X

সোফিয়া ও বারাক ওবামা!

“মার্কিন ডলার বা মুদ্রায় নারীদের ছবি দেখি না কেন?” (প্রাক্তন) মর্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার উদ্দেশ্যে লেখা ম্যাসাচুয়েটস প্রদেশের নয় বছরের ছোট্ট শিশু সোফিয়ার এ প্রশ্নটির কোন সদুত্তর কী তিনি দিতে পেরেছেন! গত বছর ওবামাকে লেখা সেই ‘মহান চিঠি’টির একটি উত্তর পেয়েছে সোফিয়া। তাতে ওবামা লিখেছেন “নারী-পুরুষের সমান অধিকারের একটি দেশে তুমি যেন বেড়ে ওঠো সেটি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমি কাজ করে যাবো… তোমরা কাছ থেকে আমি অনেক বড় কিছু প্রত্যাশা করি”। হয়তো এ উত্তরের চেয়ে বেশি কিছু ওবামার জানা নেই; তিনি সোফিয়াকে এ বছর হোয়াইট হাউজের বার্ষিক অনুষ্ঠান ‘ঈস্টার এগ রোলে’ দাওয়াত দিয়েছেন।

মার্কিনিদের এক, দুই, পাঁচ, দশ, বিশ, পঞ্চাশ ও একশো ডলারের নোটে যথাক্রমে জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন, আব্রাহাম লিঙ্কন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন, এন্ডু জ্যাকসন, ইউলিসিস এস. গ্রান্ট ও বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের ছবি রয়েছে। অন্যদিকে, মুদ্রার মধ্যে পেনিতে (১ সেন্ট) আব্রাহাম লিঙ্কন, নিকেলে (৫ সেন্টস) থমাস জেফারসন, ডাইমে (১০ সেন্টস) ফ্রাঙ্কলিন ডি. রজভেল্ট ও কোয়ার্টারে (২৫ সেন্টস) জর্জ ওয়াশিংটনের ছবি রয়েছে। এদের মধ্যে আলেকজান্ডার হ্যামিলটন বাদে বাকিরা সবাই মার্কিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এই ইতিহাসে কোন নারী রাষ্ট্রপতির অস্তিত্ব নেই বলেই হয়তো কোন নারীর মুখচ্ছবি কোন নোট বা মুদ্রার ছাপে আসেনি । তবে প্রথম অর্থমন্ত্রী হিসেবে দশ ডলারের নোটে যেমন আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের ছবি ছাপা হয়েছিল, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব না থাকলে তেমনিভাবে হয়তো প্রথম নারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী, কংগ্রেসের প্রথম নারী স্পিকার, কোন না কোন ফাস্ট লেডি, কোন নারী অধিকারকর্মী বা কোন নারী সাহিত্যিকের ছবি মার্কিন মুদ্রা প্রকাশনায় এতদিনে শোভা পেত ।

অতীত ও বর্তমান মিলিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান হিসেবে পৃথিবীর প্রায় সত্তরটি দেশ কয়েক দফায় নারী নেতৃত্বের স্বাক্ষর বহন করে। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ দেশ নারী নেতৃত্বের তালিকায় এলেও আসেনি আমেরিকা ও ইসরাইল বাদে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোন দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে এ আশা আপাতদৃষ্টিতে সুদূর পরাহত মনে হলেও হয়তো আমেরিকার সময় এসে গেছে । সম্ভবত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে আগামী মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দৌড়ে দেখা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে বির্তক যেন তাঁর পিছু ছাড়ছে না- এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তাঁর ইমেইল ব্যবহার বিতর্ক। সরকারি কর্মকালে (২০০৯-২০১৩) তিনি নাকি অফিসিয়াল ইমেইল ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার করেন। অবশ্য তাঁর ভাষ্যমতে দুইটা মোবাইল ব্যবহারের জটিলতা এড়াতে তিনি ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার করতেন। এ সকল ছোটখাট অভিযোগের প্রেক্ষিতে ‘উইমেন ফর প্রেসিডেন্ট’ গ্রন্থের মার্কিন লেখিকা এরিকা ফক স্বীয় জাতির কাছে একটি প্রশ্ন করেন ‘আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন কী অনন্য নারীবিদ্বেষ রয়েছে যার জন্য হিলারি ক্লিনটনের মতো যোগ্য একজন নারীও রাষ্ট্রপতি প্রার্থীতায় নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে এমন অরুচির উদ্রেক করেছেন?’

বারাক ওবামার উত্তর

ভিক্টোরিয়া উডহাল (১৮৭২) থেকে শুরু করে এলিজাবেথ দোলে (২০০০) পর্যন্ত সাত জন নারী মার্কিন রাষ্ট্রপতির জন্য প্রতিযোগিতা করলেও এ যাবৎ কারো ভাগ্যেই শিকে ছেঁড়েনি; বরং এদের অনেকেই পরোক্ষভাবে মিডিয়ায় বিভিন্নভাবে নিগৃহীতও হয়েছেন। ইতিহাসবেত্তা ক্যাথরিন স্কালারের মতে মার্কিনিদের রাজনীতিতে লিঙ্গবৈষম্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শ্রেণি বৈষম্যের মতোই ক্ষমতাশালী। তবে সেখানে এ সংস্কৃতি বদলের একটি ঘণ্টাধ্বনি ক্রমশঃই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে – এখন ‘ডব্লিউ২০’ নামে অনলাইনভিত্তিক নারী অধিকারের একটি প্রচারণা চলছে; সোফিয়া এরই কণিষ্ঠতম একজন দূত। এরা একজন নারীর ছবি দিয়ে বিশ ডলারের নোট থেকে এন্ডু জ্যাকসনের ছবিটি সরাতে চায়। এ জন্য তাঁরা পনের জন নারীর একটি তালিকাও প্রস্তুত করেছেন। এ তালিকায় অন্যান্যদের মধ্যে যেমন এলিস পল (১৮৮৫-১৯৭৭), সোজোর্নার ট্রুথ (১৭৯৭-১৮৮৩) ও সুসান বি. অ্যান্থনির (১৮২০-১৯০৬) মতো নারী অধিকার ও ভোটাধিকার আন্দোলনের প্রথিতযশা নেতার নাম আছে, তেমনিভাবে রয়েছে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা কংগ্রেস শার্লে চিসহম (১৯২৪-২০০৫) ও ‘ফাস্ট লেডি অভ সিভিল রাইটস’ রোজা পার্কস (১৯১৩-২০০৫) মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক নাম। আড়াই লাখেরও বেশি লোক এ উদ্যোগকে ইতোমধ্যে সমর্থন জানিয়েছেন যা পরবর্তীকালে বাস্তবায়নের জন্য পিটিশন আকারে ওবামা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হবে।

পরিবর্তনের নিয়মেই পরিবর্তনের গতিধারা নিয়ন্ত্রিত হবে-হয়তো হবে, হয়তো বা না। সে যাই ঘটুক, যতদিন পর্যন্ত আমেরিকায় লিঙ্গভিত্তিক সমতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে না ততদিন পর্যন্ত সোফিয়ার এই প্রশ্নটিই তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সবিরাম প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে – “মার্কিন ডলার বা মুদ্রায় নারীদের ছবি দেখি না কেন?”

প্রথম প্রকাশকাল– ০৬ এপ্রিল ২০১৫

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ