X

উইলিয়াম জেমস সাইদিস- উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের নিরব পতন

উইলিয়াম জেমস সাইদিস নামে কোন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম কি আমরা শুনেছি? অধিকাংশ মানুষই বলবে, না। এ নামে কাউকে চিনি না। অথচ, এ মানুষটি আইনস্টাইন, নিউটনের চেয়েও অধিক প্রতিভাবান ছিলো।

বিজ্ঞান বলে, এখনকার সাধারণ মানুষের গড় আইকিউ ৯০ থেকে ১০৯ এর মধ্যে। যাদের আইকিউ সবচে’ খারাপ তাদেরটা ৬৯ বা তার নীচে; অন্যদিকে যাদের খুব বেশি তাদের আইকিউ ১৩০ বা তার উপরে।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আইকিউ ছিলো ১৬০। তাঁর থেকে বেশি আইকিউ ছিল নিউটনের। নিউটনের আইকিউ ছিলো ১৯০। আইনস্টাইন বা নিউটনের চেয়ে অধিক আইকিউ সম্পন্ন আরেক জন ছিলো। নাম উইলিয়াম জেমস সাইদিস। ‘পরম বিষ্ময়কর শিশু’ (child prodigy) নামে খ্যাত সাইদিসের আইকিউ ছিলো ২৬০। অথচ, এ পৃথিবীর খুব কম মানুষ তাঁর নাম জানে। জানার সুযোগও তো তেমন হয়নি। গণিত ও ভাষা দক্ষতার অসম্ভব এ প্রতিভা অকালে ঝরে গিয়েছিলো। কিন্তু কেন?

নিউইয়র্কে শহরের এক উচ্চ শিক্ষিত এক দম্পতির ঘরে ১৮৯৮ সালে সাইদিসের জন্ম। তাঁর পিতা বরিস সাইদিস ছিলো খ্যাতনামা মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক। শিশুকালেই সাইদিস সবাইকে চমকে দিয়েছিল। ১৮ মাস বয়সে সে ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ এর মতো পত্রিকা পড়তে পারতো। ৮ বছর বয়সে সে ল্যাটিন, গ্রিক, ফরাসি, রাশিয়ান, জার্মান, হিব্রু, তুর্কি ও আর্মেনিয়ান- এই আটটি ভাষা শিখে ফেলে। শুধু তাই নয়, সে নিজেই একটি ভাষা তৈরি করেছিল। এটার নাম ‘ভেন্ডারগুড’ (Vendergood)।

যখন তাঁর বয়স ৯ তখন তার বাবা তাকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা করে। তবে তখন তারা তাকে ভর্তি নেয়নি। কিন্তু তার বাবাও নাছোড়বান্দা; মাত্র ১১ বছর বয়সে তাকে হার্ভার্ডে ভর্তি করে দেয়। হার্ভার্ডের ইতিহাসে সে সর্বকণিষ্ঠ ছাত্র। পরের বছরে সাইদিস হার্ভার্ড গণিত ক্লাবে চতুর্মাত্রিক বস্তুর (four-dimensional bodies) উপরে বক্তৃতা দেয়। এ বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের গণিতজ্ঞ মহলে বিষ্ময়ের রব ওঠে।

তাঁর এ বক্তব্য নিয়ে মার্কিন পদার্থবিদ কমস্টক (Daniel F. Comstock) বলেছিলেন, “আমার ধারণা, তরুণ সাইদিস জ্যোতির্বিদ্যার মহান এক গণিতবিদ হবে। নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করে সে মহাকাশ জগৎ পরিমাপের নতুন উপায় বের করবে। আমার বিশ্বাস, সে হবে মহান গণিতবিদ, মহাকাশ বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ কর্ণধার”। (Wallace, Amy (1986). The prodigy: a biography of William James Sidis, the world’s greatest child prodigy) । ১৬ বছর বয়সে (১৯১৪) হার্ভার্ড থেকে সে গ্রাজুয়েশন শেষ করে।

এর পরে ‘বোস্টন হেরাল্ড’ পত্রিকায় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার সবাইকে চমকে দেয়। সে সমাজ থেকে দূরে কোন এক নির্বাসনে নিঃসঙ্গভাবে জীবনযাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করে। তাঁর মতে এটাই ‘সর্বোৎকৃষ্ট জীবন’ (perfect life)। এমনকি সে চিরকুমার থাকার কথাও বলে। অবশ্য সাইদিস মার্থা ফোলে নামের এক তরুণীর প্রেমে পড়েছিল। তবে তাদের বিয়ে হয়নি।

সাইদিসের বাবা সন্তানের এ সন্ন্যাসব্রত মেনে নেননি। পড়াশোনা চালিয়ে যাবার জন্য তিনি প্রতি নিয়ত তাকে চাপ দিতে থাকেন। কিছুতেই আর কিছু হয়নি। ধীরে ধীরে সমাজ থেকে সাইদিস নিজেকে দূরে সরাতে থাকে। সে কখনো তাঁর বাবার ইচ্ছে মতো বাঁচতে চায়নি, সে চেয়েছে নিজের মতো বাঁচতে। নিজের জীবন নিজের মনের মতো সাধারণ ও অনাড়ম্বর করে গড়ে নিতে। পিতা-পুত্রের এই রেষারেশি ক্রমান্বয়ে তাদের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি করতে থাকে। এমনকি পিতার মৃত্যুর পরে সাইদিস অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও যোগ দেয়নি।

পড়াশোনা যখন হলো না, তখন সাইদিস ছোটখাটো একটা চাকুরি করে বাঁচতে চাইলো। ১৯১৫ সালে সে ‘উইলিয়াম মার্শ রাইস ইনস্টিটিউট ফর দি এডভান্সমেন্ট অভ লেটারস, সায়েন্স এন্ড আর্ট’ (বর্তমান Rice University)-এ গণিত শিক্ষকের সহকারি হিসেবে যোগদান করে। সেখানে সে ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’ (Euclidean geometry) ও ‘নন- ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’ (non-Euclidean geometry) পড়াতো। এ সময় সে গ্রিক ভাষায় ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’ এর উপরে একটি বইও লিখে ফেলে। তবে শিক্ষকতায় তাঁর মন বসেনি। এ পেশা সে ছেড়ে দেয়। এ নিয়ে সে বলেছিল, I’m not much of a teacher।

সাইদিস ‘প্যাসিফিস্ট’ (pacifism) বা যুদ্ধ বিরোধী ছিলো। কিছু দিন সে ‘জাতিপুঞ্জ’ (League of Nations) এর অফিসে কাজ করেছে। তবে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের যুদ্ধনীতির কারণে সে সে চাকুরিটাও ছেড়ে দেয়। এ সময়ে পত্রিকাগুলোও তাঁকে যথেষ্ট যন্ত্রণা দিয়েছিলো। সে সময়ে তাঁকে নিয়ে লেখা অন্যতম নিবন্ধ ‘এক ব্যর্থ প্রতিভার ছবি’ (Portrait of a Failed genius)।

যুদ্ধ বিরোধী মনোভাব ধীরে ধীরে সাইদিসকে সমাজবাদী করে তোলে। ১৯১৯ সালে বোস্টনে যুদ্ধ বিরোধী ‘মে ডে’ (May Day) এর প্যারেডে যোগদান করে সাইদিস। এ প্যারেডে সংঘর্ষ হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তাঁর ১৮ মাসের জেল হয়।  অবশ্য তাঁর পিতা তাকে জামিনে মুক্তির ব্যবস্থা করে। কিন্তু এর পরে সে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেনি।

বাকীটা জীবন সে ছোটখাটো, টুকিটাকি কাজ করে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছে। এ সময় সে নিজের পরিবারের সাথেও যোগাযোগ করতো না। ১৯৩৫ সালে মার্কিন গণতন্ত্রে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অবদান নিয়ে লেখা ‘দ্য ট্রাইবস এন্ড দ্য স্টেটস’ (The Tribes and the States) বইটিও সে প্রকাশ করেনি। ১৯৪৪ সালে মস্তিষ্কের রক্তক্ষণে সাইদিস মৃত্যু বরণ করে।

সে মানুষটির পৃথিবীকে বদলে দেবার প্রতিভা ছিলো, সে নিরবে, নিভৃতে কালের অতলে হারিয়ে গেল।

হতভাগ্য উইলিয়াম জেমস সাইদিস। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করি, ‘মানসিক চাপ বা বিষন্নতা নিয়ন্ত্রণের সবচে’ বড় উপায় হলো একটি ভাবনাকে সরিয়ে আরেকটি ভাবনাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা’।

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ