X

ওটজি বা বরফ মানব: জীবন্ত ও অভিশপ্ত এক মমি

ওটজি বললে অনেকেই চিনবেন না। কিন্তু যদি বলি ‘আইসম্যান’ বা ‘বরফ মানব’ তাহলে হয়তো অনেকেই চিনবেন বা বলবেন হ্যাঁ নাম শুনেছি।

১৯ শে সেপ্টেম্বর ১৯৯১ সালে আইসম্যানকে খুঁজে পাওয়ার পরে দুনিয়া জুড়ে প্রচুর হৈ চৈ হয়েছিলো। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছে।

আজ থেকে পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে এই পৃথিবীতে বরফ মানবের চলাফেরা ছিল। এরা হোমো স্যাপিয়ন্স মানে বর্তমান মানবের নিকটতম আদি পুরুষদের মধ্যে অন্যতম। এই আইসম্যান সম্ভবত ৫,৩০০ বছর আগে পৃথিবীতে বাস করতো। মৃত্যুর পরে তাঁর দেহটি প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত হয়। দেহটি অবিকল মানুষের মতো টিকে থাকার জন্য এটাকে  জীবন্ত মমিও বলা চলে।

জার্মানির নুরেমবার্গের দুই পর্যটক ছিলো হেলমুট আর এরিকা। তারা ১৯৯১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিমন আল্পস পর্বতে আরোহণ করছিলেন। হঠাৎ সেখানে (৩,২১০ মিটার বা ১০,৫৩০ ফুট) উপরে তারা একটি মানবের দেহের সন্ধান পান। প্রথমে তারা ভেবেছিলো সে কোন হতভাগ্য পর্বতারোহী যে হয়তো পর্বতে চড়তে গিয়ে মারা গিয়েছে।

পরেরদিন বরফ কাটার সরঞ্জাম এনে বরফ কেটে তার ভিতর থেকে তারা সেই দেহটাকে উদ্ধার করে। যেহেতু ওটজাল আল্পসে এই বরফ মমিটি আবিষ্কৃত হয়েছিল, তাই একে ওটজি নামে নামকরণ করা হয়েছিল।

ওটজাল আল্পস অস্ট্রিয়া ও ইতালির সীমান্তে সিমিলুন পর্বত এবং হাউল্যাবজোচের নিকটবর্তী। ওটজি আবিষ্কারের পর ওটজিকে কার এলাকায় পাওয়া গেছে তা নিয়ে ইতালিয় এবং অস্ট্রিয়ানরা বিবাদে জড়িয়ে পরে। পরবর্তীতে ভৌগলিক জরিপের মাধ্যমে জানা যায়, মমিটি ইতালীয় এলাকায় পাওয়া যায়। ফলে ইটালিয়ানরা জিতে যায়।

ওটজির সঙ্গে বরফের নিচে খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র। এর মধ্যে রয়েছে তীর, ধনুক ও দস্তার তৈরি একটি কুড়াল। সে ঘাস দিয়ে তৈরি একটি গরম চাদর, ছাগলের চামড়ার তৈরি ল্যাগিংস আর ভালুকের চামড়ার ক্যাপ পরিহিত ছিলো।

ওটজির উচ্চতা ১.৬ মি (৫ ফুট ৩ ইঞ্চি)। জীবিত অবস্থায় তার ওজন ছিলো ৬১ কেজি (১৩৪ পাউন্ড)। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিলো আনুমানিক ৪৫ বছর। প্রথমে বিশ্বাস করা হয়েছিল যে, ওটজির নীল চোখ ছিল; কিন্তু পরে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যায়, ওটজির বাদামী চোখ ছিল।

ওটজির দেহ পরীক্ষা করে তার কলার বোনের কাছে একটি ক্ষত পাওয়া যায়। এর থেকে গবেষকরা ধারণা করেন, ওটজি তীরবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে অস্ট্রিয়ার ইনসব্রাক ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা ওটজির মস্তিষ্কের স্ক্যান করেন। স্ক্যানে দেখা যায়, ওটজির মাথার পেছনে কালো ক্ষত রয়েছে। এরপর গবেষকরা সিদ্ধান্ত নেন, ওটজি মাথায় আঘাতের কারণে মারা গিয়েছিলেন। ওটজির কাপড় এবং তাঁর সাথে থাকা সরঞ্জামগুলিতে রক্তের একাধিক ধরনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ থেকে ধারণা হয়, ওটজি শত্রুর সাথে যুদ্ধে মারা যায়।

ওটজি হলো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গবেষিত মমির মধ্যে অন্যতম। জেনেটিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করে যে, মারা যাবার সময় ওটজির বেশ কয়েকটি রোগ ছিল, যেমন তাঁর হার্টের সম্যসা ছিলো, তাঁর হার্টের ধমনী সংকীর্ণ ছিলো এবং সেখানে অনেকগুলি ব্লক ছিলো। তাঁর নিতম্ব, হাটু, পায়ের গোড়ালি, মেরুদন্ডের নিচের দিকে (পিছনে) বাত জাতীয় রোগ ছিলো। তাঁর দাঁত গুলি নস্ট এবং কদর্য ছিলো। ধারনা করা হয়, ওটজির আলসারও ছিলো। তাঁর অন্ত্রে পরজীবী কীটের ডিম পাওয়া গেছে।

ওটজির শরীরে ৬১-৭০ টি উল্কি পাওয়া গেছে। এই উল্কি গুলি খুব সহজ ক্রস আঁকা। উল্কিগুলি ১ থেকে ৪ মিমি পুরু এবং ৭ থেকে ৪০ মিমি লম্বা। এই উল্কি থেকে সংগৃহীত নমুনা মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, এই উল্কি অগ্নিকুন্ডের ছাই থেকে উৎপাদিত রঙ্গক থেকে আঁকা হয়েছিল।

এই উল্কি দেখে আলংকারিক বলে মনে হয় না। এই উল্কিগুলির চেহারা এবং অবস্থান দেখে গবেষকরা মনে করেন যে, এই চিহ্নগুলি চিকিৎসার একটি অংশ ছিলো। এই উল্কি বা কালো দাগগুলি ঐতিহ্যগত আকুপাংচারের চাপের স্থান -এর সাথে সম্পর্কিত বলে ধারনা করা হয়। কিছু গবেষকদের ধারনা, ওটজি আকুপাংচার চিকিৎসা নিয়েছেন।

বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা মনে করেন চীনে প্রথমবারের মতো আকুপাংচার আবির্ভূত হয়েছিল। এটির প্রথম লিখিত বিবরণ ২,২০০ বছর আগে আবির্ভূত হয়। তবে এটি ইউরোপের মতো অন্য কিছু স্থানে এর আগেও আবির্ভূত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

ওটিজ হচ্ছে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীনতম উল্কি মানব। ওটজির দেহ ইতালির বোলজ্যানোতে বিশেষভাবে তৈরি এক জাদুঘরে সংরক্ষণ করা আছে। ওটজির দেহকে দেখার জন্য অনেক দর্শনার্থী বেড়াতে আসেন।

ওটজি অন্য আরেকটি কারনেও বিখ্যাত। তা হলো ওটজি নাকি অভিশপ্ত মমি। ওটজির সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই অস্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন। ওটজিকে প্রথম দেখতে পান হেলমুট সাইমন। ২০০৮ সালে হাইকিংয়ের সময় ৩০০ ফুট নিচে পড়ে গিয়ে তিনি মারা যান। তিনি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রথম ওটজিকে দেখেছিলেন এর কাছাকাছি জায়গাতেই তার মৃত্যুদেহ পাওয়া যায়।

সাইমনের উদ্ধারকারী দলের প্রধান ছিলো ডিয়েটার ওয়ারনেক। সাইমনের শেষ কৃত্যানুষ্ঠানের এক ঘন্টার মাথায় হার্ট অ্যাটাকে মারা যান ওয়ারনেক। প্রত্নতত্ত্ববিদ কনরাড স্পিন্ডলার প্রথম ওটজির দেহ পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি মাল্টিপল সেক্লরোসিসে মারা যান। ফরেনসিক টিমের প্রধান রেইনার হেন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

ওটজিকে বরফের নিচ থেকে উদ্ধারের ছবি তোলেন অস্ট্রিয়ার সাংবাদিক রেইনার হোয়েলজল। তিনি ব্রেন টিউমারে মারা যান। ওটজিকে নিয়ে একটা বই লিখছিলেন আমেরিকান বংশোদ্ভূত মলিকুলার প্রত্নতত্ত্ববিদ টম লয়। ব্রিসবেনে লেখককে নিজ বাস ভবনে মৃত অবস্থায় পাওয়া। তিনি ওটজিকে নিয়ে লেখা একটি বই চূড়ান্ত করেছিলেন।

কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের পরিচালক হেলমুট সিমন গবেষণা শুরুর পর থেকেই রক্তের নানা সমস্যায় আক্রান্ত হন এবং টানা ১২ বছর ভুগে মারা যান। তাঁর পরিবারের সদস্যরা বলেন আইসম্যানের সাথে জড়িত হওয়ার পরেই এই অবস্থাটি ধরা পড়ে।

২০১৭ সালের মধ্যে ওটজির সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েক জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু দেখে সবাই ওটজিকে অভিশপ্ত মমি বলা শুরু করেছে। তবে এটি সত্য হবার কোন সুযোগ নেই। যদি সত্যিই কোন অভিশাপ থাকে, তবে সেখানে আরো অনেক মৃত্যু হওয়া উচিত; যেমন যাদুঘরের টিকিট বিক্রেতা, ওটজির দেহের পুনর্গঠন শিল্পী, ডিএনএ বিশেষজ্ঞ সহ আরো শত মানুষ আছে যাদের প্রত্যেকেই ওটজির সাথে কোন না কোন ভাবে সংযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা অভিশাপের বিষয়টিকে পাত্তা না দিলেও অনেকের বিশ্বাস এই মানুষগুলোর মৃত্যুর সঙ্গে ওটজির মমির কোনো এক যোগসাজশ অবশ্যই রয়েছে। তাছাড়া ওই মৃত্যুগুলি এখনও পর্যন্ত রহস্য।

সুত্রঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, লাইভ সায়েন্স, সায়েন্টিফিক আমেরিকান, ডয়েচে ভেলি, সাউথ টেইলর মিউজিয়াম।

মূল লেখক- নেবুলা মোর্শেদ; সম্পাদনা– আলাউদ্দীন ভুঁইয়া

লেখকের অন্য নিবন্ধ