X

হুয়ানিতা ধর্মের নিষ্ঠুরতার এক কালসাক্ষী

হুয়ানিতা ধর্মের নিষ্ঠুরতার এক কালসাক্ষী। হুয়ানিতার মমি ধর্মের নামে নারী বলিদানের বিরুদ্ধে এক নিরব প্রতিবাদের প্রতিকস্বরূপ আজও টিকে আছে।

৮ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ জোহান রেইনহার্ড এবং তার সহকারী মিগুয়েল জারাতে পেরুর আরেকিপায় অবস্থিত মাউন্ট এমপাটোর ২০,৬৩০ ফুট চুড়ায় উঠেন।তাদের লক্ষ্য ছিলো জীবন্ত আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণ করা এবং সেই সাথে পর্বতের চূড়ায় আচ্ছাদিত বরফ কি ভাবে আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের প্রভাবে গলে যায় সেই সম্পর্কে ধারনা নেয়া।

তারা পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পরে পাহাড়ের ঢালে কিছু একটা দেখে তাদের চোখ আটকে যায়। তারা দুইজন উপরে থেকে নীচে নেমে আসে এবং দেখতে পায় গলে যাওয়া বরফের নীচ থেকে কাপড় জাতীয় কোন কিছুর টুকরো বেরিয়ে আছে।

এটা দেখতে বড় একটা কাপড়ের পোটলার মতন। পোটলাটি একটি ছোট গর্তের মতন দেখতে একটি জায়গায় রাখা। ভালোমত পরীক্ষা করার পরে তারা দেখতে পায় আসলে তারা যেই জিনিসটাকে কাপড়ের পোটলা ভেবেছিলো তা হলো একটি মমির গায়ে প্যাঁচানো কাপড়।

মমির গায়ের পোশাক দেখে তারা বুঝতে পারলো যে, এই মমি ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সের কোন ইনকা কিশোরীর যে কি না অনেক বছর আগেই মারা গিয়েছে। অনুমান করুন কত বছর আগে? সম্ভবত, আজ থেকে পাঁচশত বছর পূর্বে এই কিশোরী মৃত্যুবরণ করে।

পর্বতের উপরে তাপমাত্রা হ্রাসের কারণে তাঁর দেহ সংরক্ষিত ছিল। তাঁর দেহটি এতটাই অক্ষত ছিলো যে আবিষ্কারের সময় তার মাথার চুল অক্ষত ছিলো। তবে তার হাত এবং বাহুর চামড়া বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু শরীরের অন্য কোথাও কোন ক্ষয় ছিলো না। এটি সম্ভবত মানব ইতিহাসে সেরা সুরক্ষিত প্রাক-কলম্বিয়ান মমি।

এই মমিকৃত কিশোরীর নাম দেয়া হয় মোমিয়া হুয়ানিতা (Juanita) বা ‘মমি হুয়ানিতা’। এছাড়া, এটি এমপাটো লেডি, ইনকা আইস মেডেন বা লেডী অফ এমপাটো নামেও পরিচিত।

আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফলে বরফ গলে এই মমি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। একই বছরের অক্টোবরে রেইনহার্ড এবং মিগুয়েল দ্বিতীয় পর্বের অভিযান পরিচালনা করেন এবং এমপাটো পর্বতের নিম্নভূমিতে আরো দুই ব্যক্তির মমি খুঁজে পায়। সাধামাটা এই মমি দুটির মধ্যে একটি ছেলে ও অন্যটি মেয়ে। গবেষকদের ধারনা, এই মমি দুটি হুয়ানিতার সঙ্গী হতে পারে। তারা আরো মনে করেন, হুয়ানিতা হলো ‘স্যাক্রেড লেডি’ আর বাকী দুইজন ছিলো তার সেবক এবং সেবিকা।

প্রশ্ন আসে, তাকে কেন স্যাক্রেড লেডি বা ‘পবিত্র নারী’ বলা হলো? কেন বা কিসের জন্য এদেরকে উৎসর্গ করা হয়েছিলো?

এ বিষয়ে জানতে হলে ইনকাদের কিছু রীতিনীতি সর্ম্পকে আগে ধারনা নিতে হবে। ইনকাদের কাপাকোচা (Capacocha) নামের একটি উৎসব ছিলো। সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণ, কোন যুদ্ধ জয় কিংবা নতুন রাজপুত্রের আগমন- এই রকম বড় ধরনের ঘটনার সময়ে এই কাপাকোচা উৎসব পালন করা হতো। ভালো ফসলের, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার জন্যেও এ উৎসবের আয়োজন হতো।

কাপাকোচা রীতিতে সর্বোত্তম এবং স্বাস্থ্যবান কোন কিশোরী কুমারীকে বলিদান করা হতো। উৎসর্গের সময়ে উৎসর্গীকৃত কিশোরীকে দামী পোষাক, মূল্যবান গহনা দিয়ে সাজানো হতো। এছাড়া, উৎসর্গের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিকে উৎসর্গের দিনের এক বছর আগে থেকে একটি খ্যাদ্যাভাস মেনে চলতে হতো।

সাধারণ ইনকাদের খাদ্য হিসেবে আলু এবং সবজির অবস্থান ছিল খুব বেশি। হুয়ানিতাকে যখন উৎসর্গের জন্য দিনক্ষণ ঠিক করা হয় তার ঠিক এক বছর তাঁর এই খাদ্যভাস পরিবর্তন হয়েছিলো। সে প্রাণীজ প্রোটিন এবং ভুট্টা খাওয়া শুরু করেছিলো। এটা রাজাদের খাবার ছিল। চুলের আইসোটোপিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁর এই ডায়েটের পরিবর্তনের বিষয়টি উদ্ভাবন করা হয়।

ফরেনসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু উইলসন হুয়ানিতা সম্পর্কে বলেছেন যে, উৎসর্গ করার ৪২ থেকে ৫৬ দিন আগে থেকে তাকে প্রচুর পরিমাণে অ্যালকোহল (ইনকাদের তৈরী এই মদের নাম চিচা) খাওয়ানো হতো। সেইসাথে কোকো পাতা দিয়ে তৈরী বিশেষ ধরনের মাদকও তাকে খাওয়ানো হতো।

এই নেশাজাতীয় দ্রব্যের পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়ানো হতো। আর এই পরিমাণ এতটাই বাড়ানো হতো যে এক পর্যায়ে কিশোরীর স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা লোপ পেতো। অনেকটা রোবটের মতন হয়ে যেতো।

তার সাথে কি হচ্ছে বা কি করা হবে সেই সর্ম্পকে তার কোন ধারণাই থাকতো না। আর ধারণা থাকলেও তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। কারন এটা ইনকা সাম্রাজ্যের একটা রীতি। রাজকীয় বাধ্যবাধকতার জন্য এ নিয়ম একে মেনে নিতেই হবে । এর আগেও হয়ানিতার মতো অনেক কিশোরীকে এই ভাবে দেবতাদের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে।

এ উৎসবের সবকিছু করা হতো একজন পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে। চূড়ান্ত ক্ষণে পুরোহিত মেয়েটিকে নিয়ে পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতো। পিছনে পিছনে অনেক মানুষ আসতো এই উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য। পাহাড়ের চূড়ায় পৌছানোর পরে আরো কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতো। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবার পরে কিশোরীকে পাহাড়ের চূড়ায় রেখে আসা হতো। রেখে আসার সময় কিশোরীর মাথায় ভারী কোন বস্তু দ্বারা আঘাত করা হতো। ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতো আর এর ফলে অসহায় মেয়েটি সেখানে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। প্রচুর পরিমাণে নেশা করানোর ফলে মেয়েটি জানতেও পারত না কিভাবে সে মারা গেলো। সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই একটি চরম নিষ্ঠুরতা।

রেডিওডোলজিস্ট ইলিয়ট ফিশম্যান কিশোরীর মাথা স্ক্যান করে তার মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন। এই আঘাতের ফলে কপালের একপাশ ফুলে ওঠে।
ফিশম্যান বলেন যে, তার আঘাতের চিহ্নটা দেখলে মনে হবে একটি বেসবল ব্যাট দ্বারা আঘাত করা হয়েছে।

মেয়েটির দেহ যেই স্থানে পাওয়া যায় সেই জায়গার উপর ভিত্তি করে গবেষকরা ধারনা করেন যে, এই অনুষ্ঠানটি মাউন্ট এমপাটোর উপাসনার সাথে সংযুক্ত হতে পারে। যখন হুয়ানিতাকে আবিষ্কার করা হয়েছিল তখন সে একটি বান্ডিলের মধ্যে আবৃত ছিল। এই বান্ডিলটির মধ্যে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত বিভিন্ন শৈল্পিক উপাদান ছিলো, যেমন ক্ষুদ্র মাটির মূর্তি শেল সোনা, রুপার বিভিন্ন বস্তু ইত্যাদি।

হুয়ানিতা বর্তমানে মিউজেও সান্টুওরিস আন্দোনিস আরেকুইপায় জাদুঘরের বিশেষভাবে নির্মিত কাঁচের ঘরে আবদ্ধ। ভবিষ্যতের জন্য এই অবশিষ্টাংশগুলি সংরক্ষণ করতে এখানকার তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।

সুত্রঃএনসিয়েন্ট অরিজিনস, অল দ্যাট ইন্টারেস্টিং ডট কম, পেরু রিপোর্টস ইউটিউব।

মূল লেখক- নেবুলা মোর্শেদ; সম্পাদনা– আলাউদ্দীন ভুঁইয়া

লেখকের অন্য নিবন্ধ