লালনগীতির ব্যাখ্যা – চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে গানের ব্যাখ্যা

চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে

আমরা ভেবে করবো কী ।।

লালনগীতির রহস্যময় রূপক গানগুলোর মধ্যে এ গান অন্যতম। এ গানটিকে বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করা যায়। লালন জীবিতকালে কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে যাননি বলে বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্নভাবে তাঁর গান ব্যাখ্যা করেছে।

চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে

আমরা ভেবে করবো কী ।।

১ম চাঁদ- নারী, ডিম্বাণু, কৈশোর ও ২য় চাঁদ- পুরুষ, শুক্রাণু, যৌবন।

ডিম্বাণুর (নারী) সাথে শুক্রাণু (পুরুষ) মিলিত হয়েছে। মানব জীবনের এ চিরন্তুন জীবনক্রিয়ায় আমাদের কিছু বলার নেই।

অথবা, এক মানব কৈশোর থেকে যৌবনে পা দিয়েছে। মানব জীবনের এ চিরন্তুন জীবনক্রিয়ায় আমাদের কিছু বলার নেই।

ঝিয়ের গর্ভে মায়ের জন্ম

তাকে তোমরা বলো কী ।।

*ঝি- কন্যা (নিন্দার্থে), দেহ। *মা- (দেহতত্ত্বে) বীর্য।

মানবদেহে (ঝিয়ের গর্ভে) বীর্যের (মায়ের) সঞ্চার ঘটেছে।

অথবা, সন্তান জন্ম নিলে ‘মা’ এর জন্ম হয়। কন্যার পেটে মা, মায়ের পেটে কন্যা। এভাবে জগতে ভ্রমণলীলা চলছে। অথবা, সন্তান জন্ম নিলে ‘মা’ এর জন্ম হয়।

ছয় মাসের এক কন্যা ছিলো

নয় মাসে তার গর্ভ হলো

এগারো মাসে তিনটি সন্তান

কোনটা করবে ফকিরি।।

১ম ব্যাখ্যা – যৌবনকালে মানবদেহে ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য) ভর করে। দেহের নয়টি দ্বার (২ নাসারন্ধ্র, ২ চোখ, মুখ, ২ কানের ছিদ্র, জননাঙ্গ ও পায়ু) পূর্ণতা লাভ করে। এর পরে যৌবনে আরও দুটি দ্বার (শুক্রদ্বার ও রজঃদ্বার) খুলে যায়। ফলে পূর্ণ বিকশিত মানবদেহের তিনটি পথ (ত্রিবেণী) – রজঃ (লাল), সুধা (সাদা) ও মধু (কালো) উন্মুক্ত হয়। কোন পথে ফকিরি সাধন হবে?

২য় ব্যাখ্যাএখানে ‘কন্যা’ শব্দকে অধ্যানী, অজ্ঞান সত্তা হিসেবে ‘কুকুরী’ বিবেচনা করা হয়েছে। কুকুরীর প্রজননকাল ৬-১২ মাস। গর্ভধারণের সময় ২ মাস। একসাথে একাধিক বাচ্চা প্রসব করে। এভাবে জগতে অজ্ঞানের বিস্তার ঘটছে। এদের কোনটা দিয়ে ফকিরি সাধন হবে?

ঘর আছে তার দুয়ার নাই

মানুষ আছে তার কথা নাই

কেবা তাহার আহার জোগায়

কে দেয় সন্ধ্যাবাতি।।

ঘর হল দেহ-মন। কিন্তু সে ঘরে জ্ঞান প্রবেশের কোনো দরজা নইে। সেখানে নিরবে সাঁই বিরাজ করে। অজ্ঞান মানুষ কীভাবে সাঁইকে সন্তুষ্ট করবে?

অথবা, মায়ের উদরে ঘর আছে কিন্তু কোনো দরজা নেই। মানুষ আছে কিন্তু কথা বলতে পারে না। তারপরেও স্রষ্টা খাবার-আলো দিয়ে তাকে সেখানে বাঁচিয়ে রাখে।

লালন ফকির ভেবে বলে

ছেলে মরে মাকে ছুঁলে

দেহতত্ত্ব মতে এখানে ‘ছেলে’ দ্বারা লিঙ্গ ও ‘মা’ দ্বারা বীর্য বোঝানো হয়েছে। লালন এখানে বীর্যপাতের মাধ্যমে জীবের দেহবসান কথা বলেছেন।

অথবা, লালন বলছে, মা অজ্ঞানতায় আক্রান্ত হলে সন্তানও মায়াতে আবদ্ধ থাকে। সে ছেলের জ্ঞানের মৃত্যু ঘটে।

এ তিন কথার অর্থ নইলে

তার হবে না ফকিরি।।

উপরের তিন স্তবকে লালনের এসব কথার অর্থ না বুঝলে সাধন (ফকিরি) হবে না।

গানটির ভিডিও ও ইংরেজি অনুবাদ দেখতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন-

শেয়ার করুন