X

নোকিয়া- শীর্ষ থেকে নিঃস্ব হওয়ার করুণ কাহিনী

নোকিয়া ছিল ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানি। এই এক দশক আগেও টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে নোকিয়া সারা বিশ্বে দাপিয়ে ব্যবসা করেছে। মোবাইল ফোনের ব্যবসায় নোকিয়া সারা বিশ্বকেও জয় করেছে। এমনকি বাংলাদেশে নোকিয়া এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে এক সময় সবাই বলতো, ‘ফোনের রাজা নোকিয়া’।

নোকিয়া বয়স অনেক। দেড় শতাব্দী ধরে টিকে আছে এ কোম্পানি। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৫ সালে। তবে নব্বইয়ের দশকে বিশ্বব্যাপী নোকিয়ার উত্থান ঘটে। তারপরে কি হলো? কেন তারা ধীরে ধীরে মোবাইল ফোনের বিশ্ববাজার থেকে ছিটকে পড়লো? এটা বুঝতে হলে জানতে হবে কিভাবে নোকিয়ার উত্থান হয়েছিলো।

১৯৮১ সালে ‘মোবিরা’ (Mobira) নামের একটি মোবাইল ফোন কোম্পানি নরডিক অঞ্চলে (ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেন) সেলুলার সেবা ( Nordic Mobile Telephone-NMT) চালু করে। এটি বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক সেলুলার সেবা। এ বছরেই নোকিয়া মোবিরাকে অঙ্গীভূত করে। পরের বছরে নোকিয়া প্রাইভেট কারে ব্যবহারযোগ্য ১০ কেজি ওজনের ‘নোকিয়া মোবিরা সিনেটর’ নামে প্রথম মোবাইল ফোন চালু করে। এ দশকে নোকিয়া আরো কয়েকটি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিকে কিনে নিয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল টেলিভিশন নির্মাতা সোলারা (Solara) ও ওশেনিক (Oceanic), লুশর এবি (Luxor AB), শোয়াব লরেঞ্জ (Schaub-Lorenz), একিসন (Ericsson) ইত্যাদি।

মাৎস্যন্যায়ে যেভাবে বড় মাছ ছোট ছোট মাছকে খেয়ে নিজের রাজত্ব কায়েম করে, নোকিয়াও ইউরোপ জুড়ে তার রাজত্ব কায়েম করতে শুরু করে। এ সবের পেছনে নোকিয়ার যে ‘প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা’ (CEO) বিশেষ ভূমিকা রাখে সে কাইরামো (Kari Kairamo)। তবে সে বড্ড বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলে, ফলে আর্থিক চাপের মুখে পড়ে নোকিয়া। ১৯৮৮ সালে কাইরামো আত্মহত্যা করে।

পাঁচ কেজি ওজন কমিয়ে ১৯৮৪ সালে ‘টকম্যান’ চালু হয়। এটাই প্রথম পরিবহনযোগ্য মোবাইল ফোন। এটা গাড়িতে বা গাড়ির বাইরেও ব্যবহার করা যেত। তবে মোবাইল ফোনের জগতে নোকিয়ার প্রথম যুগান্তকারী আবিষ্কার ‘সিটিম্যান’। এটি ১৯৮৭ সালে চালু হয়। ৮০০ গ্রাম ওজনের এ হ্যান্ডসেটটি একটু ভারী হলেও হাতে করে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যেত। এটি সারা বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। শুরু হয় নোকিয়ার বিশ্ব জয়ের গল্প।

১৯৯১ সালে ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হ্যারি হলকেরি (Harry Holkery) নোকিয়া ফোন দিয়ে বিশ্বের মোবাইল ইতিহাসে প্রথম বারের মতো জিএসএম (Global System for Mobile Communications) কল করে। এর পর থেকে হ্যান্ডসেট আরো হাল্কা ও ছোট হতে থাকে। পরের বছর নোকিয়া বের করে নোকিয়া ১০১১। এর পরে আসে নোকিয়া ২১০০। প্রথম দিকে এই হ্যান্ডসেট ১ মিলিয়ন বিক্রির লক্ষ্য থাকলেও নোকিয়া ২১০০ মডেল ২০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়।  এটাই ছিল ১ম ফিচার (feature) ফোন।

এ সময়ে নোকিয়ার একটা ভুল হয়েছিল। তারা বিশ্ব বাজারে মোবাইলের চাহিদা সম্পর্কে বুঝতে পারেনি। ১৯৯০ সালে তাদের ধারণা ছিল যে, ১৯৯৯ সাল নাগাদ বিশ্বের ৪০ মিলিয়ন মানুষ মোবাইল ব্যবহার করবে।  সে ভাবেই তারা বাজার দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু এ ধারণা কতটা ভুল ছিল তা বলাই বাহুল্য। ১৯৯৯ সালে বিশ্বে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা হয়েছিল ২৫০ মিলিয়নেরও বেশি।

এ চাহিদা নোকিয়া একা মেটাতে পারেনি। এ সুযোগে নোকিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য অনেক কোম্পানি উঠে আসে। এদের মধ্যে মার্কিন কোম্পানি মটোরোলা নোকিয়ার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও শুরু করে। তবে সেটি নোকিয়াকে টপকাতে না পারলেও বাজারে অনেকখানি দখল করে রাখে। এর পরেও বিশ্ব বাজারের ২৫ শতাংশ নোকিয়ার দখলে ছিল। তাদের সব হ্যান্ডসেটই বিক্রি তালিকার শীর্ষে থাকতো।

২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে নোকিয়ার দুটি হ্যান্ডসেট তার সব প্রতিদ্বন্দ্বীতে হারিয়ে দেয়। এদের একটি নোকিয়া ১১০০ ও অন্যটি নোকিয়া ১১১০। এ সময়ে এশিয়ার বাজারের ৭০ শতাংশ নোকিয়ার দখলে চলে আসে।

তখন সময়ের সাথে সাথে দ্রুত টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির বাজার পরিবর্তিত হচ্ছিল। এ পরিবর্তনের সাথে নোকিয়া তার চলার পথকে একজোট করতে পারেনি। এটাই ছিল তাদের সবচে’ বড়ো ভুল।

২০১০ সালের দিকে মার্কিন ও ইউরোপের মোবাইল টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় আইওএস (Iphone Operating System- IOS) ও এনড্রয়েড (Android) সিস্টেমের প্রচলন হয়। একই সময়ে চীনারাও তাদের লোকাল মার্কেটের জন্য সস্তায় ব্যাপক হারে মোবাইল হ্যান্ডসেট তৈরি করতে শুরু করে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়াতে সামসাং ও মটোরোলা নোকিয়ার থেকে কম দামে ভালো মানের মোবাইল দিতে বিক্রি করতে শুরু করে। মনে থাকবে হয়তো, সে সময়ে মটোরোলার ফ্লিপ হ্যান্ডসেটগুলো (বিশেষ করে Moto Razr) ব্যাপক সাড়াও ফেলে ছিল।

অ্যাপল কোম্পানি আইওএস ও অন্যান্যরা এনড্রয়েড সিস্টেমে চলে গেলে নোকিয়া যায়নি। তারা তাদের সিমবিয়ান (Symbian) সিস্টেমে রয়ে গেল। এর পরে একদিকে যখন গুগল অ্যাপ ও অন্যদিকে অ্যাপলের আইওএস অ্যাপ মোবাইল বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নামলো তখন এই দুইয়ের চাপে নোকিয়ার অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকলো। গুগল অ্যাপগুলো এনড্রয়েড সাপোর্ট করতো বলে এ প্রতিযোগিতায় সামসাংয়ের মতো অন্য যারা এনড্রয়েড ব্যবহার করতো তাদের লাভ হলো।

এর পরেও নোকিয়া তাদের বিজনেস পলিসি পরিবর্তন করেনি। বিশ্ব বাজার যখন মোবাইল সফটওয়ারের প্রতিযোগিতা করছিল, তখনও তারা হার্ডওয়ার উন্নয়নে মনোযোগী ছিলো। ফলে মোবাইলের বাজার থেকে নোকিয়া ছিটকে পড়ে।

এ সময়ে স্টিফেন এলপ (Stephen Elop) নোকিয়ার নতুন সিইও হিসেবে নিযুক্ত হয়। সে ভুলগুলো শুধরে নিতে চাইলো; সিমবিয়ান সিস্টেমের পরিবর্তন করে নতুন প্রযুক্তিতে আবার মোবাইলের বিশ্ব বাজারে ফিরে আসতে চাইলো। তবে এবারও তারা এড্রয়েডে গেল না।

নোকিয়া ইউনিক পদ্ধতিতে বাজারে আসতে চাইলো। চালু করলো উইন্ডোজ সিস্টেম। এ সিদ্ধান্তটাও ভুল প্রমাণিত হলো। কারণ উইন্ডোজ সিস্টেমে মোবাইল পরিচালনা বেশ জটিল ছিল। তাই ঢাকঢোল পিটিয়ে নোকিয়া লুমিয়া বাজারে আসলেও হ্যান্ডসেটটি তেমন কোন সাড়া ফেলেনি।

বাজারে যে গতিতে আইওএস ও এনড্রয়েড সিস্টেমের অ্যাপ চালু হলো, সে গতির কাছে পরাজিত হলো উইন্ডোজ অ্যাপগুলো। নষ্ট হয়ে গেল নোকিয়ার ফিরে দাড়ানোর সব স্বপ্ন। নোকিয়ার কফিনে ঢুকে গেল শেষ পেরেক।

এ ভাবে মোবাইল হ্যান্ডসেটের বিশ্ব বাজারের শীর্ষ থেকে নিঃস্ব হয়ে গেল নোকিয়া।

সম্পর্কিত অন্যান্য ব্লগ