ‘চারুলা রাজশাহী’ নামে একটি বৃহৎ বিস্তৃতি এলাকা নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে প্রবাহিত পদ্মা বিধৌত ‘রাজশাহী চাকলা’ কে তিনি উত্তরে বতর্মান রাজশাহী ও দক্ষিণে মুর্শিদাবাদের সঙ্গে অপর অংশ রাজশাহী নিজ চাকলা নামে অভিহিত করেন।

প্রথমে সমগ্র চাকলার রাজস্ব আদায় করতেন হিন্দু রাজ-জমিদার উদয় নারায়ণ। তিনি ছিলেন মুর্শিদ কুলির একান্ত প্রীতিভাজন ব্যক্তি। যে জন্য নবাব তাকে রাজা উপাধী প্রদান করেন। দক্ষিণ চাকলা রাজশাহী নামে বিস্তৃত এলাকা যা সমগ্র রাজশাহী ও পাবনার অংশ নিয়ে অবস্থিত ছিল, তা ১৭১৪ সালে নবাব মুর্শিদকুলী খান নাটোরের রামজীবনের নিকট বন্দোবস্ত প্রদান করেন। এই জমিদারী পরে নাটোরের রাণী ভবানীর শাসনে আসে ও বহু অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃতি লাভ করে। রামজীবন প্রথম নাটোর রাজ ১৭৩০ সালে মারা গেলে তার দত্তক পুত্র রামকান্ত রাজা হন। ১৭৫১ সালে রামকান্তের মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী ভবানী দেবী রাণী ভবানী নামে উত্তরাধীকারী লাভ করেন। অনেকের মতে, প্রথম রাজা উদয় নারায়ণের উপর প্রীতি বশত এই চাকলার নাম রাজশাহী করেন নবাব মুর্শিদকুলী খান।
কিন্তু ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র মতে, রাণী ভবানীর দেয়া নাম রাজশাহী । অবশ্য মিঃ গ্রান্ট লিখেছেন যে, রাণী ভবানীর জমিদারীকেই রাজশাহী বলা হতো এবং এই চাকলার বন্দোবস্তের কালে রাজশাহী নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

২. জয়পুরহাটঃ ১৮৭৫ সাল হতে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত দেশে ভীষণ দূর্ভিক্ষ দেখা দেয় । দূর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য দেশে রেললাইন বসানোর কাজ শুরু হয় । ১৮৮৪ সালে কলকাতা হতে জলপাইগুড়ী পর্যন্ত ২৯৬ মাইল রেলপথ বসানোর কাজ শেষ হলে লোকজনের উঠানামা এবং মালামাল আমদানি রপ্তানির সুবিধার জন্য ৪,৫,৬ বা ৭ মাইল পর পর রেলস্টেশন স্থাপিত হয় । সান্তাহারের পরে তিলকপুর , আক্কেলপুর , জামালগঞ্জ এবং বাঘাবাড়ীতে ( জয়পুরহাটের তৎকালীন স্থানীয় নাম) রেলস্টেশন স্থাপিত হয় । দেশে রেলপথ স্থাপিত হওয়ায়   দুরবর্তী স্থানে যাতায়াত সহজসাধ্য হয় । এতে নদী পথের গুরুত্ব বহুলাংশে কমে যায় । ১৮৮৪ সালে জয়পুরহাট রেলস্টেশন স্থাপিত হয় । ফলে দুরাগত ব্যবসায়ী এবং বিত্তশালী ব্যক্তিগণ ব্যবসায়ের সুবিধা এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে রেলস্টেশন এলাকায় বসতি স্থাপন শুরু করে । ধীরে ধীরে পার্শ্ববর্তী গ্রাম সমূহে লোক বসতি বাড়তে থাকে । ক্রমে খঞ্জনপুর এবং লালবাজার হাট বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং বাঘাবাড়ী হাটই প্রসিদ্ধি লাভ করে ।জয়পুর গভর্ণমেণ্ট ক্রাউন স্টেটের নাম অনুসারে পরবর্তীতে রেলস্টেশনটির নাম রাখা হয় জয়পুরহাট রেলস্টেশন । রাজস্থানের জয়পুরের সঙ্গে পার্থক্য বুঝাবার জন্যই মূলত  রেলস্টেশন এবং পোষ্ট অফিসের নাম রাখা হয়েছিল জয়পুরহাট। রেলস্টেশন ও পোষ্ট অফিসের নাম জয়পুরহাট রাখার পর হতে এলাকাটি জয়পুরহাট বলে পরিচিত হতে থাকে। 

৩. নওগাঁঃ নওগাঁ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে ‘নও’(নুতুন) ও ‘গাঁ (গ্রাম) শব্দ থেকে শব্দ দুটি ফরাসী। নওগাঁ শব্দের অর্থ হলো নুতুন গ্রাম।

৪. নাটোরঃ নাটোর জেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নারদ নদী। কথিত আছে, এই নদীর নাম থেকেই ‘নাটোর’ শব্দটির উৎপত্তি। অন্য মতে, নাটোর অঞ্চল নিম্নমুখী হওয়ায় চলাচল করা ছিল প্রায় অসম্ভব। জনপদটির দুর্গমতা বোঝাতে বলা হত নাতোর। নাতোর অর্থ দুর্গম। ভাষা গবেষকদের মতে, নাতোর উচ্চারণগত কারণে নাটোর হয়েছে। আরেকটি জনশ্রুতি আছে যে জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার আমোদ-প্রমোদের জন্য গড়ে উঠেছিল বাইজিবাড়ি, নটিপাড়া জাতীয় সংস্কৃতি। এই নটি পাড়া থেকে নাটোর শব্দটির উৎপত্তি।

৫. চাপাইনবাবগঞ্জঃ ‘চাপাইনবাবগঞ্জ’ নামটি সাম্প্রতিকালের।এই এলাকা ‘নবাবগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল। চাঁপাইগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কে জানা যায়, প্রাক-ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চল ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবদের বিহারভূমি। নবাবরা তাঁদের পাত্র-মিত্র ও পরিষদ নিয়ে এখানে শিকার করতে আসতেন বলে এ স্থানের নাম হয় নবাবগঞ্জ। নবাব আমলে মহেশপুর গ্রামে চম্পাবতী মতান্তরে ‘চম্পারানী’ বা চম্পাবাঈ’ নামে এক সুন্দরী বাঈজী বাস করতেন। তাঁর নৃত্যের খ্যাতি আশেপাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি নবাবের প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠেন। তাঁর নামানুসারে এই জায়গার নাম হয় ‘চাঁপাই”। অন্য আরেক মতে, এ অঞ্চলে রাজা লখিন্দরের বাসভূমি ছিল। লখিন্দরের রাজধানীর নাম ছিল চম্পক। এই চম্পক নাম থেকেই চাঁপাই নাম এসেছে। পরে এর সাথে যোগ হয় ‘নবাবগঞ্জ’।

৬. পাবনাঃ ‘পাবনা’ নামকরণ নিয়ে কিংবদন্তির অন্ত নেই। এক কিংবদন্তি মতে, গঙ্গার ‘পাবনী’ নামক পূর্বগামিনী ধারা হতে পাবনা নামের উৎপত্তি হয়েছে। অপর একটি সূত্রে জানা যায় ‘পাবন’ বা ‘পাবনা’ নামের একজন দস্যুর আড্ডাস্থলই এক সময় পাবনা নামে পরিচিতি লাভ করে। খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকে পাল নৃপতি রামপালের শাসনকালে এ অঞ্চলে ‘পদুম্বা’ জনপদের নাম পাওয়া যায়। এ সূত্রে কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, ‘পাবনা’ নাম এসেছে ‘পদুম্বা’ থেকে। কালক্রমে পদুম্বাই স্বরসঙ্গতি রক্ষা করতে গিয়ে পাবনা হয়েছে।

৭. বগুড়াঃ ১২৮১-১২৯০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের ২য় পুত্র সুলতান নাসিরউদ্দীন বগরা খান বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তাঁর নামানুসারে বগুড়া জেলার নামকরণ করা হয়েছে।

৮. সিরাজগঞ্জঃ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানা এলাকায় সিরাজউদ্দিন চৌধুরী নামক এক ভূস্বামী (জমিদার) ছিলেন। তিনি তাঁর নিজ মহালে একটি ‘গঞ্জ’ স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় সিরাজগঞ্জ।

চ) রংপুর বিভাগ

বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক পূণর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (National Implementation Committee for Administrative Reform: NICAR) ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি তারিখে রংপুরকে দেশের সপ্তম বিভাগ হিসেবে অনুমোদন দেয়। রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়,  দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও এই ৮-টি জেলা নিয়ে রংপুর বিভাগ গঠিত।

১. রংপুরঃ রংপুর নামকরণের ক্ষেত্রে লোকমুখে প্রচলিত আছে যে পূর্বের ‘রঙ্গপুর’ থেকেই কালক্রমে এই নামটি এসেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, উপমহাদেশে ইংরেজরা নীলের চাষ শুরু করে। এই অঞ্চলে মাটি উর্বর হবার কারণে এখানে প্রচুর নীলের চাষ হত। সেই নীলকে স্থানীয় লোকজন রঙ্গ নামেই জানত। কালের বিবর্তনে সেই রঙ্গ থেকে রঙ্গপুর এবং তা থেকেই আজকের রংপুর। অপর একটি প্রচলিত ধারনা থেকে জানা যায় যে রংপুর জেলার পূর্বনাম রঙ্গপুর। প্রাগ জ্যোতিস্বর নরের পুত্র ভগদত্তের রঙ্গমহল এর নামকরন থেকে এই রঙ্গপুর নামটি আসে। রংপুর জেলার অপর নাম জঙ্গপুর। ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব থাকায় কেউ কেউ এই জেলাকে যমপুর বলেও ডাকত। তবে রংপুর জেলা সুদুর অতীত থেকে আন্দোলন প্রতিরোধের মূল ঘাঁটি ছিল। তাই জঙ্গপুর নামকেই রংপুরের আদি নাম হিসেবে ধরা হয়। জঙ্গ অর্থ যুদ্ধ, পুর অর্থ নগর বা শহর। ত্রিশের দশকের শেষ ভাগে এ জেলায় কৃষক আন্দোলন যে ভাবে বিকাশ লাভ করে ছিল তার কারণে রংপুরকে লাল রংপুর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

২. গাইবান্ধাঃ গাইবান্ধা নামকরণ সম্পর্কে কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যে, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের রাজধানী ছিল গাইবান্ধা এলাকায়। বিরাট রাজার গো-ধনের কোন তুলনা ছিল না। তার গাভীর সংখ্যা ছিল ষাট হাজার। মাঝে মাঝে ডাকাতরা এসে বিরাট রাজার গাভী লুণ্ঠন করে নিয়ে যেতো। সে জন্য বিরাট রাজা একটি বিশাল পতিত প্রান্তরে গো-শালা স্থাপন করেন। সেই নির্দিষ্ট স্থানে গাভীগুলোকে বেঁধে রাখা হতো। প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে এই গাভী বেঁধে রাখার স্থান থেকে এতদঞ্চলের কথ্য ভাষা অনুসারে এলাকার নাম হয়েছে গাইবাঁধা, কালক্রম এটি গাইবান্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে।

৩. কুড়িগ্রামঃ কুড়িগ্রাম জনপদ বেশ প্রাচীন। কুড়িগ্রাম-এর নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। অনেকে মনে করেন গণনা সংখ্যা কুড়ি থেকে কুড়িগ্রাম হয়েছে। কারো মতে, কুড়িটি কলু পরিবার এর আদি বাসিন্দা ছিল। তাই এর নাম কুড়িগ্রাম। কেউ বা মনে করেন, রঙ্গপুর রাজার অবকাশ যাপনের স্থান ছিল কুড়িগ্রাম। প্রচুর বন-জঙ্গল ও ফল মূলে পরিপূর্ণ ছিল এই এলাকা, তাই ফুলের কুড়ি থেকে এর নাম হয়েছে কুড়িগ্রাম।

৪. লালমনিরহাটঃ লালমনিরহাট নামকরণ নিয়ে জনশ্রুতি আছে যে, বৃটিশ সরকারের আমলে বর্তমান লালমনিরহাট শহরের মধ্যে দিয়ে রেলপথ বসানোর সময় উল্লিখিত অঞ্চলের রেল শ্রমিকরা বন-জঙ্গল কাটতে গিয়ে জনৈক ব্যক্তি ‘লালমনি’ পেয়েছিলেন। সেই লালমনি থেকেই পর্যায়ক্রমে লালমনিরহাট নামের উৎপত্তি হয়েছে। অন্য এক সূত্র থেকে জানা যায়, বিপ্লবী কৃষক নেতা নুরুলদীনের ঘনিষ্ঠ সাথী লালমনি নামে এক ধনাঢ্য মহিলা ছিলেন। তাঁর নামানুসারে লালমনিরহাট নামকরণ করা হয়েছে।

৫. নীলফামারীঃ প্রায় দুই শতাধিক বছর পূর্বে এ অঞ্চলে নীল চাষের খামার স্থাপন করে ইংরেজ নীলকরেরা। এ অঞ্চলের উর্বর ভূমি নীল চাষের অনুকূল হওয়ায় দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় নীলফামারীতে বেশি সংখ্যায় নীলকুঠি ও নীল খামার গড়ে ওঠে। ঊণবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই দুরাকুটি, ডিমলা, কিশোরগঞ্জ, টেঙ্গনমারী প্রভৃতি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়। সে সময় মাটির ঊর্বরতার কারণে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মধ্যে নীলফামারীতেই বেশি পরিমাণে শস্য উৎপাদিত হতো। সে কারণেই নীলকরদের ব্যাপক আগমন ঘটে এতদঅঞ্চলে। গড়ে ওঠে অসংখ্য নীল খামার। বর্তমান নীলফামারী শহরের তিন কিলোমিটার উত্তরে পুরাতন রেল স্টেশনের কাছেই ছিল একটি বড় নীলকুঠি। ধারণা করা হয়, স্থানীয় কৃষকদের মুখে ‘নীল খামার’ রূপান্তরিত হয় ‘নীলখামারী’তে। আর এই নীলখামারীর অপভ্রংশ হিসেবে উদ্ভব হয় নীলফামারী নামের।

৬. পঞ্চগড়ঃ পঞ্চ বা পাঁচ গড়ের সমাহার পঞ্চগড় জেলায় বেশ কিছু গড় রয়েছে। এদের মাঝে উল্লেখ করার মত গড় হল ভিতরগড়, মিরগড়, রাজনগড়, হোসেনগড়, দেবনগড়। ‘পঞ্চ’ অর্থ পাঁচ, আর ‘গড়’ অর্থ বন বা জঙ্গল। ‘পঞ্চগড়’ নামটি এভাবেই এসেছে।

৭. দিনাজপুরঃ জনশ্রুতি আছে জনৈক দিনাজ অথবা দিনারাজ দিনাজপুর রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নামানুসারেই রাজবাড়ীতে অবস্থিত মৌজার নাম হয় দিনাজপুর। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসকরা রাজার সম্মানে জেলার নামকরণ করে দিনাজপুর।

৮. ঠাকুরগাঁওঃ ঠাকুরগাঁও এর আদি নাম ছিল নিশ্চিন্তপুর। ঠাকুরগাঁওয়ের নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে যা পাওয়া গেছে তা হলো বর্তমানে যেটি জেলা সদর অর্থাৎ যেখানে জেলার অফিস-আদালত অবস্থিত সেখান থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে আকচা ইউনিয়নের একটি মৌজায় নারায়ণ চক্রবর্তী ও সতীশ চক্রবর্তী নামে দুই ভাই বসবাস করতেন। সম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে তারা সেই এলাকায় খুব পরিচিত ছিলেন। সেখানকার লোকজন সেই চক্রবর্তী বাড়িকে ঠাকুরবাড়ি বলতেন। পরে স্থানীয় লোকজন এই জায়গাকে ঠাকুরবাড়ি থেকে ঠাকুরগাঁও বলতে শুরু করে।

ছ) সিলেট বিভাগ

১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ১ আগষ্ট সিলেট দেশের ষষ্ঠ বিভাগ হিসাবে মর্যাদা পায়। সিলেট, হবিগঞ্জ, মেীলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ নিয়েসিলেট বিভাগ গঠিত।

১. সিলেটঃ হিন্দু বিশ্বাস মতে শিবের স্ত্রী সতি দেবীর কাটা হাত (‘শ্রী হস্ত’)এখানে পড়েছিল বলে এ অঞ্চল শ্রীহট্ট নামে পরিচিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের ঐতিহাসিক এরিয়ান লিখিত বিবরণীতে এই অঞ্চলের নাম “সিরিওট” বলে উল্লেখ আছে। এছাড়া, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে এলিয়েনের (Ailien) বিবরণে “সিরটে”, এবং পেরিপ্লাস অব দ্যা এরিথ্রিয়ান সী নামক গ্রন্থে এ অঞ্চলের নাম “সিরটে” এবং “সিসটে” এই দুইভাবে লিখিত হয়েছে। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে যখন চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এই অঞ্চল ভ্রমণ করেন, তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে এ অঞ্চলের নাম “শিলিচতল” উল্লেখ করেন। তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী দ্বারা বঙ্গবিজয়ের মধ্য দিয়ে এদেশে মুসলিম সমাজব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটলে মুসলিম শাসকগণ তাঁদের দলিলপত্রে “শ্রীহট্ট” নামের পরিবর্তে “সিলাহেট”, “সিলহেট” ইত্যাদি নাম লিখেছেন। আর এভাবেই শ্রীহট্ট থেকে রূপান্তর হতে হতে একসময় সিলেট নামটি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে। এছাড়াও বলা হয়, এক সময় সিলেট জেলায় এক ধনী ব্যক্তির একটি কন্যা ছিল। তার নাম ছিল শিলা। ব্যক্তিটি তার কন্যার স্মৃতি রক্ষার্থে একটি হাট নির্মাণ করেন এবং এর নামকরণ করেন শিলার হাট। এই শিলার হাট নামটি নানাভাবে বিকৃত হয়ে সিলেট নামের উৎপত্তি হয়।

২. হবিগঞ্জঃ সুফি-সাধক হযরত শাহজালাল (রঃ) এর অনুসারী সৈয়দ নাসির উদ্দীন (রঃ) এর পূর্ণস্মৃতি বিজড়ি খোয়াই, কারাঙ্গী, বিজনা, রত্না প্রভৃতি নদী বিধৌত হবিগঞ্জ একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন জনপদ। ঐতিহাসিক সুলতানসী হাবেলীর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ সুলতানের অধঃস্তন পুরুষ সৈয়দ হেদায়েত উল্লাহর পুত্র সৈয়দ হাবীব উল্লাহ খোয়াই নদীর তীরে একটি গঞ্জ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নামানুসরে হবিগঞ্জ নামকরণ করা হয়।

৩. মেীলভীবাজারঃ হযরত শাহ মোস্তফা (রঃ) এর বংশধর মৌলভী সৈয়দ কুদরতউল্লাহ অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মনু নদীর উত্তর তীরে কয়েকটি দোকানঘর স্থাপন করে ভোজ্য সামগ্রী ক্রয় বিক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেন। মৌলভী সৈয়দ কুদরতউল্লাহ প্রতিষ্ঠিত এ বাজারে নৌ ও স্থলপথে প্রতিদিন লোকসমাগম বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমের মাধ্যমে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে মৌলভীবাজারের খ্যাতি। মৌলভী সাহেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এই অঞ্চলের নাম হয় মৌলভীবাজার।

৪. সুনামগঞ্জঃ ‘সুনামদি’ নামক জনৈক মোগল সিপাহীর নামানুসারে সুনামগঞ্জের নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ‘সুনামদি’ (সুনাম উদ্দিনের আঞ্চলিক রূপ) নামক উক্ত মোগল সৈন্যের কোন এক যুদ্ধে বীরোচিত কৃতিত্বের জন্য সম্রাট কর্তৃক সুনামদিকে এখানে কিছু ভূমি পুরস্কার হিসাবে দান করা হয়। তাঁর দানস্বরূপ প্রাপ্ত ভূমিতে তাঁরই নামে সুনামগঞ্জ বাজারটি স্থাপিত হয়েছিল। এভাবে সুনামগঞ্জ নামের উৎপত্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে।

(জ) ময়মনসিংহ বিভাগ

ময়মনসিংহ বাংলাদেশের অষ্টম প্রশাসনিক বিভাগ। ১৩ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে ৪-টি জেলা- জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠিত। ১৮২৯ সালে ঢাকা বিভাগ প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল ঢাকা বিভাগের অংশ ছিল।

১. ময়মনসিংহঃ মোগল আমলে মোমেনশাহ নামে একজন সাধক ছিলেন, তাঁর নামেই মধ্যযুগে অঞ্চলটির নাম হয় মোমেনশাহী। ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলার স্বাধীন সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তাঁর পুত্র সৈয়দ নাসির উদ্দিন নসরত শাহ’র জন্য এ অঞ্চলে একটি নতুন রাজ্য গঠন করেছিলেন, সেই থেকেই নসরতশাহী বা নাসিরাবাদ নামের সৃষ্টি। নাসিরাবাদ নাম পরিবর্তন হয়ে ময়মনসিংহ হয় একটি ভুলের কারণে। বিশ টিন কেরোসিন বুক করা হয়েছিল বর্জনলাল এন্ড কোম্পানীর পক্ষ থেকে নাসিরাবাদ রেল স্টেশনে। এই মাল চলে যায় রাজপুতনার নাসিরাবাদ রেল স্টেশনে। এ নিয়ে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরবর্তীতে আরো কিছু বিভ্রান্তি ঘটায় রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ময়মনসিংহ রাখা হয়। সেই থেকে নাসিরাবাদের পরিবর্তে ময়মনসিংহ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

২. নেত্রকোণাঃ

জনশ্রুতি আছে, নেত্রকোনা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মগরা নদীর বাঁক চোখের বা নেত্রের কোণের মতো বলে এই জায়গার নামকরণ হয়েছে ‘নেত্রকোনা’। কেউ কেউ এমনও মনে করেন, মগরা ও কাংশ নদী পরিবেষ্টিত এই জেলা দেখতে চোখ বা নেত্রের মতো দেখতে বলেই এমন নামকরণ।

বিলু কবীরের লেখা ‘বাংলাদেশের জেলা: নামকরণের ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, নাটোরকোণা গ্রামটি বর্তমানে নেত্রকোনা জেলা শহরের সাত-আট কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। একসময় প্রশাসনিক কাজকর্ম নাটোরকোণা গ্রামেই চলতে থাকে। এই ‘নাটোরকোণা’ নামটিই কালের পরিক্রমায় ‘নেত্রকোনা’ উচ্চারণরূপ ধারণ করে।

৩. শেরপুরঃ শেরপুরের পূর্ব কথার কিছু উল্লেখ না করলে অনেক জানার বিষয় অজানাই থেকে যাবে। কাজেই অতি সংক্ষেপে তার বর্ণনা দেয়া হল। প্রাচীন কামরুপ রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের আদি নাম পাওয়া যায় না। তবে এ অঞ্চলের হিন্দু শাসক দলিপ সামন্তের রাজ্যের রাজধানী গড় জরিপার উল্লেখ আছে। সম্রাট আকবরের সময় এ অঞ্চলের নাম দশ কাহনীয়া বাজু বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। শেরপুর পৌরসভার দক্ষিণ সীমান্তে মৃগী নদী হতে জামালপুর ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৮/৯ মাইল প্রশস্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব নাম ছিল লৌহিত্য সাগর। নদের উভয় পাড়ের নিকটবর্তী লোকদের প্রায় সময়ই নৌকায় যাতায়াত করতে হত। তারা খেয়া ঘাটের ইজারাদারের সহিত যাতায়াত মাশুল হিসবে বাৎসরিক চুক্তি অনুযায়ী ১০(দশ) কাহন কড়ি প্রদান করত। সে হিসেবেই এ অঞ্চলের নাম হয় দশকাহনীয়া। তৎকালে কড়ির মাধ্যমে বেচা-কেনা বা আর্থিক লেনদেন করা হত।

বাংলার নবাবী আমলে গাজী বংশের শেষ জমিদার শের আলী গাজী দশ কাহনিয়া অঞ্চল দখল করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেন। এই শেরআলী গাজীর নামে দশ কাহনিয়ার নাম হয় শেরপুর। তখনও শেরপুর রাজ্যের রাজধানী ছিল গড়জরিপা। বর্তমান গাজীর খামার ইউনিয়নের গিদ্দা পাড়ায় ফকির বাড়ীতে শের আলী গাজীর মাজার এবং নকলা উপজেলার রুনী গাঁয়ে গাজীর দরগাহ অবস্থিত । বৃটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলে নাম হয় শেরপুর সার্কেল।

৪. জামালপুরঃ দিল্লির সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে (১৫৫৬- ১৬০৫) হযরত শাহ জামাল (রহ.) নামে একজন ধর্মপ্রচারক  ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ২০০ অনুসারী নিয়ে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। পরবর্তীতে ধর্মীয় নেতা হিসাবে দ্রূত তার প্রাধান্য বিস্তার লাভ করে। ধারনা করা হয়, হযরত শাহ জামাল (রহ.) এর নামানুসারে এই শহরের নামকরণ হয় জামালপুর।

সংকলিত নিবন্ধ। তথ্য সূত্রঃ-জেলা তথ্য বাতায়ন, উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া।

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ